মদিনার সোনালি যুগ
Printed Edition
ইয়াছিন ইবনে ফিরোজ
তারিক তার দাদার কোলে বসে রূপকথার গল্প শুনতে ভীষণ ভালোবাসে। তবে আজ সে দাদার কাছে কোনো ড্রাগন বা রাজকন্যার গল্প শুনতে চায় না। তার আগ্রহ অন্য এক রাজ্যের গল্পে, যে রাজ্যের রাজা ছিলেন একজন নবী ও রাসূল। আর সে রাজ্যের সংবিধান ছিল ঐশী গ্রন্থ আল কুরআন । দাদুভাই, আজ তুমি আমাকে মদিনা রাষ্ট্রের গল্প শোনাবে? তারিক চোখ বড় বড় করে বলল। আর বলবে, কীভাবে আমাদের প্রিয় নবীজি সা: শুধু একজন নবী ও রাসূল হয়েও এত সুন্দর একটি দেশ বানিয়েছিলেন? দাদু হাসলেন। অবশ্যই, তারিক বাবা। মদিনা রাষ্ট্রের গল্প কোনো রূপকথার গল্পের চেয়েও কম নয়; বরং এটি সত্যি হওয়াতে এর সৌন্দর্য আরো বহুগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। দাদু বলতে শুরু করলেন, আজ থেকে প্রায় সাড়ে চৌদ্দ শ’ বছর আগের কথা। মক্কার কুরাইশরা যখন আমাদের নবীজি হজরত মুহাম্মদ সা: এবং তাঁর সাথীদের ওপর জুলুমের পাহাড় চাপাচ্ছিল, তখন আল্লøাহর নির্দেশে তাঁরা মদিনায় হিজরত করলেন। জানো তারিক, এই হিজরত শুধু একটি জায়গা বদলানো ছিল না, এটি ছিল এক নতুন ইতিহাসের সূচনা।
তারিক মনোযোগ দিয়ে শুনছে। মদিনায় তখন বিভিন্ন গোত্রের মানুষ বসবাস করত। মুসলিমরা ছিল নতুন। সেখানে ইহুদি ও আরবের বিভিন্ন গোত্রও ছিল। এই ভিন্ন ভিন্ন মানুষদের এক ছাদের নিচে আনা খুব কঠিন কাজ ছিল। কিন্তু আমাদের নবীজি সা: তাঁর রাজনৈতিক দূরদর্শিতা দিয়ে সেই কঠিন কাজটি খুব সহজেই করে ফেললেন। কীভাবে করলেন দাদু? তারিক প্রশ্ন করল। তিনি তৈরি করলেন এক অসাধারণ চুক্তি, যার নাম ‘মদিনা সনদ’। জানো তারিক, এটি ছিল পৃথিবীর ইতিহাসে প্রথম লিখিত সংবিধানগুলোর মধ্যে একটি! এই সনদে বলা হয়েছিল, মদিনায় বসবাসকারী সব গোত্র, মুসলিম, ইহুদি বা অন্য ধর্মের মানুষ, সবাই মিলে একটি জাতি (উম্মাহ) হিসেবে বাস করবে। তার মানে সবাই মিলেমিশে থাকবে? হ্যাঁ, একদম ঠিক ধরেছ। এই সনদে সবার ধর্মীয় স্বাধীনতার নিশ্চয়তা দেয়া হয়েছিল। কেউ কারো ধর্ম পালনে বাধা দেবে না। যখন কোনো বাইরের শত্রু মদিনা আক্রমণ করবে, তখন সবাই মিলে এক হয়ে লড়বে। জানো তারিক, এই সনদের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ ছিল, বনু আউফ, বনু সায়েদা, বনু জাওশাম, মদিনায় যত গোষ্ঠী আছে, তারা সবাই মিলে এক জাতি। এটি ছিল মুহাম্মদ সা: এক বিশাল রাজনৈতিক পদক্ষেপ।
ওয়াও! তারিক মুগ্ধ। তারপর কী হলো দাদু? নবীজি সা: শুধু একটি চুক্তি করেই থেমে যাননি। তিনি মদিনার বিচার ব্যবস্থা এমনভাবে সাজালেন, যেখানে সবাই সমান। ধনী-গরিব, ক্ষমতাশীল-দুর্বল,সবার জন্য ছিল একই আইন। তিনি কুরআনের এই আয়াত মেনে চলতেন, যেখানে আল্লাহ বলেছেন- ‘নিশ্চয়ই আল্লাহ তোমাদেরকে আদেশ করছেন, গচ্ছিত বিষয় ওর অধিকারীকে অর্পণ কর এবং যখন তোমরা লোকদের মধ্যে বিচার মীমাংসা করো তখন ন্যায় বিচার করো; অবশ্যই আল্লাহ তোমাদেরকে উত্তম উপদেশ দান করছেন; নিশ্চয়ই আল্লাহ শ্রবণকারী, পরিদর্শক।’ (সূরা আন-নিসা : ৫৮)
মুহাম্মদ সা: সব সময় এই নীতিতে বিশ্বাস করতেন। যখন একবার এক ধনী পরিবারের নারী চুরি করেছিল, তখন অনেকেই তাকে শাস্তি থেকে বাঁচাতে চেয়েছিল। কিন্তু নবীজি সা: স্পষ্ট বলে দিয়েছিলেন, যদি ফাতিমা বিনতে মুহাম্মদও চুরি করত, তবে আমি তারও হাত কেটে দিতাম! এই ছিল তাঁর ন্যায়ের দৃষ্টান্ত। তারিক ভাবছে, এমন একজন শাসক যদি এখন থাকত! নবীজি সা: যখন কোনো গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিতেন, তখন তিনি একা একা নিতেন না। তিনি তাঁর সাহাবিদের সাথে পরামর্শ (শূরা) করতেন। কুরআনে আল্লাহ নিজেই পরামর্শের গুরুত্ব সম্পর্কে বলেছেন- ‘যারা গুরুতর পাপ ও অশ্লীল কাজ থেকে বেঁচে থাকে এবং ক্রোধাবিষ্ট হয়েও ক্ষমা করে দেয়। যারা তাদের রবের আহ্বানে সাড়া দেয়, সালাত কায়েম করে, নিজেদের মধ্যে পরামর্শের মাধ্যমে নিজেদের কাজ সম্পাদন করে এবং তাদেরকে আমি যে রিজিক দিয়েছি তা থেকে ব্যয় করে এবং যারা অত্যাচারিত হলে প্রতিশোধ গ্রহণ করে। মন্দের প্রতিফল অনুরূপ মন্দ দ্বারা এবং যে ক্ষমা করে ও আপস-নিষ্পত্তি করে তার পুরস্কার আল্লাহর কাছে রয়েছে। আল্লাহ জালিমদের পছন্দ করেন না।’ (সূরা আশ-শুরা : ৪০)
এই পরামর্শের মাধ্যমেই তিনি সবার মতামত শুনতেন এবং সেরা সিদ্ধান্তটি নিতেন। এটি ছিল তাঁর গণতান্ত্রিক মনোভাবের এক অপূর্ব উদাহরণ। তার মানে তিনি একজন ভালো নেতা ছিলেন, তাই না দাদু? হ্যাঁ, তারিক। শুধু ভালো নেতা নয়, তিনি ছিলেন ইতিহাসের সর্বশ্রেষ্ঠ নেতা। তিনি মানুষের প্রতি কতটা দয়াশীল আর দায়িত্বশীল ছিলেন, তা হাদিসে স্পষ্ট, তোমাদের প্রত্যেকেই দায়িত্বশীল এবং তোমাদের প্রত্যেককেই নিজ নিজ দায়িত্ব সম্পর্কে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে। রাষ্ট্রের শাসকও একজন দায়িত্বশীল, তাকে তার জনগণ সম্পর্কে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে।’ (বুখারি-৭১৩৮) নবীজি সা: সবসময় এই দায়িত্ববোধ নিয়ে কাজ করতেন।
কিন্তু দাদু, মক্কার লোকেরা কি পরে আবার ঝামেলা করেছিল? হ্যাঁ, করেছিল। কিন্তু মুহাম্মদ সা: যুদ্ধ এড়াতে কূটনীতি ব্যবহার করেছেন। হুদায়বিয়ার সন্ধি ছিল তারই এক উদাহরণ। প্রথম দিকে সন্ধির শর্তগুলো মুসলিমদের জন্য কঠিন মনে হলেও, পরে দেখা গেল এটিই মক্কা বিজয়ের পথ খুলে দিয়েছে। এতে বোঝা যায়, মুহাম্মদ সা: কতটা দূরদর্শী রাজনীতিবিদ ছিলেন। তারপর মক্কা জয় হলো?
অবশেষে হলো; কিন্তু যখন তিনি মক্কা জয় করলেন, তখন তিনি কোনো প্রতিশোধ নেননি। তিনি মক্কাবাসীকে সাধারণ ক্ষমা ঘোষণা করলেন। যারা তাঁর জীবনকে দুর্বিষহ করে তুলেছিল, তাদের সবাইকে ক্ষমা করে দিলেন। এটি ছিল তাঁর রাজনৈতিক জীবনের সবচেয়ে উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত, যা ইতিহাসে বিরল। তারিক তার দাদার মুখের দিকে তাকিয়ে আছে। তার মনে হচ্ছে, সে যেন মুহাম্মদ সা:-এর সাথে মদিনার সেই সোনালি দিনে হেঁটে বেড়াচ্ছে। দেখলে তারিক, আমাদের নবীজি হজরত মুহাম্মদ সা: শুধু একজন নবী ও রাসূল ছিলেন না, তিনি ছিলেন একজন সফল রাষ্ট্রনায়ক, একজন দূরদর্শী রাজনীতিবিদ। তাঁর তৈরি করা মদিনা রাষ্ট্র শুধু একটি ভূখণ্ড ছিল না, এটি ছিল আদর্শ, ন্যায়বিচার আর মানবিকতার এক উজ্জ্বল প্রতীক। তিনি শিখিয়ে গেছেন, কীভাবে আল্লাহর বিধান মেনে একটি সুন্দর, শান্তিময় ও সমৃদ্ধ রাষ্ট্র গঠন করা যায়। তারিক দীর্ঘশ্বাস ফেলল। দাদু, আমিও মুহাম্মদ সা:-এর আদর্শে বড় হতে চাই , যে ন্যায় প্রতিষ্ঠা করতে পারবে, আর সবার সাথে মিলেমিশে থাকতে পারবে।
দাদু তারিকের মাথায় হাত বুলিয়ে বল্লেন ইনশাআল্লাহ।