পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভার হাই ভোল্টেজ ভোট আজ

Printed Edition

নয়া দিগন্ত ডেস্ক

কয়েক সপ্তাহের উত্তপ্ত প্রচার অভিযান শেষে পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য বিধানসভা নির্বাচনের প্রথম দফার ভোট গ্রহণ আজ বৃহস্পতিবার। উত্তর ও দক্ষিণবঙ্গের ১৬টি জেলার মোট ১৫২টি আসনে আজ স্থানীয় সময় সকাল ৭টা থেকে সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত ভোটাররা তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করবেন।

ক্ষমতাসীন তৃণমূল কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণে থাকা এই রাজ্যটিতে ভোটের আগ থেকেই ব্যাপক প্রচার-প্রচারণা চলে আসছিল। কেন্দ্রে ক্ষমতাসীন ভারতীয় জনতা পার্টি বিজেপি মমতা ব্যানার্জির হাত থেকে এই রাজ্যটিকে ছিনিয়ে নিতে সারা বছর তৎপরতা চালিয়েছে। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি থেকে শুরু করে বিভিন্ন নেতা সেখানে প্রচার-প্রচারণায় যুক্ত হয়ে তা তুঙ্গে নিয়ে যান। অপর দিকে মমতার তৃণমূল টানা চতুর্থ মেয়াদে ক্ষমতায় থাকতে চাইছে। একই সময়ে ভারতের আরো চারটি রাজ্যে নির্বাচন হলেও সবচেয়ে প্রচার পায় পশ্চিমবঙ্গ। এমন প্রেক্ষাপটে এটি হয়ে দাঁড়ায় হাই ভোল্টেজ নির্বাচন।

মঙ্গলবার সন্ধ্যায় প্রচারের সময়সীমা শেষ হওয়ার আগ মুহূর্ত পর্যন্ত তৃণমূল কংগ্রেস ও বিজেপি সমানে সমান শক্তি প্রদর্শন করেছে। নির্বাচন ঘিরে রাজ্যজুড়ে নজিরবিহীন নিরাপত্তাবলয় তৈরি করা হয়েছে। প্রশাসনিক সূত্রমতে পশ্চিমবঙ্গের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো রেকর্ড দুই লাখ ৪০ হাজার কেন্দ্রীয় বাহিনীর সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে। নির্বাচনী প্রচারণার শেষ দিনে হেভিওয়েট প্রার্থীদের সশরীরে উপস্থিতি ভোটারদের মধ্যে বাড়তি উদ্দীপনা তৈরি করেছে। নন্দীগ্রাম আসনে বিজেপির প্রভাবশালী প্রার্থী শুভেন্দু অধিকারী জনসংযোগে অংশ নেন।

অন্য দিকে মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জিও শেষ দিনে চারটি নির্বাচনী কর্মসূচিতে অংশ নিয়ে দলীয় প্রার্থীদের পক্ষে ভোট চান। তৃণমূল নেত্রী মমতা প্রথম দফা ভোটের প্রচার শেষের প্রাক্কালে ভোটারদের প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেন, ‘বিজেপিকে হারিয়ে তৃণমূলকে আবার ক্ষমতায় আনুন। তৃণমূলই রাজ্যে শান্তি দিতে পারবে।’

এ দিকে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ গত মঙ্গলবার পশ্চিমবঙ্গ সফরে এসে একাধিক জনসভায় অংশ নেন। তিনি জানিয়েছেন, দ্বিতীয় দফার নির্বাচনের আগ পর্যন্ত তিনি এ রাজ্যেই থাকবেন। আসানসোল দক্ষিণে বিজেপি প্রার্থী অগ্নিমিত্রা পালের সমর্থনে দিল্লির মুখ্যমন্ত্রী রেখা গুপ্তা রোডশো করেন এবং কুলটি আসনে অমিত শাহ জনসভা করেন।

পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভার ২৯৪ আসনের মধ্যে প্রথম দফায় ভোট গ্রহণ হবে ১৬ জেলার ১৫২টি আসনে। জেলাগুলো হলো দার্জিলিং, কালিম্পং, জলপাইগুড়ি, আলিপুরদুয়ার, কোচবিহার, উত্তর ও দক্ষিণ দিনাজপুর, মালদহ, ঝাড়গ্রাম, পুরুলিয়া, বাঁকুড়া, বীরভূম, মুর্শিদাবাদ, পূর্ব ও পশ্চিম মেদিনীপুর এবং পশ্চিম বর্ধমান। এসব আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন মোট এক হাজার ৪৭৮ জন প্রার্থী। মনোনয়নপত্র জমা পড়েছিল এক হাজার ৫২৫টি। সবচেয়ে বেশি ১৫ জন করে প্রার্থী রয়েছেন কোচবিহার দক্ষিণ ও ইটাহার আসনে। এই নির্বাচনে ভোট দেবেন প্রায় তিন কোটি ৬০ লাখ ভোটার। ৪৪ হাজার ৩৭৮টি ভোট গ্রহণ কেন্দ্র প্রস্তুত।

নির্বাচনী ময়দানে তৃণমূল ও বিজেপির সমানে সমান লড়াইয়ের পাশাপাশি কংগ্রেস, সিপিআইএম, আইএসএফ এবং আম জনতা উন্নয়ন পার্টির প্রার্থীরাও প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। উল্লেখযোগ্য প্রার্থীদের মধ্যে রয়েছেনÑ তৃণমূলের উদয়ন গুহ, মানস ভূঁইয়া এবং মলয় ঘটক। বিজেপির পক্ষে দিলীপ ঘোষ, নিশীথ প্রামাণিক ও অশোক দিন্দার মতো পরিচিত মুখগুলো প্রথম দফায় অগ্নিপরীক্ষায় বসছেন। এ ছাড়া কংগ্রেসের অধীর রঞ্জন চৌধুরী এবং আম জনতা উন্নয়ন পার্টির হুমায়ুন কবীরও এই দফার অন্যতম নজরকাড়া প্রার্থী।

কেন হাই ভোল্টেজ নির্বাচন

একে তো বিজেপি ও তৃণমূলের লড়াই। যেকোন মূল্যে এখানে জিততে মরিয়া বিজেপি। তারা এ জন্য আগে থেকে আটঘাট বেঁধেছে। ২০২১ সালের নির্বাচনেও তারা রাজ্যটি ছিনিয়ে নিতে চেয়েছিল; কিন্তু ২০০ আসনে জয়লাভের ঢাকঢোল বাজিয়ে তারা জেতে ৭৭টি আসনে। তৃণমূল ২১৩ আসনে জিতে ক্ষমতায় টিকে যায়; কিন্তু এবার বিজেপির কার্যক্রমে বেশ কিছু ব্যতিক্রম দেখা গেছে।

এসআইআরের নাম করে ৯১ লাখ ভোটারের নাম বাদ দেয়া হয়েছে, যাদের মধ্যে মুসলিম ভোটার অনেক। নির্বাচন অবাধ ও শান্তিপূর্ণ রাখতে রাজ্য পুলিশের পাশাপাশি দুই হাজার ৪০৭ কোম্পানি কেন্দ্রীয় বাহিনী মোতায়েন করা হয়েছে। কেন্দ্রীয় বাহিনী ইতোমধ্যে বিভিন্ন এলাকায় নিরাপত্তা জোরদার করেছে। এত বিপুল কেন্দ্রীয় সেনা মোতায়েন এই নির্বাচনকে আলাদা বৈশিষ্ট্য দিয়েছে। রাজ্যপাল সি ভি আনন্দ বোস সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণ নির্বাচনের আহ্বান জানিয়ে বলেন, লোকভবনে একটি হেল্পলাইন ডেস্ক চালু করা হয়েছে, যাতে ভোট-সংক্রান্ত যেকোনো অভিযোগ দ্রুত জানানো যায়।

বাদ পড়েছেন ৯১ লাখ ভোটার

এসআইআর (বিশেষ নিবিড় সংশোধন)-এর কারণে প্রাথমিক খসড়া ও অ্যাডজুডিকেশনের দু’টি পর্যায়ে রাজ্যের ভোটার তালিকা থেকে বাদ গেছে ৯১ লাখের কাছাকাছি নাম। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি নাম বাদ গেছে মুর্শিদাবাদ জেলা থেকে চার লাখ ৫৫ হাজার ১৩৭ জনের। এই জেলায় ২২টি বিধানসভা আসন রয়েছে।

উত্তর চব্বিশ পরগনায় তিন লাখ ২৫ হাজার ৬৬৬ জন বাদ পড়েছেন। ৩৩টি আসন রয়েছে এই জেলায়।

দুই লাখ ৩৯ হাজার ৩৭৫ জনের নাম বাদ পড়েছে ১২টি আসন থাকা মালদহে। পূর্ব বর্ধমানে দুই লক্ষ ৯ হাজার ৮০৫, নদিয়ায় দুই লাখ আট হাজার ৬২৬, উত্তর দিনাজপুরে এক লাখ ৭৬ হাজার ৯৭২, হাওড়ায় এক লাখ ৩২ হাজার ১৫১, হুগলিতে এক লাখ ২০ হাজার জনের নাম বাদ পড়েছে। কোচবিহারে এক লাখ ২০ হাজার ৭২৫ জন ভোটারের নাম বাদ দেয়া হয়েছে।

ভোটার বাদ পড়ায় সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশে কাজ শুরু করেছে ট্রাইব্যুনাল। ২৭ লাখ নামের নিষ্পত্তি করছেন বিচারকরা। তবে প্রথম দফার আগে খুব সামান্য নামেরই নিষ্পত্তি করতে পেরেছে ট্রাইব্যুনাল। আর সেই সংখ্যাটা মাত্র ৬৫০ জন, যার মধ্যে প্রথম দফার ভোটার তালিকায় নাম যুক্ত হয়েছে ১৩৯ জনের। আর বাদ গিয়েছে ৫১১ জনের নাম। ফলে দ্বিতীয় দফার ভোটের আগে বাকি কত নামের নিষ্পত্তি করতে পারবে ট্রাইব্যুনাল তা নিয়ে উঠেছে প্রশ্ন।

কেজরিওয়ালের ফোন মমতাকে

প্রথম দফার ভোটের আগে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সাথে ফোনে কথা বললেন আম আদমি পার্টির সুপ্রিমো অরবিন্দ কেজরিওয়াল। মমতাকে ফোন করে তিনি সমর্থন জানিয়েছেন বলে নিজের সোস্যাল মিডিয়ায় উল্লেখ করেছেন আপ নেতা। বুধবার সমাজমাধ্যমে নিজেই এই তথ্য প্রকাশ করেন কেজরিওয়াল।

তিনি জানান, ফোনে কথা বলে তিনি মমতার প্রতি পূর্ণ সমর্থন জানিয়েছেন। তার কথায়, এই লড়াই শুধু একটি রাজ্যের নির্বাচন নয়; বরং দেশের গণতন্ত্রের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সংগ্রাম। পাশাপাশি তিনি অভিযোগ তোলেন, নির্বাচন ব্যবস্থাকে ব্যবহার করে রাজনৈতিক ফায়দা তোলার চেষ্টা চলছে। তবে শেষ পর্যন্ত তা সফল হবে না বলেও দাবি করেন।

পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভার দ্বিতীয় দফার ভোট গ্রহণ হবে ২৯ এপ্রিল। আর ফল ঘোষণা হবে ৪ মে। বাকি চারটি রাজ্যের ফলও একই দিন ঘোষণা করা হবে। রাজ্যগুলো হলোÑ আসাম, কেরালা, তামিলনাড়– ও পদুচেরি।