মোস্তাফিজ ইস্যু এবং বিভক্ত ক্রিকেটাঙ্গন
Printed Edition
জসিম উদ্দিন রানা
ক্রিকেট এমন একটি খেলা, যা সীমান্ত মানে না, রাজনীতি বুঝে না-বুঝে কেবল পারফরম্যান্স। অথচ সাম্প্রতিক সময়ে সেই ক্রিকেটই পরিণত হয়েছে রাজনৈতিক টানাপড়েনের কেন্দ্রবিন্দুতে। ভারতের আইপিএল থেকে মোস্তাফিজুর রহমানকে বাদ দেয়ার ঘটনায় বাংলাদেশের ক্রিকেট অঙ্গন আজ স্পষ্টতই দুই ভাগে বিভক্ত। কেউ বলছেন, বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড (বিসিবি) সঠিক সিদ্ধান্ত নিয়েছে; আবার তামিম ইকবাল বিসিবির ওই সিদ্ধান্তের সাথে একমত হতে পারেননি। একটি অক্রিকেটীয় সিদ্ধান্ত কিভাবে একটি দেশের ক্রিকেটকে ভাগ করে দিতে পারে, মোস্তাফিজ ইস্যু তার জলজ্যান্ত উদাহরণ।
মোস্তাফিজ কেবল একজন ক্রিকেটার নন, তিনি বাংলাদেশের ক্রিকেটের প্রতীকও। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ধারাবাহিক পারফরম্যান্স, আইপিএলের মতো মঞ্চে নিজেকে প্রমাণ করা একজন বোলারকে হঠাৎ করে দল থেকে বাদ দেয়া স্বাভাবিক কোনো ক্রিকেটীয় সিদ্ধান্ত নয়। আপত্তিটা এখানেই, এটা নিছক ক্রিকেটীয় সিদ্ধান্ত নয়, রাজনীতির সরাসরি হস্তক্ষেপ? তার নিরাপত্তার শঙ্কা তুলেই ভারত সরকারের ইশারায় মোস্তাফিজকে বাদ দিতে নির্দেশ দেয় বিসিসিআই।
এ কারণেই বিসিবি থেকে বলা হয়েছে, ফেব্রুয়ারিতে ভারতের মাটিতে হতে যাওয়া টি-২০ বিশ^কাপে জাতীয় দলের নিরাপত্তার স্বার্থ বিবেচনায় সেখানে গিয়ে বাংলাদেশ দল খেলতে নারাজ। দেশপ্রেমের বিষয় থাকায় বিরাট অংশই এটিকে সমর্থন করে বলছে-জাতীয় দলই সবার আগে। তবে ক্রিকেট সংশ্লিষ্ট কেউ কেউ ভবিষ্যতের আর্থিক ক্ষতি নিয়ে শঙ্কার কথা বলছেন।
একপক্ষ বিসিবির সিদ্ধান্তকে দেশপ্রেমের মোড়কে মুড়ে বাহবা দিচ্ছে, আরেক পক্ষ এটিকে অন্যভাবে দেখছে। এই বিভাজনের পেছনে বড় ভূমিকা রেখেছে একটি পক্ষ। ক্রিকেট বিশ্লেষণের বদলে কেউ কেউ রাজনৈতিক বয়ানকে প্রাধান্য দিচ্ছে, কেউ আবার উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে আগুনে ঘি ঢালছে। এতে সাধারণ দর্শক বিভ্রান্ত, ক্রিকেট ক্ষতিগ্রস্ত।
বাংলাদেশের শ্রীলঙ্কায় খেলতে যাওয়ার আবেদনে আইসিসির নীরবতা বা কালক্ষেপণ পরিস্থিতিকে আরো জটিল করে তুলেছে। আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের সর্বোচ্চ নিয়ন্ত্রক সংস্থা হিসেবে আইসিসির ভূমিকা হওয়া উচিত ছিল বিষয়টি দ্রুত পর্যালোচনা করা। কিন্তু কার্যকর কোনো অবস্থান না থাকায়, প্রশ্ন উঠছে, আইসিসি কি কেবল বড় শক্তির স্বার্থেই সক্রিয়, নাকি সদস্য দেশগুলোর ক্রিকেটারদের অধিকার রক্ষায়ও সমান দায়বদ্ধ?
ভারতের একটি অপরিণামদর্শী সিদ্ধান্তে ভারত-বাংলাদেশ ক্রিকেটীয় সম্পর্ক, ফ্র্যাঞ্চাইজি ক্রিকেটের পেশাদার পরিবেশ, এমনকি একজন খেলোয়াড়ের ব্যক্তিগত ক্যারিয়ার, সবকিছুই ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। রাজনীতি যখন ক্রীড়াঙ্গনকে গ্রাস করে, তখন পরাজিত হয় খেলাটাই।
প্রতিকারের পথ কোথায়? প্রথমত, বিসিবিকে ভবিষ্যতে আরো সূচচিন্তিত সিদ্ধান্ত নিতে হবে। বিশেষ করে ছাড়পত্র নীতিমালা স্পষ্ট হতে হবে। দ্বিতীয়ত, আইসিসিকে সক্রিয় হতে হবে, যাতে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে খেলোয়াড়দের অধিকার রাজনৈতিক চাপের কাছে জিম্মি না হয়। তৃতীয়ত, সব পক্ষকেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমকে কম গুরুত্ব দিতে হবে।
ক্রিকেট রাজনীতির ময়দান নয়। মোস্তাফিজের মতো একজন ক্রিকেটারের বাদ পড়া কোনো একক ঘটনা নয়, এটি একটি সতর্কবার্তা। এখনই যদি রাজনীতি ও ক্রিকেটের সীমারেখা স্পষ্ট না করা হয়, তাহলে ভবিষ্যতে আরো অনেক প্রতিভা এই টানাপড়েনে হারিয়ে যাবে। ক্রিকেট বাঁচাতে হলে, রাজনীতির প্রভাবমুক্ত থাকতে হবে। আজ মোস্তাফিজ, কাল আরেকজন।
এই ইস্যুতে এশিয়ার ক্রিকেট প্রশাসনের বিরুদ্ধে সরব বিসিবির সাবেক সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ আশরাফুল হক। তিনি সরাসরি আক্রমণ করেছেন আইসিসি চেয়ারম্যান জয় শাহকে। টাইমস অব ইন্ডিয়াকে তিনি বলেন, ‘জগমোহন ডালমিয়া, আইএস বিন্দ্রা, মাধবরাও সিন্ধিয়া, এন কে পি সালভে বা এমনকি এন শ্রীনিবাসনের সময়ে থাকলে মোস্তাফিজকে ঘিরে এমন ঘটনা কখনোই ঘটত না। ভারত, বাংলাদেশ, পাকিস্তান সব জায়গাতেই ক্রিকেট ব্যবস্থা রাজনীতিবিদদের হাতে জিম্মি হয়ে গেছে। আগে যারা ছিলেন তারা পরিণত মানুষ ছিলেন, ক্রিকেট বুঝতেন এবং একজন খেলোয়াড়ের ওপর এর প্রভাব কী হতে পারে, সেটাও জানতেন। বর্তমানে যাদের হাতে ক্রিকেট তারা কেউই কখনো ব্যাট ধরেননি। জয় শাহ কখনো প্রতিযোগিতামূলক ক্রিকেট খেলেননি। বিসিসিআইয়ের এই সিদ্ধান্ত রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত।
তিনি আরো বলেন, মোস্তাফিজের বদলে যদি লিটন দাস বা সৌম্য সরকার হতেন, তাহলে এমন সিদ্ধান্ত নেয়া হতো না। এটা সস্তা ধর্মীয় আবেগকে কাজে লাগানোর চেষ্টা। অপরিণত রাজনীতিবিদরা যখন ক্রিকেট চালায়, তখনই এমন হয়। পশ্চিমবঙ্গ ও আসামে নির্বাচন সামনে রেখে ভোটের রাজনীতি করা হচ্ছে। আর খেসারত দিতে হচ্ছে বিশ্বকাপের মতো আসরকে।