তদন্তে নিখোঁজ সাক্ষী, রহস্যজনক মৃত্যু ও সরকারি ব্যর্থতা : এক দশক পর নতুন প্রশ্ন

Printed Edition
জাতীয় স্বাধীন
তদন্তে নিখোঁজ সাক্ষী, রহস্যজনক মৃত্যু ও সরকারি ব্যর্থতা : এক দশক পর নতুন প্রশ্ন

বিশেষ সংবাদদাতা

২০০৯ সালের ২৫-২৬ ফেব্রুয়ারি বিডিআর সদর দফতর পিলখানায় সংঘটিত নারকীয় হত্যাকাণ্ড শুধু বাংলাদেশের ইতিহাসকে রক্তাক্তই করেনি- একটি গোটা বাহিনীকে ভেঙে দিয়েছে গভীর সন্দেহ, রাজনৈতিক ছায়া এবং দায়িত্বহীন তদন্তের দাগ রেখে। এক দশকের বেশি সময় পর স্বাধীন তদন্ত কমিশনের সামনে উত্থাপিত নথি, সাক্ষ্য এবং ময়নাতদন্ত-সংক্রান্ত ধামাচাপার নানা ঘটনা আবারো প্রশ্ন তুলে- তদন্ত চলাকালে আসলে কী হয়েছিল? কেন গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষী ও সন্দেহভাজনরা রহস্যজনকভাবে মারা গেলেন বা নিখোঁজ হলেন? কে বা কোনো শক্তি এই ব্যর্থতা বা গুম-হত্যার দায় এড়াতে চাইছে?

সাক্ষীদের মৃত্যু : তদন্ত নাকি নির্মূল অভিযান : কমিশনের নথি অনুসারে (অধ্যায় ১২৫), তদন্ত চলাকালে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষী অস্বাভাবিকভাবে মারা যান। অধিকাংশ ক্ষেত্রে তাদের মৃত্যুর কারণ ‘অজ্ঞাত’, ‘উল্লেখ নেই’ বা ‘তালিকাপত্র উল্লেখ নাই’ হিসাবে নথিভুক্ত করা হয়েছে। প্রশ্ন উঠছে- এটি কি প্রশাসনিক গা-এড়ানো, নাকি তদন্তের অন্তরালে আরো ভয়ঙ্কর কোনো প্রক্রিয়া চলছিল?

জিজ্ঞাসাবাদের সময়ে হত্যার অভিযোগ : মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামি সিপাহি সেলিম অভিযোগ করেছেন, ‘আমাকে নির্যাতন করে হত্যা করার চেষ্টা করা হয়েছে।’ এই বক্তব্য শুধু পুলিশের নির্যাতনের অভিযোগই নয়, বরং পুরো তদন্ত প্রক্রিয়াকে প্রশ্নবিদ্ধ করে।

হাবিলদার মহিউদ্দিন : হেফাজতে মৃত্যুর ছদ্মবেশে নির্মম হত্যা

২০০৯ সালের ২৫ ফেব্রুয়ারি কালের কণ্ঠ প্রকাশ করে, ‘হেফাজতে দুই জওয়ানের মৃত্যু : কারণ নির্যাতন’। ময়নাতদন্তে হাবিলদার মহিউদ্দিন ও নায়েক মোবারকের শরীরে নির্যাতনের অসংখ্য চিহ্ন পাওয়া যায়। তবুও পুলিশের চূড়ান্ত প্রতিবেদনে ‘নির্যাতন নয়’ বলা হয়- যা সরাসরি তথ্য গোপনের শামিল এবং নাশকতামূলক আচরণ হিসেবে দেখা যেতে পারে।

ইমাম সিদ্দিকুর রহমানের মৃত্যু : রাজসাক্ষী বানানোর চাপ

বিডিআর মসজিদের পেশ ইমাম সিদ্দিকুর রহমানকে জোর করে রাজসাক্ষী বানানোর চেষ্টা করা হয়েছিল। তার স্ত্রী বলেন, প্রবল ভয়ভীতি ও মানসিক চাপে তিনি মৃত্যুবরণ করেন। একজন সম্পূর্ণ বেসামরিক ধর্মীয় ব্যক্তিকে এভাবে ভয় দেখিয়ে সাক্ষ্য আদায়- তৎকালীন তদন্তকারীদের চরিত্রকেই প্রশ্নবিদ্ধ করে।

গুম, নিখোঁজ ও রহস্যজনক পলায়ন : রাষ্ট্রীয় দায় এড়ানো নাকি পরিকল্পিত আড়াল

কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, ২০২০ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত ৬৪ জন বিডিআর সদস্য নিখোঁজ বা পলাতক ছিলেন। এর মধ্যে মূল সন্দেহভাজন ষড়যন্ত্রকারী সিপাহি মইনুদ্দিনও রয়েছেন। সাক্ষ্য অনুযায়ী অন্তত একজন গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষীকে গুম করে হত্যা করা হয়েছে। এত সংখ্যক সদস্যের নিখোঁজ থাকা- তাও একটি বিশেষ বাহিনী থেকে-রাষ্ট্রীয়যন্ত্রের ব্যর্থতা বা ইচ্ছাকৃত আড়াল ছাড়া সম্ভব নয়।

৩৪ জনের মৃত্যু : ১০ জনের মৃত্যুর কারণও নেই : ২০০৯ সালের ৯ মার্চ থেকে ২৩ জুলাই পর্যন্ত ৩৪ জন বিডিআর সদস্য ও বেসামরিক কর্মী মারা যান। এর মধ্যে ১০ জন কোথায় এবং কিভাবে মারা গেছেন- তদন্তে উল্লেখ নেই। এ ধরনের নথিভুক্তি শুধু অবহেলা নয়- আইনের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন। তদন্তের দায়িত্বে যারা ছিলেন, তাদের ভূমিকা অপরাধমূলক উদাসীনতার পর্যায়ে পড়ে।

মোজাম্মেল হক : আত্মহত্যা নাকি হত্যা? নথিতে নীরবতা : মোজাম্মেল হকের লাশ টয়লেটে ফাঁস লাগানো অবস্থায় পাওয়া গেলেও বিজিবির নথিতে মৃত্যুর কারণ লেখা- তালিকাপত্র উল্লেখ নাই। ভিডিও ফুটেজ পরীক্ষা করেও কমিশন নিশ্চিত হতে পারেনি এটি আত্মহত্যা, নাকি হত্যাকাণ্ড।

ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন চাইলেও বিজিবির নীরবতা : কমিশন ২০২৫ সালে বিজিবিকে ৩৪ জনের ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন চেয়ে চিঠি দেয়, কিন্তু বিজিবি তা দাখিল করেনি। ১২ বছর পরেও তদন্তকারী বাহিনীর এই নীরবতা রহস্যকে আরো ঘনীভূত করেছে।

জাতীয় তদন্ত কমিটি : ‘দায়িত্বহীনতা ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ব্যর্থতা’ : ১২ সদস্যের আনিস-উজ-জামান কমিটির রিপোর্ট বিশ্লেষণে আরো উদ্বেগজনক চিত্র পাওয়া যায়- ১. কমিটি স্বীকার করেছে, ‘প্রকৃত কারণ উদঘাটনে ব্যর্থ’। ৫৭ জন সেনা অফিসারকে নির্মমভাবে হত্যা করা হলো; আর তদন্ত কমিটি বলছে তারা ‘কারণ উদঘাটন করতে পারেনি’- এটি শুধু ব্যর্থতা নয়, বরং একটি কৌশলগত আড়াল। ২. নেপথ্যের কুশীলব অনুসন্ধানে শূন্য উদ্যোগ। তারা স্বীকার করেছেন ‘নেপথ্যে কুশীলব ছিল’, কিন্তু তাদের নাম বের করার কোনো চেষ্টা পর্যন্ত করেননি।

৩. সাক্ষীদের নাম জালিয়াতি- দুই এমপি ও বাহিনী প্রধান সাক্ষ্যই দেননি। নথিতে দেখানো হয় তৎকালীন এমপি গোলাম রেজা এবং সেনাপ্রধান মঈন ইউ আহমেদ সাক্ষ্য দিয়েছেন। কিন্তু তারা কমিশনকে জানান, ‘আমরা কোনো সাক্ষ্য দিইনি’। এটি সরকারি নথিতে জালিয়াতির শামিল এবং তদন্তকে ভিন্ন খাতে নেয়ার লক্ষণ।

৪. তৎকালীন প্রধানমন্ত্রীকে ডাকা হয়নি। রাজনৈতিক দায় নির্ধারণের মূল সাক্ষী হওয়া সত্ত্বেও তার জবানবন্দী নেয়া হয়নি- এটি কি কাকতালীয়, নাকি রাজনৈতিক নির্দেশ?

সেনা তদন্ত আদালতের প্রতিবেদন- তথ্যবহুল, কিন্তু সিদ্ধান্তহীন : ২৪ সদস্যের সেনা তদন্ত কমিটি ঘটনা, জঙ্গি সংশ্লিষ্টতা, পলায়ন, লাশ উদ্ধার- সবই বিস্তারিতভাবে তুলে ধরে। কিন্তু বড় প্রশ্নগুলোর উত্তর দেয়নি।

রাজনৈতিক দায় জটিলভাবে এড়িয়ে যাওয়া : তারা বলেছেন, ‘রাজনৈতিক সমঝোতার কারণে দ্রুত ব্যবস্থা নেয়া যায়নি।’ কিন্তু কোনো রাজনৈতিক ব্যক্তি দায়ী- তা উল্লেখ করেননি।

২. স্থানীয় রাজনৈতিক নেতাদের ভূমিকা স্পষ্ট, তবু নাম উল্লেখ এড়িয়ে যাওয়া : তারা উল্লেখ করেন, বিডিআরের অবসরপ্রাপ্ত সুবেদার তোরাব আলী এবং তার দুই ছেলে লেদার লিটন ও জাকির- তারা বারবার বিদেশে ফোন করেছেন। কোন দেশে, কেন? এটি তদন্তের প্রথম প্রশ্ন। কিন্তু সেনা কমিটি এখানেই থেমে গেছে।

৩. আইএসপিআরের ব্যর্থতা, তবুও ব্যবস্থা নেই : মিডিয়া ব্যবস্থাপনায় আইএসপিআর গুরুতর ব্যর্থ হয়, কিন্তু তাদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা বা সুপারিশ নেই।

সমগ্র চিত্রে পরিকল্পিত ধামাচাপার ইঙ্গিত

সব বিশ্লেষণ থেকে যে চিত্র পাওয়া যায় তা হলো,

গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষীদের মৃত্যু, গুম, পলায়ন- শুধু প্রশাসনিক ব্যর্থতা নয়, বরং পদ্ধতিগত ধামাচাপা।

নথি জালিয়াতি, ময়নাতদন্ত গোপন, রাজনৈতিক সাক্ষী জিজ্ঞাসা না করা- সবই একটি পরিকল্পিত আড়াল।

তদন্ত প্রতিবেদনের ভাষা রাজনৈতিক প্রভাবের ইঙ্গিত।

বিদেশী যোগাযোগের তথ্য চেপে যাওয়া- জিওপলিটিক্যাল উদ্বেগ বাড়ায়।

কে দায়ী- রাষ্ট্র কি এড়াতে পারে?

কমিশনের ভাষায়, বিজিবির তৎকালীন মহাপরিচালক সাক্ষীদের মৃত্যু প্রতিরোধে ব্যর্থ। তবে প্রশ্ন আরো গভীর- তার ব্যর্থতা কি ব্যক্তিগত? নাকি রাজনৈতিক নির্দেশনার ফল? ২০০৯ সালের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট বিবেচনায় এই প্রশ্ন আরো তীক্ষè হয়ে ওঠে।

বিডিআর হত্যাকাণ্ড শুধু একটি বিদ্রোহ ছিল না- এটি রাষ্ট্রীয় নাজুকতা, রাজনৈতিক সুযোগসন্ধান এবং তদন্তে অন্ধকারের বহুস্তরীয় চিত্র। যেখানে সাক্ষীর মৃত্যু; ময়নাতদন্ত গোপন; বিদেশী যোগাযোগ লুকানো; রাজনৈতিক প্রশ্ন এড়িয়ে যাওয়া- সব মিলে তদন্ত প্রক্রিয়া নিজেই প্রশ্নের মুখে। বিচারহীনতা শুধু সত্যকে হত্যা করে না- রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎকেও জিম্মি করে ফেলে। বিডিআর বিদ্রোহের তদন্ত আজো সেই রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক ছায়ারই সাক্ষ্য বহন করে।