আওয়ামী লীগের ১৩শ প্রকল্প এখন বড় বোঝা

র‌্যাপিডের সেমিনারে অর্থমন্ত্রী

Printed Edition

বিশেষ সংবাদদাতা

মতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে নেয়া প্রায় এক হাজার ৩০০ উন্নয়ন প্রকল্প বর্তমান সরকারের জন্য বড় মাথাব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে বলে মন্তব্য করেছেন অর্থমন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী।

তিনি বলেন, ‘এসব প্রকল্প এখন এমন এক অবস্থায় রয়েছে যে, সরকার না পারছে গিলতে, না পারছে ফেলতে।’

গত বৃহস্পতিবার রাজধানীতে রিসার্চ অ্যান্ড পলিসি ইন্টিগ্রেশন ফর ডেভেলপমেন্ট (র‌্যাপিড) আয়োজিত ‘ডিবেটিং বাজেট অ্যান্ড বিওন্ড’ শীর্ষক এক সেমিনারে প্রধান অতিথির বক্তব্যে অর্থমন্ত্রী এসব কথা বলেন। সেমিনারে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন র‌্যাপিডের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ আবদুর রাজ্জাক। বাংলাদেশ অর্থনীতি সমিতির আহ্বায়ক অধ্যাপক ড. মাহবুব উল্লাহর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন সমিতির সদস্যসচিব অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ হেলাল উদ্দিন।

অর্থমন্ত্রী বলেন, ‘দায়িত্ব নেয়ার পর আমরা এক হাজার ৩০০টি উন্নয়ন প্রকল্প পেয়েছি, যা আমাদের জন্য বড় লায়াবিলিটি (দায়)। বিগত ১৫ বছরে নেয়া এসব প্রকল্প আসলে কোন ধরনের, তা আপনারা ভালো করেই বোঝেন। অবকাঠামো ও উন্নয়ন খাতের এই বিপুলসংখ্যক প্রকল্পের কাজ অর্ধেক বা তারও বেশি শেষ হয়ে যাওয়ায় এগুলো চাইলেও পুরোপুরি বাতিল করা সম্ভব হচ্ছে না। তবে আমরা প্রকল্পগুলো পর্যালোচনা করছি, ডিরেগুলেশনের দিকে যাচ্ছি এবং প্রতিটি প্রকল্প কার্যকরভাবে মনিটর করা হবে। এরই মধ্যে কিছু প্রকল্প বাদ দেয়া সম্ভব হয়েছে।’

তিনি আরো জানান, দায়িত্ব নেয়ার পরপরই মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের কারণে সৃষ্ট বৈশ্বিক পরিস্থিতি এবং স্পট বায়িং বা অর্থায়নের মতো চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করতে হয়েছে। এর মধ্যেই গতানুগতিক ফরম্যাট থেকে বেরিয়ে এসে অর্থনীতিতে একটি নতুন মডেল ও চিন্তার ওরিয়েন্টেশন দেয়ার চেষ্টা করছে সরকার।

বাজেটের মূল দর্শন তুলে ধরে আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, “আমাদের সেøাগানÑ‘অর্থনীতির গণতন্ত্রীকরণ’। কারণ, বিগত বছরগুলোতে দেশের অর্থনীতি একটি পৃষ্ঠপোষকতার অর্থনীতিতে রূপ নিয়েছিল। শক্তিশালী ও সুসঙ্গঠিত গোষ্ঠীগুলো সব সুবিধা পেলেও প্রান্তিক মানুষ অর্থনৈতিক পরিকল্পনার বাইরে থেকে গেছে। আমরা কামার-কুমার, কুটির শিল্প, তাঁতি, সাংস্কৃতিক কর্মী ও গ্রামীণ নারীদের অর্থনৈতিক মূলধারায় আনতে চাই।”

গ্রামীণ অর্থনীতিতে অর্থপ্রবাহ এবং উৎপাদনশীলতা বাড়াতে ‘ফ্যামিলি কার্ড’ ও কৃষকদের জন্য ‘কৃষক কার্ড’ চালুর ঘোষণা দিয়ে অর্থমন্ত্রী বলেন, ‘ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে কৃষকদের পে খরচ মেটানো কঠিন। তাই ঋণের বোঝা না চাপিয়ে সার ও বীজের মতো মৌলিক চাহিদা মেটাতে ১০ হাজার কোটি টাকার তহবিল থেকে এই কার্ড দেয়া হচ্ছে। তবে সম্পদের সীমাবদ্ধতার (রিসোর্স কনস্ট্রেইন্ট) কারণে আমরা যতটুকু চেয়েছি, ততটুকু করতে পারিনি।’

স্বাস্থ্য ও সৃজনশীল খাতের বিষয়ে তিনি জানান, সরকার সর্বজনীন প্রাথমিক স্বাস্থ্য সুরা (ইউনিভার্সাল প্রিভেন্টিভ হেলথ কেয়ার) নিশ্চিত করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে, যা সাধারণ মানুষের সঞ্চয় বাড়াবে। এ ছাড়া গ্রামীণ ঐতিহ্যবাহী শীতলপাটি, মৃৎশিল্প বা তাঁতশিল্পকে ব্র্যান্ডিং করে অ্যামাজন ও ইবে-এর মতো অনলাইন প্ল্যাটফর্মের সাথে যুক্ত করার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে, যাতে সৃজনশীল অর্থনীতির (ক্রিয়েটিভ ইকোনমি) মাধ্যমে জিডিপিতে অবদান বাড়ানো যায়। পাশাপাশি দেশের মিউজিক, থিয়েটার ও ফিল্মকে বাণিজ্যিকভাবে সফল (মনিটাইজ) করতে পূর্বাচলে একটি ‘থিয়েটার ডিস্ট্রিক্ট’ গড়ার পরিকল্পনার কথাও জানান তিনি।

দেশের রাজস্ব পরিস্থিতির ওপর আলোকপাত করে অর্থমন্ত্রী বলেন, ‘বর্তমানে বাংলাদেশের ট্যাক্স-জিডিপি রেশিও অত্যন্ত হতাশাজনক এবং আন্তর্জাতিক পর্যায় থেকেও পাবলিক ফাইন্যান্সিং কমে আসছে। বর্তমানে সরকারকে প্রায় এক লাখ ২৫ হাজার কোটি টাকার ঋণ (ডেট) পরিশোধ করতে হচ্ছে, যার ফলে ফিসক্যাল স্পেস সঙ্কুচিত হয়ে এসেছে। এই পরিস্থিতিতে বড় ঋণের জন্য বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর ওপর চাপ কমাতে পুঁজিবাজারকে পুনরুজ্জীবিত করা হচ্ছে। পুঁজিবাজারে কোনো রাজনৈতিক নিয়োগ না দিয়ে সম্পূর্ণ পেশাদার ব্যক্তিদের নিয়ে নতুন কমিশন গঠন করা হয়েছে। একই সাথে অনেক আইন ও ট্যাক্স রিফর্ম করা হচ্ছে। এই সংস্কারের খবর পেয়ে এরই মধ্যে জেপি মরগ্যানসহ বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় ফান্ড ম্যানেজাররা বাংলাদেশে বিনিয়োগে গভীর আগ্রহ দেখিয়েছেন, যা আমাদের ট্রিলিয়ন ডলার ইকোনমির স্বপ্নপূরণে বড় ভূমিকা রাখবে।’

সম্পদের সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও আগামীতে এক কোটি কর্মসংস্থান সৃষ্টির ল্যমাত্রা রয়েছে জানিয়ে অর্থমন্ত্রী আশা প্রকাশ করেন, বাজেটের শতভাগ না হলেও অন্তত ৮০ শতাংশ বাস্তবায়ন করতে পারলে দেশের প্রবৃদ্ধি, কর্মসংস্থান এবং নির্বাচনী ইশতেহারের প্রতিশ্রুতিগুলো পূরণ করা সম্ভব হবে।

সেমিনারে প্যানেল আলোচক ছিলেন বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক আবু আহমেদ, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ নূরুল আমিন এবং ব্র্যাক ইনস্টিটিউট অব গভর্নেন্স অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের (বিআইজিডি) নির্বাহী পরিচালক ড. ইমরান মতিন।

আলোচনায় আরো অংশ নেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক ড. সায়মা হক বিদিশা, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক ড. শারমিন্দ নীলোর্মি, বিআইডিএসের সিনিয়র গবেষণা পরিচালক ড. কাজী ইকবাল এবং বুয়েটের মানবিক বিভাগের অর্থনীতি বিষয়ের সহযোগী অধ্যাপক ড. নাজমুল ইসলাম।

আলোচনায় অংশ নিয়ে অধ্যাপক আবু আহমেদ বলেন, ‘বেসরকারি উদ্যোক্তাদের বিনিয়োগের জন্য আহ্বান জানানো হচ্ছে, কিন্তু বাংলাদেশ ব্যাংকের পলিসি রেট (যে সুদে বাংলাদেশ ব্যাংক বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোকে ঋণ দেয়) ১০ শতাংশের ওপরে থাকলে তা কিভাবে সম্ভব?’ বাংলাদেশ ব্যাংক এখনো বিভিন্ন ব্যাংকের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তপে করছে বলেও তিনি অভিযোগ করেন।