অ্যাবের সেমিনার

বাজেটে কৃষি খাতে বরাদ্দ বাড়ানোর দাবি

Printed Edition
3rd-1
কৃষিবিদ ইনস্টিটিউশনে অ্যাবের সেমিনারে বক্তব্য রাখেন রুহুল কবির রিজভী আহমেদ : নয়া দিগন্ত

নিজস্ব প্রতিবেদক

দেশের খাদ্যনিরাপত্তা, কর্মসংস্থান, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ এবং কৃষির টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিত করতে জাতীয় বাজেটে কৃষি খাতে বরাদ্দ উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ানোর দাবি জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক ও শিল্পবিষয়ক উপদেষ্টা এবং বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী আহমেদ। একই সাথে কৃষি গবেষণা, সম্প্রসারণ ও উন্নয়নকার্যক্রমে জাতীয় বাজেটের অন্তত ১০ শতাংশ বরাদ্দ নিশ্চিত করার আহ্বান জানিয়েছেন দেশের শীর্ষস্থানীয় কৃষিবিদরা।

গতকাল সোমবার রাজধানীর খামারবাড়ির কৃষিবিদ ইনস্টিটিউশন বাংলাদেশ (কেআইবি) অডিটোরিয়ামে অ্যাগ্রিকালচারিস্টস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (অ্যাব) আয়োজিত ‘বাজেট ২০২৬-২৭: কৃষি উন্নয়নের রূপরেখা ও বাস্তবায়নের চ্যালেঞ্জ’ শীর্ষক সেমিনারে বক্তারা এসব কথা বলেন।

সেমিনারে প্রধান অতিথির বক্তব্যে রুহুল কবির রিজভী বলেন, বাংলাদেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি ও খাদ্যনিরাপত্তার মূল চালিকাশক্তি কৃষি। তাই এ খাতের টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিত করতে কৃষিবান্ধব নীতি, গবেষণা এবং উৎপাদনমুখী পরিকল্পনার কোনো বিকল্প নেই। তিনি দেশের কৃষি উন্নয়নে কৃষিবিদদের আরো নিরলসভাবে কাজ করে যাওয়ার আহ্বান জানান এবং প্রস্তাবিত বাজেটে কৃষিকে আরো বেশি অগ্রাধিকার দেয়ার যৌক্তিকতা তুলে ধরেন।

তিনি বলেন, জাতীয় বাজেট ১৭ দশমিক ৭ শতাংশ বৃদ্ধি পেলেও সেই তুলনায় কৃষি খাতের বরাদ্দের বৃদ্ধি খুব বেশি নয়। সরকার যে লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে, তা বাস্তবায়নে কৃষি খাতে আরো বরাদ্দ ও কার্যকর নজরদারি প্রয়োজন।

রিজভী বলেন, চলতি বাজেটে কৃষি খাতে বরাদ্দ গত বছরের তুলনায় বাড়লেও মূল্যস্ফীতির বিষয়টি বিবেচনায় নিলে এ বৃদ্ধি খুব বেশি নয়। দেশের প্রায় ৪০ শতাংশ মানুষের কর্মসংস্থান কৃষিকে কেন্দ্র করে। অর্থনীতিতে কৃষির অবদান বর্তমানে পাঁচ থেকে ছয় শতাংশের মধ্যে থাকলেও এটিকে সাত থেকে আট শতাংশে উন্নীত করার লক্ষ্য নেয়া উচিত। এজন্য কৃষি খাতে আরো বেশি বিনিয়োগ ও বাজেট বরাদ্দ প্রয়োজন। রিজভী আরো বলেন, কৃষিকে শুধু উৎপাদনের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখলে হবে না; সংরক্ষণ, প্রক্রিয়াজাতকরণ ও বাজারজাতকরণেও সমান গুরুত্ব দিতে হবে। ভিয়েতনাম আগে বাংলাদেশ থেকে এক লাখ টন আলু আমদানি করলেও এ বছর মাত্র ৩০ টন নিচ্ছে। এ অবস্থা থেকে উত্তরণে কৃষিপণ্যের গুণগত মান, সংরক্ষণ ও রফতানি সক্ষমতা বাড়াতে হবে। আম, পেঁয়াজ, সবজি ও অন্যান্য ফলমূল সংরক্ষণের কার্যকর ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। কৃষির সবক্ষেত্রে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জনের পাশাপাশি কৃষিভিত্তিক শিল্পে বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। নিউজিল্যান্ড ও ডেনমার্ক কৃষির ওপর ভিত্তি করেই উন্নয়ন করেছে। মূল্যস্ফীতি ৬ শতাংশে নামিয়ে আনতে হলে কৃষিভিত্তিক শিল্পে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে।

সেমিনারে কৃষির দীর্ঘমেয়াদি ও টেকসই উন্নয়নের জন্য চারটি সুপারিশ তুলে ধরা হয়। এগুলো হলো- জাতীয় বাজেটের ন্যূনতম ১০ শতাংশ কৃষি গবেষণা ও সম্প্রসারণ খাতে বরাদ্দ নিশ্চিত করা, ফসলের অপচয় রোধে আধুনিক কোল্ড চেইন ও হিমাগার অবকাঠামো নির্মাণ, ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষকদের সহজ শর্তে ও আমলাতান্ত্রিক জটিলতামুক্ত প্রাতিষ্ঠানিক ঋণ প্রদান এবং স্মার্ট কৃষি ও ডিজিটাল সেবা সম্প্রসারণে পৃথক বাজেট বরাদ্দ রাখা।

বিশেষ অতিথির বক্তব্যে কৃষিসচিব ড. রফিকুল ই. মোহাম্মদ হক বলেন, কৃষি খাতের বড় অংশের অর্থ সার আমদানি এবং সেচের জ্বালানিতে ব্যয় হয়। সৌরশক্তির ব্যবহার বাড়াতে হবে এবং আধুনিক বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির সাথে কৃষির সংযোগ জোরদার করতে হবে। ইউরিয়ার ব্যবহার কমিয়ে বিকল্প জৈব সারের ব্যবহার বাড়ানোর পাশাপাশি মরক্কোতে বছরে এক হাজার কৃষি শিক্ষার্থী পাঠানোর উদ্যোগ নিয়েও আলোচনা চলছে।

মূল প্রবন্ধ উপস্থাপক বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের কৃষি অর্থনীতি ও গ্রামীণ সমাজবিজ্ঞান অনুষদের অধ্যাপক ড. মো: আক্তারুজ্জামান খান বলেন, কৃষি খাতে এভাবে বাজেট কমানো হলে দেশের খাদ্যনিরাপত্তা হুমকির মুখে পড়বে।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের মহাপরিচালক কৃষিবিদ মো: আব্দুর রহিম বলেন, কৃষি খাতের বরাদ্দের প্রায় ৮০ শতাংশই সারে ব্যয় হয়। উন্নয়ন বরাদ্দ বাড়ানো প্রয়োজন। তিনি জানান, ১০০ এলাকায় ৪২ লাখ কৃষককে কৃষি কার্ড দেয়া হবে। রফতানিমুখী কৃষি গড়ে তুলতে কৃষিযন্ত্র আমদানিতে বাজেট বৃদ্ধি ইতিবাচক পদক্ষেপ। একই সাথে দক্ষ জনবল তৈরিতে প্রশিক্ষণ খাতে বরাদ্দ বাড়ানোর প্রয়োজন রয়েছে। ভোজ্যতেল প্রক্রিয়াকরণ শিল্পে ১০ বছরের কর অবকাশও ইতিবাচক উদ্যোগ বলে তিনি মন্তব্য করেন।

অ্যাবের আহ্বায়ক কৃষিবিদ ড. কামরুজ্জামান কায়সারের সভাপতিত্বে এবং সদস্যসচিব কৃষিবিদ শাহাদত হোসেন বিপ্লবের সঞ্চালনায় অনুষ্ঠিত সেমিনারে দীপ্ত টেলিভিশনের হেড অব নিউজ এস এম আকাশ, অ্যাবের এক্সিকিউটিভ চেয়ারম্যান কৃষিবিদ আব্দুস সালামসহ কৃষি খাতের বিভিন্ন পর্যায়ের বিশেষজ্ঞরা অংশ নেন।