ট্রাম্পের পাল্টা শুল্ক অবৈধ ঘোষণার পর বিকল্প পথ খুঁজতে হবে বাংলাদেশকে
১০% ইউএস ট্যারিফ : পোশাক রফতানি বাড়ার আশা তবে কাটছে না অনিশ্চয়তা
Printed Edition
বিশেষ সংবাদদাতা
কম শুল্কে সুযোগ, কিন্তু নীতিগত অস্থিরতায় দুশ্চিন্তার দ্বৈত বাস্তবতায় পড়েছে বাংলাদেশের তৈরী পোশাক খাত। বিশ্ব বাণিজ্যের সবচেয়ে বড়বাজার যুক্তরাষ্ট্র আর সেই বাজারে বাংলাদেশের তৈরী পোশাক রফতানি বহু বছর ধরেই অর্থনীতির প্রধান চালিকাশক্তি। কিন্তু সেই বাজারকে ঘিরেই আবার তৈরি হয়েছে নতুন অনিশ্চয়তা। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প নতুন করে সব দেশের ওপর ১০ শতাংশ ট্যারিফ বা শুল্ক আরোপের ঘোষণা দেয়ার পর বাংলাদেশের রফতানিকারকদের মধ্যে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। একদিকে কম শুল্কে রফতানি বাড়ার সম্ভাবনা, অন্যদিকে ঘন ঘন নীতি পরিবর্তনের কারণে বাজারের স্থিতিশীলতা নিয়ে গভীর উদ্বেগ। বিশেষজ্ঞদের ভাষায়- ‘এটি সুযোগও, আবার ঝুঁকিও।’
আদালতের রায়, তারপর নতুন শুল্ক : সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের সুপ্রিম কোর্ট তথাকথিত ‘রেসিপ্রোকাল ট্যারিফ’ বাতিল করে দেয়। ফলে আগের উচ্চ শুল্ক কাঠামো কার্যত অকার্যকর হয়ে পড়ে। কিন্তু এর পরপরই ট্রাম্প প্রশাসন নতুন ঘোষণা দেয়- ১৫০ দিনের জন্য সব দেশের ওপর ১০ শতাংশ সমান শুল্ক। ফলে বাংলাদেশসহ অন্যান্য রফতানিকারক দেশ আবার একটি ‘সমতল প্রতিযোগিতার মাঠে’ ফিরে এলেও দীর্ঘমেয়াদে স্থায়িত্ব নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে।
কেন ১০% ট্যারিফ ‘মন্দের ভালো’: বাংলাদেশের তৈরী পোশাক খাত দীর্ঘদিন ধরে যুক্তরাষ্ট্রে ১৫-২০ শতাংশের মতো কার্যকর শুল্কের চাপে ছিল। সেখানে সবার জন্য ১০ শতাংশ নির্ধারণ হলে: আমদানিকারকের খরচ কমবে; খুচরা দামে পোশাক সস্তা হবে; ভোক্তার ক্রয়ক্ষমতা বাড়বে আর এতে অর্ডার বাড়তে পারে।
এই বাস্তবতাকে ‘মন্দের ভালো’ হিসেবেই দেখছেন শিল্পমালিকরা।
বিজিএমইএর সভাপতি মাহমুদুল হাসান বাবু বলেছেন, সমান ১০ শতাংশ শুল্কে মার্কিন আমদানিকারকরা আগের তুলনায় কম খরচে পণ্য আনতে পারবেন, যা শেষ পর্যন্ত বাংলাদেশের রফতানিতে ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে।
অনিশ্চয়তাই বড় দুশ্চিন্তা : কিন্তু বাস্তবতা শুধু সুযোগের গল্প নয়। বড় সমস্যা হলো ‘নীতি স্থিতিশীলতা’।
রফতানিকারকরা বলছেন, আজ ২০ শতাংশ, কাল ১০ শতাংশ, আবার আদালতে বাতিল- এই ওঠানামা আমদানিকারকদের সিদ্ধান্ত নেয়া কঠিন করে তুলছে। বড় অর্ডার দিতে তারা দ্বিধায় পড়ছেন। কারণ, শুল্ক বাড়লে লাভ কমে যায়; কমলে প্রতিযোগিতা বদলে যায়; পরিকল্পনা করা যায় না- ফলে দীর্ঘমেয়াদি ব্যবসায়িক আস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
কারখানার দৃষ্টিভঙ্গি : মাঠের বাস্তবতা : দেশের অন্যতম বৃহৎ রফতানিকারক প্রতিষ্ঠান হামীম গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক এ কে আজাদ মনে করেন, রেসিপ্রোকাল ট্যারিফ বাতিল হওয়ায় ক্রেতাদের ক্রয়ক্ষমতা বাড়বে।
তার ভাষায়, ‘আগের ১৯-২০ শতাংশের তুলনায় ১০ শতাংশ হলে রফতানিতে নেতিবাচক প্রভাব পড়ার কথা নয়; বরং কিছুটা সুবিধাই হবে।’
তবে তিনিও সতর্ক করে বলেন, যুক্তরাষ্ট্রে এ ধরনের শুল্ক আরোপ আইনি চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে পারে। অর্থাৎ ভবিষ্যতে আবার নীতি বদলে যাওয়ার আশঙ্কা থেকেই যাচ্ছে।
যুক্তরাষ্ট্র কেন এত গুরুত্বপূর্ণ : বাংলাদেশের মোট তৈরী পোশাক রফতানির প্রায় এক-তৃতীয়াংশ যায় যুক্তরাষ্ট্রে। বছরে বিলিয়ন ডলারের বাজার; বড় বড় খুচরা ব্র্যান্ড; উচ্চ ভোক্তা চাহিদা- এই বাজারে সামান্য শুল্ক পরিবর্তনও বাংলাদেশের হাজার হাজার কারখানা ও লাখো শ্রমিকের আয়ে প্রভাব ফেলে।
তাই ট্যারিফ শুধু একটি অর্থনৈতিক সংখ্যা নয়- এটি কর্মসংস্থান, মজুরি ও সামাজিক স্থিতিশীলতার প্রশ্নও।
সম্ভাবনার দিকগুলো : বর্তমান ১০ শতাংশ শুল্ক কাঠামো কার্যকর থাকলে কিছু ইতিবাচক ফল মিলতে পারে: প্রথমত- অর্ডার পুনরুদ্ধার, এতে কোভিড-পরবর্তী মন্দা ও উচ্চ শুল্কে কমে যাওয়া অর্ডার ধীরে ধীরে ফিরতে পারে। দ্বিতীয়ত- দামের প্রতিযোগিতা, এতে ভিয়েতনাম, ভারত, কম্বোডিয়া- সবাই সমান শুল্ক দিলে বাংলাদেশের উৎপাদন খরচের সুবিধা কাজে লাগতে পারে। তৃতীয়ত- ছোট ও মাঝারি কারখানার সুযোগ পেলে কম ট্যারিফে ছোট প্রতিষ্ঠানও মার্কিন বাজারে ঢোকার সাহস পাবে।
এতে ঝুঁকির দিকগুলো হলো- ১. নীতিগত অস্থিরতা, ঘন ঘন পরিবর্তন ব্যবসায়িক পরিকল্পনা ভেঙে দেয়। ২. আইনি লড়াই, আদালতে সিদ্ধান্ত পাল্টালে বাজারে হঠাৎ ধাক্কা লাগতে পারে। ৩. বিশ্বরাজনীতি, বাণিজ্যযুদ্ধ বা ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা সরবরাহ শৃঙ্খল ভেঙে দিতে পারে। ৪. অর্ডার ‘স্লাইসিং’, ক্রেতারা বড় অর্ডারের বদলে ছোট ছোট চালানে আমদানি করতে পারে- যা উৎপাদন খরচ বাড়ায়।
কী করা উচিত বাংলাদেশের : বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু ট্যারিফ কমার অপেক্ষায় থাকলে চলবে না। কৌশলগত প্রস্তুতি দরকার। এতে করণীয় হলো- উৎপাদন দক্ষতা বাড়ানো; দ্রুত শিপমেন্ট; ভ্যালু-অ্যাডেড পণ্য তৈরি; নতুন বাজার (ইইউ, মধ্যপ্রাচ্য, লাতিন আমেরিকা) খোঁজা; ডলার আয় বৈচিত্র্য করা- অর্থাৎ একক বাজারের ওপর নির্ভরতা কমানোই দীর্ঘমেয়াদি সমাধান।
সুযোগ ও সতর্কতার সন্ধিক্ষণ : ১০ শতাংশ ট্যারিফ আপাতদৃষ্টিতে বাংলাদেশের জন্য ভালো খবর। কিন্তু এটি নিশ্চিত নিরাপত্তা নয়। আজ কম শুল্ক, কাল আবার বাড়তে পারে- এই বাস্তবতাই রফতানিকারকদের সবচেয়ে বড় উদ্বেগ। তাই সামনে পথ একটাই- নীতি পরিবর্তনের ওপর নির্ভর না করে নিজস্ব প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বাড়ানো।
যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে ১০ শতাংশ শুল্ক বাংলাদেশের তৈরী পোশাক খাতে নতুন সম্ভাবনার দরজা খুলে দিয়েছে। কিন্তু একই সাথে এটি মনে করিয়ে দিচ্ছে বিশ্ব বাণিজ্যে স্থায়িত্বের চেয়ে অনিশ্চয়তাই এখন নিয়ম।
বাংলাদেশের জন্য তাই কৌশলগত শিক্ষা স্পষ্ট : শুধু শুল্ক কমলেই উন্নতি নয়-দক্ষতা, বৈচিত্র্য ও স্থিতিস্থাপকতাই হবে টেকসই রফতানির মূল চাবিকাঠি।