চট্টগ্রাম বন্দর চেয়ারম্যানের বিরুদ্ধে অভিযোগ নিয়ে নানা জিজ্ঞাসা

Printed Edition

নিজস্ব প্রতিবেদক

চট্টগ্রাম বন্দরের চেয়ারম্যান এস এম মনিরুজ্জামানের বিরুদ্ধে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) কর্তৃক অভিযোগ দাখিল ঘিরে জনমনে নানা জিজ্ঞাসা ঘুরপাক খাচ্ছে। কেউ কেউ বলছেন- এটি চট্টগ্রাম বন্দরে দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে সৎ ও দক্ষ কর্মকর্তাদের নিরুৎসাহিত করবে।

বাংলাদেশের অর্থনীতির প্রধান প্রবেশদ্বার চট্টগ্রাম বন্দর। দেশের প্রায় ৯০ শতাংশ আমদানি-রফতানি এই বন্দর ঘিরেই। ফলে এই প্রতিষ্ঠানের নেতৃত্বকে ঘিরে যেকোনো অনুসন্ধান কেবল ব্যক্তিগত বা প্রশাসনিক বিষয় নয়; এটি সরাসরি জাতীয় অর্থনীতি, বিনিয়োগ পরিবেশ এবং আন্তর্জাতিক আস্থার প্রশ্নটি ওতপ্রোতভাবে জড়িত।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, বাংলাদেশ শিপিং করপোরেশনের (বিএসসি) এমডি থাকাকালে জাহাজ ক্রয়ে অনিয়মের অভিযোগ এবং কর্ণফুলী নদীতে ড্রেজিং-সংক্রান্ত দুর্নীতির অভিযোগ আনা হয়েছে এই কর্মকর্তার বিরুদ্ধে। কিন্তু সেক্ষেত্রে তথ্য ও সময়ের ফারাক থাকার কথা বলছেন বন্দর ও বিএসসি সংশ্লিষ্টরা।

দুদকের বক্তব্য অনুযায়ী বাংলাদেশ শিপিং করপোরেশন বা বিএসসিতে জাহাজ ক্রয়ে অনিয়ম হয়েছে তার দায়িত্বকালে। কিন্তু সূত্রের দাবি, সংশ্লিষ্ট ক্রয় প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়েছিল তিনি বিএসসি ত্যাগ করার পর। অর্থাৎ যে সময়ের সিদ্ধান্ত, সে সময় তিনি দায়িত্বে ছিলেন না।

একইভাবে, কর্ণফুলী নদীতে ড্রেজিং-সংক্রান্ত অনিয়মের অভিযোগ ২০১৯ সালের ঘটনা। কিন্তু মনিরুজ্জামান চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষে যোগ দেন ২০২৪ সালের জুলাইয়ে। বন্দর সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, চট্টগ্রাম বন্দরেরর ২৯৫ কোটি টাকার ক্যাপিটাল ড্রেজিং প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করেছে ডিপিএম পদ্ধতিতে বাংলাদেশ নৌবাহিনী। এর মধ্যে ক্যাপিটাল ড্রেজিংয়ের কাজ শেষ হয় ২০২২ সালে। আর চুক্তি অনুযায়ী ৩ বছর ধরে চলে মেনটেনেন্স ড্রেজিং কার্যক্রম যা গত বছরের জুনে শেষ হয়। আর মেনটেনেন্স ড্রেজিংয়ের সাব কনট্রাক্টর হিসেবে নিয়োজিত ছিল ই-ইঞ্জিনিয়ারিং কনস্ট্রাকশন কোম্পানি নামে সাইফ পাওয়ারটেকের একটি প্রতিষ্ঠান। ফলে তিনি বন্দরে যোগদানের আগের একটি ঘটনার সাথে তার সম্পৃক্ততা প্রমাণের যুক্তিসংগত ভিত্তি নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, রিয়ার এডমিরাল এস এম মনিরুজ্জামান, বাংলাদেশ নৌবাহিনীতে দক্ষ কর্মকর্তা হিসেবেই পরিচিত। তার দীর্ঘ কর্মজীবন বেশ সুনামের। ২০২৪ সালের জুলাই অভ্যুত্থানের সময় যখন বন্দর কার্যক্রম ঝুঁকির মুখে পড়ে, তখন দেশের গেটওয়ে খ্যাত এই বন্দরের দায়িত্ব পড়ে তার ঘাড়ে। দ্রুত সিদ্ধান্ত ও সমন্বয়ের মাধ্যমে বন্দর কার্যক্রম স্থিতিশীল হয়। জাহাজের গড় অপেক্ষার সময় কমে আসে, সরবরাহচক্র সচল থাকে।

২০২৪-২৫ অর্থবছরে বন্দর ৩২,৯৬,০৬৭ টিইইউ কনটেইনার হ্যান্ডলিং করে নতুন রেকর্ড গড়ে। রাজস্ব আয় বেড়ে ৫,২২৭.৫৫ কোটি টাকা; উদ্বৃত্ত ২,৯১২.৬৯ কোটি টাকা। সদ্য সমাপ্ত বছরে লাভ ৩,১৪২ কোটি ৬৮ লাখ টাকা গত পাঁচ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ। সরকারের কোষাগারে ভ্যাট ও কর-বহির্ভূত আয় হিসেবে জমা হয়েছে ১,৮০৪ কোটি টাকা, যা আগের বছরের তুলনায় ৫.৪১ শতাংশ বেশি।

এমন অগ্রগতির প্রেক্ষাপটে দীর্ঘ সুনামের অধিকারী এবং বন্দর কর্তৃপক্ষ পরিচালনায় ঈর্ষণীয়ভাবে সফল একজন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে অভিযোগ উত্থাপন করা অনেকের কাছে উদ্দেশ্যপ্রণোদিত মনে হওয়াই স্বাভাবিক।

দায়িত্ব নেয়ার পর এস এম মনিরুজ্জামান ই-বিলিং, অনলাইন পেমেন্ট ও ওয়ানস্টপ সার্ভিস চালু করেন। এতে অপ্রয়োজনীয় ব্যয় কমে এবং দীর্ঘদিনের অনিয়মে আঘাত লাগে। যে সব গোষ্ঠী অনিয়ম থেকে সুবিধা পেত, তাদের স্বার্থে আঘাত লাগা অস্বাভাবিক নয়। ফলে একটি স্বার্থান্বেষী মহল অপসারণের পরিবেশ তৈরিতে সক্রিয় এমন সন্দেহ উড়িয়ে দেয়া যায় না।

চট্টগ্রাম বন্দরের একাধিক কর্মকর্তা নয়া দিগন্তকে বলেন, এস এম মনিরুজ্জামানের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগের সময়সীমা ও দায়িত্বকাল পরস্পর সাংঘর্ষিক। তার দীর্ঘ সুনামের সামরিক ক্যারিয়ার, সঙ্কটকালে কার্যকর নেতৃত্ব এবং বন্দরের দৃশ্যমান অগ্রগতি- সব মিলিয়ে দুদকের অভিযোগ মারাত্মকভাবে বিভ্রান্তিকর।