টানা বৃষ্টি, পাহাড়ি ঢল ও জোয়ারে বিপর্যস্ত জনপদ
নেত্রকোনা ও রামগতির বিস্তীর্ণ এলাকা প্লাবিত
Printed Edition
নয়া দিগন্ত ডেস্ক
টানা বর্ষণ, ভারতের উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢল এবং মেঘনা নদীর অস্বাভাবিক জোয়ারে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে বন্যা পরিস্থিতির অবনতি হয়েছে। নেত্রকোনার সীমান্তবর্তী কলমাকান্দা ও দুর্গাপুরে পাহাড়ি ঢলে বিস্তীর্ণ এলাকা প্লাবিত হয়েছে। অন্য দিকে লক্ষ্মীপুরের রামগতিতে জোয়ারের পানির চাপে মেঘনা নদীর নির্মাণাধীন তীর সংরক্ষণ বাঁধ ভেঙে লোকালয়ে পানি ঢুকেছে। দুই জেলায়ই সড়ক, কৃষিজমি, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও বসতবাড়ির ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির পাশাপাশি জনজীবন মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে।
নেত্রকোনা প্রতিনিধি জানান, গত কয়েক দিনের টানা বৃষ্টি এবং ভারতের মেঘালয় থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে নেত্রকোনার সীমান্তবর্তী কলমাকান্দা ও দুর্গাপুর উপজেলার বিস্তীর্ণ এলাকা প্লাবিত হয়েছে। এতে হাজারো মানুষ পানিবন্দী হয়ে পড়ায় তাদের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। কলমাকান্দার গণেশ্বরী ও উব্দাখালী নদী এবং দুর্গাপুরের নিতাই নদীর পানি বিপদসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। সোমেশ্বরী নদীর পানিও বিপদসীমার কাছাকাছি অবস্থান করছে।
পাহাড়ি ঢলের তীব্র স্রোতে কলমাকান্দা উপজেলার খারনৈ ইউনিয়নের গজারমারী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ধসে গেছে। বিদ্যালয়ের আসবাবপত্র ও শিক্ষা উপকরণ ভেসে গেছে। নলছাপড়া বাজার থেকে বালুচড়া পর্যন্ত সড়কের বিভিন্ন স্থানে ভাঙন ও বড় বড় গর্ত সৃষ্টি হওয়ায় যান চলাচল বন্ধ রয়েছে। এতে স্থানীয় বাসিন্দাদের দুর্ভোগ চরমে পৌঁছেছে।
ঢলের পানির সাথে ভেসে আসা বালুতে বিস্তীর্ণ কৃষিজমি ঢেকে গেছে। রোপা আমনের বীজতলা নষ্ট হয়েছে এবং অনেকগুলো পুকুরের মাছ ভেসে গেছে। বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও বসতবাড়িতে পানি প্রবেশ করায় মানুষের দৈনন্দিন জীবনযাত্রা বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। এ অবস্থায় কৃষকেরা বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির আশঙ্কায় এখন শঙ্কিত।
গত সোমবার ভোর থেকে দুর্গাপুর উপজেলার খারনৈ, নাজিরপুর, রংছাতি ও লেঙ্গুরা ইউনিয়নের অন্তত ১০ থেকে ১১টি গ্রামে বানের পানি ঢুকে পড়ে। স্থানীয়দের অভিযোগ, পানির উচ্চতা দ্রুত বাড়তে থাকায় অনেক পরিবার নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে বাড়িঘর ছেড়ে যেতে বাধ্য হচ্ছে।
কলমাকান্দার ভারপ্রাপ্ত উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মুহাম্মদ শামসুজ্জামান আসিফ বলেন, ক্ষতিগ্রস্ত এলাকার পরিস্থিতি সার্বক্ষণিক পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে এবং প্রয়োজনীয় সহায়তার প্রস্তুতি নেয়া হয়েছে। পানি উন্নয়ন বোর্ড জানিয়েছে, উব্দাখালী নদীর পানি কলমাকান্দা পয়েন্টে বিপদসীমার ১৭ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। ফলে নতুন নতুন এলাকা প্লাবিত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
রামগতি (লক্ষ্মীপুর) সংবাদদাতা জানান, অমাবস্যার প্রভাবে মেঘনা নদীর অস্বাভাবিক জোয়ার এবং ভারী বৃষ্টির কারণে লক্ষ্মীপুরের রামগতি উপজেলার নির্মাণাধীন তীর সংরক্ষণ বাঁধের একাধিক স্থানে ভাঙন দেখা দিয়েছে। ভাঙা অংশ দিয়ে লোকালয়ে জোয়ারের পানি ঢুকে অন্তত ১৫টি গ্রামের বিস্তীর্ণ অঞ্চল প্লাবিত হয়েছে। এতে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে বসতবাড়ি, সড়ক ও কৃষিজমি। এ অবস্থায় স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ছে।
প্লাবিত গ্রামের মধ্যে রয়েছে পশ্চিম বালুরচর, জনতাবাজার, সোনালীগ্রাম, বাংলাবাজার, সবুজগ্রাম, শিক্ষাগ্রাম, সেবাগ্রাম, চর আলগী, গাবতলী, চর রমিজ, বড়খেরী, চর গাজী, চর গজারিয়া, তুলিরচর ও চর সেবা। জোয়ারের পানির স্রোতে অভ্যন্তরীণ সড়কের বিভিন্ন অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। অনেক পুকুর ও মাছের ঘের তলিয়ে গিয়ে মাছ ভেসে গেছে। কয়েকশ হেক্টর আউশ ও আমনের বীজতলা ডুবে রয়েছে।
সরজমিনে বড়খেরী ইউনিয়নের রঘুনাথপুর তীররক্ষা বাঁধ এলাকায় দেখা যায়, নদীর তীব্র ঢেউয়ের আঘাতে সিসি ব্লকবিহীন অংশের মাটি সরে গিয়ে প্রায় ৪০ থেকে ৫০ ফুট বাঁধ ধসে গেছে। ওই ভাঙা অংশ দিয়ে অব্যাহতভাবে লোকালয়ে পানি প্রবেশ করছে। স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, বাঁধটির বিভিন্ন অংশ আগে থেকেই ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় ছিল। কয়েক মাস আগে ধস দেখা দিলেও প্রয়োজনীয় সংস্কার না করায় এবার বড় ধরনের ভাঙন সৃষ্টি হয়েছে।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা শেখ এহসান উদ্দিন বলেন, বাঁধের ক্ষতিগ্রস্ত অংশের বিষয়টি পানি উন্নয়ন বোর্ডকে জানানো হয়েছে এবং দ্রুত ব্যবস্থা নেয়ার অনুরোধ করা হয়েছে। বড়খেরী অংশের দায়িত্বে থাকা পাউবোর উপসহকারী প্রকৌশলী আমিন নঈম জানান, ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা পরিদর্শনের পর জরুরি ভিত্তিতে কাজ এগিয়ে নেয়া হবে। লক্ষ্মীপুর পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী নাহিদ-উজ-জামান খান বলেন, নদীর তীব্র স্রোত ও ঢেউয়ের কারণে এ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। ভাঙা বাঁধ জরুরি ভিত্তিতে সংস্কারের উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে, যাতে ভবিষ্যতে লোকালয়ে পানি প্রবেশের ঝুঁকি কমানো যায়।