রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের প্রতিবেদন

নভেম্বরে সড়কে প্রাণহানি বেড়েছে ১৩.২২ শতাংশ

Printed Edition

নিজস্ব প্রতিবেদক

গত নভেম্বর মাসে দেশে ৫৩৪টি সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত হয়েছেন ৪৮৩ জন এবং আহত হয়েছেন এক হাজার ৩১৭ জন। এর মধ্যে ২২৭টি মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় নিহত ১৯৪ জন, যা মোট নিহতের ৪০ দশমিক ১৬ শতাংশ। মোটরসাইকেল দুর্ঘটনার হার ৪২ দশমিক ৫০ শতাংশ। গত অক্টোবর মাসে সড়ক দুর্ঘটনায় প্রতিদিন গড়ে নিহত হয়েছিল ১৪ দশমিক ২২ জন। নভেম্বর মাসে নিহত হয়েছে ১৬ দশমিক একজন। এই হিসাবে নভেম্বর মাসে প্রাণহানি বেড়েছে ১৩.২২ শতাংশ। গতকাল বৃহস্পতিবার রোড সেফটি ফাউন্ডেশন এক প্রতিবেদনে এসব তথ্য তুলে ধরে।

রোড সেফটি ফাউন্ডেশন জানায়, সড়ক দুর্ঘটনায় নিহতের মধ্যে নারী ৬৪ জন, যা মোট নিহতের ১৩ দশমিক ২৫ শতাংশ। এ ছাড়াও শিশু নিহত হয় ৭১ জন, যা মোট নিহতের ১৪ দশমিক ৬৯ শতাংশ। অন্য দিকে দুর্ঘটনায় ১০৬ জন পথচারী নিহত হয়েছেন, যা মোট নিহতের ২১ দশমিক ৯৪ শতাংশ। যানবাহনের চালক ও সহকারী নিহত হয়েছেন ৫৭ জন, অর্থাৎ ১১ দশমিক ৮০ শতাংশ। এই সময়ে ছয়টি নৌ-দুর্ঘটনায় সতজন নিহত এবং পাঁচজন নিখোঁজ রয়েছে। ৪৭টি রেল ট্র্যাক দুর্ঘটনায় ৩৮ জন নিহত এবং ৯ জন আহত হয়েছেন।

দুর্ঘটনার সময় বিশ্লেষণে দেখা যায়, দুর্ঘটনাগুলো ঘটেছে ভোরে চার দশমিক ৮৬ শতাংশ, সকালে ২০ দশমিক ৯৭ শতাংশ, দুপুরে ১৯ দশমিক ১০ শতাংশ, বিকেলে ১৭ দশমিক ৭৯ শতাংশ, সন্ধ্যায় ১৯ দশমিক ৮৫ শতাংশ এবং রাতে ১৭ দশমিক ৪১ শতাংশ।

দুর্ঘটনার বিভাগওয়ারি পরিসংখ্যান বলছে, ঢাকা বিভাগে সবচেয়ে বেশি ১৪১টি দুর্ঘটনায় ১১৯ জন নিহত হয়েছেন। সিলেট বিভাগে সবচেয়ে কম ৩০টি দুর্ঘটনায় ২৪ জন নিহত হয়েছেন। একক জেলা হিসেবে চট্টগ্রাম জেলায় সবচেয়ে বেশি ৪১টি দুর্ঘটনায় ৩৭ জন নিহত হয়েছেন। সবচেয়ে কম শেরপুর ও পঞ্চগড় জেলায়। ৯টি দুর্ঘটনায় দুইজন নিহত।

দুর্ঘটনায় যানবাহনভিত্তিক নিহতের পরিসংখ্যানে দেখা যায়- মোটরসাইকেল চালক ও আরোহী ১৯৪ জন, বাসের যাত্রী ২৪ জন, ট্রাক-কাভার্ডভ্যান-পিকআপ-ট্রাক্টর-ট্রলি-মিকশ্চার মেশিন গাড়ি আরোহী ২২ জন, প্রাইভেট কার-মাইক্রোবাস আরোহী ১৪ জন, থ্রি-হুইলার যাত্রী (ইজিবাইক-সিএনজি-অটোরিকশা-অটোভ্যান) ৮৩ জন, স্থানীয়ভাবে তৈরি যানবাহনের যাত্রী (নসিমন-ভটভটি-আলমসাধু-টমটম-মাহিন্দ্র) ৩১ জন এবং রিকশা-বাইসাইকেল আরোহী ৯ জন নিহত হয়েছেন।

রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের পর্যবেণ ও বিশ্লেষণ বলছে, দুর্ঘটনাগুলোর মধ্যে ২৪ দশমিক ৫৩ শতাংশ জাতীয় মহাসড়কে, ৪৫ দশমিক ৮৮ শতাংশ আঞ্চলিক সড়কে, ১৫ দশমিক ৩৫ শতাংশ গ্রামীণ সড়কে এবং ১৩ দশমিক ২৯ শতাংশ শহরের সড়কে এবং শূন্য দশমিক ৯৩ শতাংশ অন্যান্য স্থানে সংঘটিত হয়েছে। এসব দুর্ঘটনার মধ্যে ১২২টি মুখোমুখি সংঘর্ষ, ২৩৭টি নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে, ১০৯টি পথচারীকে চাপা বা ধাক্কা দেয়া, ৫৯টি যানবাহনের পেছনে আঘাত করা এবং সাতটি অন্যান্য কারণে ঘটেছে।

প্রতিবেদন অনুযায়ী দুর্ঘটনায় সম্পৃক্ত যানবাহনের সংখ্যা ৮৭২টি, যার মধ্যে- ট্রাক-কাভার্ডভ্যান-পিকআপ-ট্রাক্টর-ট্রলি-ড্রাম ট্রাক-মিকশ্চার মেশিন গাড়ি ২৫ দশমিক ৯১ শতাংশ, যাত্রীবাহী বাস ১২ দশমিক ৮৪ শতাংশ, মাইক্রোবাস-প্রাইভেট কার-অ্যাম্বুলেন্স-জিপ চার দশমিক ৫৮ শতাংশ, মোটরসাইকেল ২৭ দশমিক ৬৩ শতাংশ, থ্রি-হুইলার (ইজিবাইক-সিএনজি-অটোরিকশা-অটোভ্যান-মিশুক) ১৭ দশমিক ৫৪ শতাংশ, স্থানীয়ভাবে তৈরি যানবাহন (নসিমন-ভটভটি-আলমসাধু-টমটম-মাহিন্দ্র) চার দশমিক ৮১ শতাংশ, বাইসাইকেল-রিকশা দুই দশমিক ৯৮ শতাংশ এবং অজ্ঞাত যানবাহন তিন দশমিক ৬৬ শতাংশ।

প্রতিবেদনের তথ্যের ভিত্তিতে জানা যায়, নভেম্বর মাসে সড়ক দুর্ঘটনায় পুলিশ সদস্য চারজন, র‌্যাব সদস্য একজন, সেনা সদস্য একজন, শিক ১৩ জন, চিকিৎসক পাঁচজন, সাংবাদিক তিনজন, আইনজীবী দুইজন, বিভিন্ন ব্যাংক-বীমা কর্মকর্তা ও কর্মচারী ৯ জন, এনজিও কর্মী সাতজন, রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মী ১৪ জন, স্থানীয় পর্যায়ের বিভিন্ন ব্যবসায়ী ২৩ জন, ওষুধ ও বিভিন্ন পণ্যসামগ্রী বিক্রয় প্রতিনিধি ১৭ জন, পোশাকশ্রমিক ছয়জন, স্বর্ণকার একজন, নির্মাণশ্রমিক চারজন, প্রতিবন্ধী তিনজন এবং ৫৭ জন শিার্থী নিহত হয়েছে।

রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক সাইদুর রহমান বলেন, অধিকাংশ দুর্ঘটনা ঘটছে অতিরিক্ত গতির কারণে যানবাহন নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে। এই গতি নিয়ন্ত্রণে প্রযুক্তির মাধ্যমে নজরদারি এবং চালকদের মোটিভেশনাল প্রশিণ দরকার। যানবাহনের বেপরোয়া গতি এবং পথচারীদের অসচেতনতার কারণে পথচারী নিহতের ঘটনা বাড়ছে। এ জন্য সরকারি উদ্যোগে গণমাধ্যম এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপকভাবে জীবনমুখী সচেতনতামূলক প্রচারণা চালাতে হবে।

তিনি আরো বলেন, পেশাগত সুযোগ-সুবিধা বিশেষ করে, নিয়োগপত্র, বেতন ও কর্মঘণ্টা নির্দিষ্ট না থাকায় যানবাহনের অধিকাংশ চালক শারীরিক ও মানসিকভাবে অসুস্থ। তারা সবসময় অস্বাভাবিক আচরণ করেন এবং বেপরোয়াভাবে যানবাহন চালান। ফলে দুর্ঘটনায় আক্রান্ত হন। তাই সড়ক দুর্ঘটনা রোধ করতে হলে পরিবহন শ্রমিকদের পেশাগত সুযোগ-সুবিধা এবং সড়ক পরিবহন নিয়ন্ত্রণকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর ব্যবস্থাপনা ও কাঠামোগত সংস্কার করে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে হবে।