নিয়োগের বৈধতার অডিট আপত্তি গোপন করে প্রবাসী কল্যাণ ব্যাংকে পদোন্নতি

সংবিধান লংঘনের অভিযোগ

২০১৭-১৮ অর্থবছরের অডিট আপত্তি ২০২৩ এর রিপোর্টে গোপন করা হয়। আর এই রিপোর্টের ভিত্তিতে ভুল তথ্য ব্যাংকের বোর্ডে উপস্থাপন করে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের পদোন্নতি কার্যকর করা হয়।

বিশেষ সংবাদদাতা
Probashi

প্রবাসী কল্যাণ ব্যাংকে নিয়োগের বৈধতা নিয়ে ২০১৮ সালে একটি বাণিজ্যিক অডিটের নিরীক্ষা আপত্তি সমাধান না করেই যোগসাজশের মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের পদোন্নতির নিয়মবহির্ভূত ঘটনা সংঘঠিত হয়েছে বলে জানা গেছে। ১৩৭ জনের নিয়োগের বৈধতা নিয়ে উত্থাপিত এই আপত্তিকে নিষ্পত্তি না করেই ২০২৩ সালের বাণিজ্যিক অডিটে বাদ দেয়া হয়। এটি মহাহিসাব নিরীক্ষক ও নিয়ন্ত্রক সংক্রান্ত সংবিধানের ১২৭ অনুচ্ছেদের লঙ্ঘন বলে বিশেষজ্ঞরা উল্লেখ করেছেন।

সংশ্লিষ্ট সূত্র থেকে জানা গেছে, ২০১৭-১৮ অর্থবছরের অডিট আপত্তি ২০২৩ এর রিপোর্টে গোপন করা হয়। আর এই রিপোর্টের ভিত্তিতে ভুল তথ্য ব্যাংকের বোর্ডে উপস্থাপন করে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের পদোন্নতি কার্যকর করা হয়।

আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, এভাবে অডিট আপত্তির তথ্য গোপন করে ব্যাংকের পরিচালনা পরিষদের কাছে স্বচ্ছ হিসেবে উপস্থাপন করে তাদের মধ্যকার শক্তিশালী অংশকে এজিএম হিসেবে পদোন্নতিও দেয়া অবৈধ হয়েছে। এই পদোন্নতি দিতে গিয়ে জনাপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের ৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৪ এর পদোন্নতি সংক্রান্ত কমিটি গঠনের পরিপত্র লঙ্ঘন করে ৩ মার্চ ২০২৪ এ অভিযুক্তদেরকে পদোন্নতির জন্য সাক্ষাৎকারের আহবান জানানো হয়। আর যথারীতি ৩০ জুন ২০২৪ এ একটি পরিপত্রের মাধ্যমে পদোন্নতি ঘোষণা করা হয়। ৫ আগস্টের সরকার পরিবর্তনের পরও সেটি বহাল রয়েছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, অডিট আপত্তি গোপন করা, পরিচালনা পরিষদের অনুমোদন নেয়া, পদোন্নতি কমিটি গঠন করা এবং সবশেষে পদোন্নতি দেয়ার বিষয় বিবেচনায় নিলে বুঝতে অসুবিধা হয় না যে ব্যাংকের সিনিয়র কর্মকর্তা, পরিচালনা পরিষদ, মন্ত্রণালয়, এফআইডিসহ একটি চক্র এ জন্য কাজ করেছে। এ ধরনের নিয়মবহির্ভূত কাজে আর্থিক প্রণোদনা হিসেবে ঋণ প্রদানের কমিশন বাণিজ্য এবং প্রধান কার্যালয়ের ক্রয় সংক্রান্ত বাণিজ্য কাজ করেছে বলে অভিযোগ রয়েছে। এ ধরনের বাণিজ্য দিন দিন আরো প্রসারিত হচ্ছে।

জানা গেছে, প্রবাসী কল্যাণ ব্যাংকে নানা ধরনের অনিয়ম ঘটলেও এর মধ্যে ২০১৭-১৮ সালের নিরীক্ষার আপত্তি সমাধান না করেই তা ২০২৩ সালের নিরীক্ষা থেকে বাদ দেয়ার অপরাধটি সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য। এতে সংবিধানে অডিট আপত্তি সংক্রান্ত যে বিধান রয়েছে তা লঙ্ঘিত হয়েছে বলে আইনজ্ঞরা মন্তব্য করেছেন। তাদের মতে, প্রবাসী কল্যাণ ব্যাংকের তদানীন্তন ব্যবস্থাপনা পরিচালকের ২০১৭-১৮ সালের নিরীক্ষার আপত্তি সমাধান না করেই ২০২৩ সালের নিরীক্ষা থেকে তা বাদ দেয়ায় সংবিধানের ১২৭-১৩২ অনুচ্ছেদ লঙ্ঘন হয়েছে। এ ছাড়া, ফৌজদারি দণ্ডবিধির ধারা ২০৪ ও ২১৮ এর অধীনে প্রমাণ ধ্বংস ও ভুল রেকর্ড তৈরি করার জন্য অভিযুক্ত হতে পারেন অডিট আপত্তি গোপনকারীরা। একইসাথে, দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) আইন অনুযায়ী নিয়োগপ্রক্রিয়ায় দুর্নীতির অভিযোগ গোপন করেও অপরাধ করা হয়েছে। পাবলিক রেকর্ডস আইন, ২০১১ এবং বাণিজ্যিক নিরীক্ষা নির্দেশিকা অনুসারে এ জন্য দায়ী ব্যক্তিরা সরকারি নথি গোপন করেছেন।

আইনজীবীদের মতে, অডিট আপত্তি নিষ্পত্তি ছাড়া গোপন করে তদানীন্তন অডিট প্রধান সংবিধানের ১২৭-১৩২ অনুচ্ছেদ লঙ্ঘন এবং নিরীক্ষা আপত্তিগুলো যথাযথভাবে সমাধান না করে অপরাধ করেছেন। এর ফলে, ফৌজদারি দণ্ডবিধির ধারা ২০৪ এবং ২১৮ অনুযায়ী তিনি প্রমাণ ধ্বংস ও ভুল রেকর্ড তৈরির অপরাধ করেছেন মর্মে অভিযুক্ত হতে পারেন। দুর্নীতি দমন কমিশন আইনের অধীনে অনিয়মের তথ্য গোপন, পাবলিক রেকর্ডস আইন অনুযায়ী রেকর্ড পরিবর্তন বা মুছে ফেলার অভিযোগে তিনি অভিযুক্ত। এ ছাড়াও, বাণিজ্যিক নিরীক্ষা নির্দেশিকা অনুসারে নিরীক্ষা প্রক্রিয়ায় ব্যত্যয় ঘটানো তার দায়িত্ব পালনে ব্যর্থতার উদাহরণ হিসেবে দেখা হতে পারে।

এ সময়ের মানবসম্পদ প্রধানও নিয়োগ প্রক্রিয়ায় অনিয়ম এবং দুর্নীতির তথ্য গোপন করেছেন। সংবিধানের ১২৭-১৩২ অনুচ্ছেদ লঙ্ঘন এবং ফৌজদারি দণ্ডবিধির ধারা ২০৪ ও ২১৮ এর অধীনে প্রমাণ পরিবর্তন বা ধ্বংসের দায়ে তিনি অভিযুক্ত হতে পারেন। দুর্নীতি দমন কমিশন আইনের ধারা ২৬ ও ২৭ অনুযায়ী তিনি অনিয়মের তথ্য গোপন করার দায়ে অভিযুক্ত। এ ছাড়া, পাবলিক রেকর্ডস আইন, ২০১১ অনুসারে সরকারি নথি পরিবর্তন ও মুছে ফেলার দায়ে এবং বাণিজ্যিক নিরীক্ষা নির্দেশিকা অনুযায়ী দায়িত্ব পালনে ব্যত্যয় ঘটিয়েছেন। দুর্নীতি দমন কমিশন ও অডিটর জেনারেলের অফিসের সাথে যোগাযোগ করেও একই রকম মতামত পাওয়া গেছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এসব অনিয়ম ব্যাংকের স্বচ্ছতা, সুশাসন, নাগরিক সেবার প্রতি মারাত্মক হুমকি হিসেবে কাজ করছে। সর্বোপরি নিরীহ বিদেশগামীরা আর্থিক ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছেন।

অডিট আপত্তি বাদ দেয়ার এই প্রক্রিয়ায় যুক্ত শীর্ষ কর্মকর্তারা বিভিন্ন ব্যাংকে দায়িত্ব পালন করছেন। ২০২৩ সালে অডিট রিপোর্টে স্বাক্ষরকারী ব্যক্তিবর্গের মধ্যে তৎকালীন এমডি মজিবুর রহমান জনতা ব্যাংকের এমডি হয়েছেন। জিএম মো: নূর আলম সরদার প্রমোশন পেয়ে হাউজ বিল্ডিং ফাইন্যান্স করপোরেশনের ডিএমডি হয়েছেন। ডিএমডি মো: জাহাঙ্গীর হোসেন এবং অডিট প্রধান মোহাম্মদ মাহফুজুর রহমান তাদের পদে বহাল রয়েছেন।

বিষয়টি যোগাযোগ করা হলে প্রবাসী ব্যাংকের তদানীন্তন ব্যবস্থাপনা পরিচালক মজিবুর রহমান নয়া দিগন্তকে বলেন, আমি প্রবাসী কল্যাণ ব্যাংকে যোগ দেই ২০২১ সালে। অডিট আপত্তি এসেছে ২০১৮ সালের। এ জন্য আমি এ বিষয়ে খুব বেশি ভালো বলতে পারব না। তবে ১৩৭ জনকে যে পদোন্নতি দেয়া হয়েছে সেটি আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের নীতিমালার আলোকে দেয়া হয়েছে। কর্মকর্তা-কর্মচারীদের পদোন্নতি একটি ধারাবাহিক কার্যক্রম। অডিট আপত্তির সাথে পদোন্নতির কোনো সম্পর্ক নেই বলে তিনি মনে করেন। এ ছাড়া ১৩৭ জনকে যে পদোন্নতি দেয়ার বিষয়টিতে ব্যাংকের বোর্ড অনুমোদন দিয়েছে। একই সাথে বাংলাদেশ ব্যাংক ও অর্থ মন্ত্রণালয়ের অনুমোদনও রয়েছে। এ জন্য এখানে আইনের কোনো ব্যত্যয় ঘটেনি বলে তিনি উল্লেখ করেন।