শালিখায় খেজুরের রস সংগ্রহে ব্যস্ত গাছিরা
Printed Edition
শহিদুজ্জামান চাঁদ শালিখা (মাগুরা)
‘ঠিলে ধুয়ে দে বউ, গাছ কাটতি যাব’ কণ্ঠশিল্পী অনিল হাজারিকার জনপ্রিয় এই আঞ্চলিক গানের কথার বাস্তব রূপ যেন ফিরে এসেছে শীতের আগমনী বার্তার সাথে সাথে। মাগুরার শালিখা উপজেলার গ্রামাঞ্চলে ভোরের কুয়াশা কাটার আগেই খেজুর গাছ ঘিরে ব্যস্ত হয়ে পড়ছেন গাছিরা। শুরু হয়েছে ঐতিহ্যবাহী খেজুরের রস সংগ্রহের মৌসুম।
একসময় মাঠেঘাটে, রাস্তার দুই পাশে সারি সারি খেজুর গাছ দেখা যেত। কালের বিবর্তনে সেই দৃশ্য আজ প্রায় স্মৃতিতে পরিণত। আগের মতো ঝিরিঝিরে পাতার লম্বা সব গাছ চোখে পড়ে না। তবুও শীত এলেই অবহেলায় পড়ে থাকা এসব খেজুর গাছ নতুন করে কদর পায়। ভোরের সূর্যের নরম আলোয় বাঁশের মই ঠেসে গাছে ওঠা, কেটে দেয়া হাঁড়ি বসানো আর টুপটাপ ঝরা রসের শব্দে মুখর হয়ে ওঠে গ্রাম।
হেমন্ত-শীতের এই সময়েই মেলে গ্রাম-বাংলার ঐতিহ্যবাহী সুস্বাদু পানীয় খেজুরের রস। কাঁচা রস যেমন মুখরোচক, তেমনি জ্বাল দিয়ে তৈরি হয় পাতলা গুড়, ঝোলা গুড়, দানা গুড় ও পাটালি। পিঠা-পুলি, পায়েশ কিংবা শীতের নানা আয়োজনে খেজুরের গুড় অপরিহার্য। একসময় শহর থেকেও মানুষ ছুটে আসত এই স্বাদ নিতে। সন্ধ্যার পর গ্রামীণ পরিবেশ রসের ঘ্রাণে মধুর হয়ে উঠত, আর গাছিদের ব্যস্ততায় প্রাণচাঞ্চল্য ছড়িয়ে পড়ত চারদিকে।
গাছিরা জানান, খেজুর গাছ সঙ্কটে এ বছরও চাহিদার তুলনায় রস কম পাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। আগে বাড়ির আঙিনা, ক্ষেতের আইল ও রাস্তার পাশে অবাধে জন্মাত এসব গাছ। এখন জলবায়ু পরিবর্তন, বসতি বৃদ্ধি ও অবহেলার কারণে অনেক গাছ কেটে ফেলা হয়েছে। জলবায়ু পরিবর্তন ও কালের বিবর্তনে শালিখা উপজেলাজুড়ে ঐতিহ্যবাহী খেজুরগাছ এখন বিলুপ্তির পথে। বিলুপ্তি রোধে এখুনি প্রকল্প হাতে নিয়ে রাস্তার দু’ধারসহ বিভিন্ন স্থানে খেজুর গাছের চারা রোপণে উৎসাহিত ও খেজুর গাছ কাটতে নিরুৎসাহিত করা প্রয়োজর। খেজুর গাছ ৮ থেকে ১০ বছর পর্যন্ত রস দেয় এটাই এর বিশেষ বৈশিষ্ট্য। সারা বছর তেমন যতœ না নিলেও শীত মৌসুমে এটি হয়ে ওঠে গ্রামের অর্থনৈতিক ভরসা। পাতায় তৈরি হয় পাটি, শুকনো অংশ ব্যবহৃত হয় জ্বালানি হিসেবে।
শরুশুনা গ্রামের গাছি জামাল হোসেন বলেন, রস থেকে গুড় বানিয়ে বাজারে বিক্রি করেই সংসার চলে। যেভাবে গাছ কমছে, ভয় হয় একদিন এই ঐতিহ্য হারিয়ে যাবে। উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কৃষিবিদ আবুল হাসনাত জানান, উপজেলায় বর্তমানে আনুমানিক ২৬ হাজার ৩০০টি খেজুর গাছ রয়েছে। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতর সড়কের দুই পাশে ও খোলা জায়গায় খেজুর গাছ লাগাতে কৃষকদের উৎসাহ দিচ্ছে। তার মতে, এই গাছ ফসলের ক্ষতি করে না, বাড়তি খরচও লাগে না বরং রস ও গুড়ের চাহিদা পূরণে বড় ভূমিকা রাখে।