বিশ্বকাপ ফুটবল ২০২৬

আর্জেন্টিনার রুদ্ধশ্বাস জয়ে স্বপ্নভঙ্গ কেপ ভার্দের

Printed Edition
first-3
কেপ ভার্দের বিপক্ষেও প্রথম গোল করেন আর্জেন্টাইন অধিনায়ক লিওনেল মেসি : ইন্টারনেট

রেফারির খেলা শেষের বাঁশি। আর্জেন্টিনার ৩-২ গোলে জয় নিশ্চিত হলো কেপ ভার্দের বিপক্ষে। তিনবারের বিশ্বকাপ জয়ীদের ঠিকানা এখন বিশ্বকাপের শেষ ১৬তে। তাই রেফারির ওই বাঁশি বাজার পর বাঁধভাঙা উল্লাসে মেতে ওঠার কথা আর্জেন্টিনার। অথচ গোলরক্ষক এমিলিয়ানো মার্টিনেজকে দেখা গেল হতাশ হয়ে মাটিতে শুয়ে পড়লেন। এরপর জার্সি নিয়ে মুখ ঢেকে টিভি ক্যামেরার সামনে দিয়ে চলে গেলেন মাঠ ছেড়ে। এই ফুটবলার মাটিতে শুয়ে জয়ের আনন্দ করলেও অন্যদের মুখে সেভাবে হাসি নেই। আসলে পুঁচকে কেপ ভার্দে যেভাবে লিওনেল মেসিদের চেপে ধরে ছিল, দুইবার পিছিয়ে পড়েও ম্যাচে ফিরেছিল এবং ৯০ মিনিটের খেলাকে ১২০ মিনিটে নিয়ে গিয়েছিল তা আর্জেন্টিনার জন্য লজ্জার। বর্তমান শিরোপাজয়ী এই খেতাবের পাশাপাশি তিনবারের বিশ্বসেরা। অথচ তাদের কী কঠিন চ্যালেঞ্জই ছুড়ে দিলো কেপ ভার্দে। ‘ছেড়ে দে মা কেঁদে বাঁচি’ অবস্থায় আর্জেন্টিনা যেন কোনোমতে পার পেয়েছে এই ম্যাচ। মেসিদের কষ্টের হাসির মধ্যেই চলছিল কেপ ভার্দের ফুটবলারদের হেরে যাওয়ার কান্না। অভিষেকে এসেই দুই বিশ্বচ্যাম্পিয়নকে রুখে ড্র নিয়ে মাঠ ছাড়া এবং বর্তমান চ্যাম্পিয়নদের নাভিশ্বাস তোলা। কেপ ভার্দে ভালো খেলে জিততে না পারলেও বীরের মতো বিদায় নিলো তারা। তাদের এই বীরত্ব ভুলবে না ফুটবলপ্রেমীরা।

গ্রুপ পর্বে অপরাজিত থেকে নকআউটে আসা আটলান্টিক মহাসাগরের ১২টি দ্বীপ ও ১৫৫৭ স্কয়ার মাইল আয়তনের দেশ কেপ ভার্দে। গ্রুপ পর্বে তারা সাবেক বিশ্বচ্যাম্পিয়ন স্পেন ও উরুগুয়েকে রুখে দেয়ার পর ড্র করেছিল সাবেক এশিয়া চ্যাম্পিয়ন সৌদি আরবের সাথে। তিন ড্রতে সেরা ৩২ আসা দলটির প্রতিপক্ষ লিওনেল মেসির অর্জেন্টিনা। যে দলের সবাই বিশ্বের নামী ক্লাবে খেলেন। গ্রুপ পর্বে যাদের তিন জয় ছিল আলজেরিয়া, অস্ট্রিয়া ও জর্দানের বিপক্ষে। তাই মেসির বর্তমান ক্লাব ইন্টার মিয়ামির শহরে এই ম্যাচে সবাই এগিয়ে রেখেছিল আর্জেন্টিনাকে। শুরু থেকেই কেপ ভার্দের ওপর চড়াও হয়ে খেলতে থাকা আর্জেন্টিনা ২৯ মিনিটে মেসির গোলে এগিয়ে গেলে সবাই মনে করেছিল সহজেই জিতে যাবে লিওনেল স্কালোনির দল। কিন্তু তা হতে দেয়নি ফিফা র‌্যাংকিংয়ে ৬১তে থাকা দলটি।

মেসি গোলটি করার আগে ১৪ ও ১৮ মিনিটে দু’টি চান্স মিস করেন। আর গোলটি করেছেন লিসান্দ্রো মার্টিনেজের লব থেকে বল পেয়ে রিসিভ করেই বাঁ পায়ের দর্শনীয় প্লেসিংয়ে গোল করেন তিনি। দুরূহ কোণ থেকেই এবং গোলরক্ষক ভোজিনহা প্রথম পোস্টে থাকার পরও বল জালে। বিশ্বকাপের টানা আট ম্যাচে গোল মেসির। এটি একটি রেকর্ড। সেই সাথে বিশ্বকাপে মোট ২০ গোল করে রেকর্ডকে আরো উঁচুতে নিয়ে গেলেন তিনি। ৪৫ মিনিটে লাউতারো মার্টিনেজের শট আটকে দেন কেপ ভার্দের গোলরক্ষক ভোজিনহা।

মিয়ামি স্টেডিয়ামে এই ১-০ গোলের লিড নিয়েই বিরতিতে যায় আর্জেন্টিনা। এরপর দ্বিতীয়ার্ধে শুরু হয় কেপ ভার্দের পাল্টা গোলের চেষ্টা। ৪৮ মিনেটে জাভনে কারভালের শট কর্নার করেন এমিলিয়ানো মার্টিনেজ। ৫২ ও ৫৩ মিনিটে আর্জেন্টিনা দু’টি চান্স মিস করার পরপরই ম্যাচে সমতা আনে কেপ ভার্দে। প্রায় অসম্ভব কোণ থেকে দেরয় দুয়ার্তে সামনে থাকা লিসান্দ্রো মার্টিনেজের দুই পায়ের মাঝখান দিয়ে যে শট নেন তা এমিলিয়ানো মার্টিনেজকে বোকা বানিয়ে বল জলে পাঠান দেরয় দুয়ার্তে।

এরপর শুরু হয় আর্জেন্টিনার ফের লিড নেয়ার প্রণান্ত চেষ্টা। তখনই শুরু হয় মেসি ও প্রতিপক্ষ গোলরক্ষক ভোজিনহার লড়াই। মেসি যে শটই পোস্টে নেন তা কোনো না কোনোভাবে প্রতিহত করতে থাকেন ভোজিনহা। ৬৩, ৭১ ও ইনজুরি টাইমের ৫ মিনিটে মেসির একটি শট ও দু’টি ফ্রি-কিক প্রতিহত করেন ৪০ বছর বয়সী গোলরক্ষক ভোজিনহা। এ ছাড়া ৬ মিনিটে নিকো গঞ্জালেসের শটেও বাধা কেপ ভার্দের গোলরক্ষকের। ইনজুরি টাইমের ২ মিনিটে পারেদেসের শটও গোলে যেতে দেননি তিনি। ফল ১-১ গোলের ড্রতেই শেষ ৯০ মিনিটের খেলা।

এরপর খেলা অতিরিক্ত সময়ে গড়ালে ৯২ মিনিটেই গোল আর্জেন্টিনার। লিওনেল মেসির কর্নার থেকে আসা বলে হেড করেন ম্যাক আলিস্টার। সেই বল নিয়ন্ত্রণে নিয়ে বাঁ পায়ের দর্শনীয় প্লেসিং শটে গোল করেন লিসান্দ্রো মার্টিনেজ। এই পিছিয়ে যাওয়ার পর আবার শুরু হয় কেপ ভার্দের ম্যাচে ফেরার মিশন। তবে এই যাত্রায় গোল করতে বেশি সময় নেয়নি কেপ ভার্দে। ১০৩ মিনিটে সিনড্রে কারভাল বক্সের ওপর থেকে ডান পায়ের প্রচণ্ড যে শট নেন তাতে কিছুই করার ছিল না এমিলিয়ানের মার্টিনেজের। কারভালের এই গোলটি এবারের এই বিশ্বকাপের অন্যতম সেরা।

আবার খেলায় সমতা। এতে আর্জেন্টিনার সমর্থকদের মধ্যে শুরু হয়ে যায় টেনশন। ১০৫ মিনিটে মেসি গোল করতে ব্যর্থ হলে শঙ্কা আরো তীব্র হয়। শেষ পর্যন্ত ১১১ মিনিটে মেসির কর্নার থেকে ক্রিশ্চিয়ানো রোমেরোর হেড তৃতীয় দফা লিড এনে দেয় আর্জেন্টিনাকে । কিন্তু কেপ ভার্দে লড়াই চালিয়ে যেতে থাকে। শেষ তিন মিনিটে আরো দু’টি চান্স পায় তারা। এর মধ্যে ১১৬ মিনিটে লোপেজ কাবরালের ফ্রি-কিক আর্জেন্টিনার এমিলিয়ানো মার্টিনেজ অসামান্য দক্ষতায় তা কর্নার করেন। পরে আর কোনো গোল না হওয়ায় সেরা ১৬তে নিশ্চিত হয় আর্জেন্টিনা। আর হতাশ হয়ে কাঁদতে কাঁদতে মাঠ ছাড়ে কেপ ভার্দের ফুটবলাররা। এই জয়ে আর্জেন্টনা এখন খেলবে মিসরের বিপক্ষে ৭ জুলাই রাত ১০টায়।