মালিবাগে মিলিবাগ: রেশম লতা

Printed Edition
pac-3
মালিবাগে মিলিবাগ: রেশম লতা

মালিবাগে সন্ধ্যা এমনভাবে নামে, যেন শহরটা নিজের ভেতরকার গোপন কণ্ঠস্বর একটু শিথিল করে দেয়। যানজট তখনো হাঁফাচ্ছে, দোকানের শাটার অর্ধেক খোলা, আর ফুটপাথ ধরে হেঁটে যাওয়া মানুষদের মুখে ক্লান্তির অচেনা ছায়া। আমি সেইসব মুখের ভিড় ঠেলে রেললাইনের পাশে এসে দাঁড়ালাম। ভাবছিলাম- শহরের এই কোলাহলের মাঝে কি আসলেই কোনো সৌন্দর্য লুকিয়ে থাকে? ঠিক তখনই দেখলাম মিলিবাগ পোকা। শুরুতে বুঝতেই পারিনি যে সে পোকা। মনে হলো অন্ধকার বাতাসে আলোর ঝিকিমিকিতে ছোট্ট সাদাফুল নড়ছে, দুলছে। কাছে গিয়ে বুঝলাম, এটা আসছে ক্ষুদ্র এক পোকা থেকে। তার পিঠে তুলোর মতো ফুলের আকৃতি এতটাই মোলায়েম, এতটাই নীরব যে সেটা শহরের যাবতীয় শব্দকে এক মুহূর্তের জন্য থামিয়ে দেয়। আরো কাছে যেতেই যেন অনুভব করলাম ধুলোয় মাখা শরীর নিয়ে এই ছোট্ট মিলিবাগই মালিবাগের আসল শান্তির প্রতীক। আমি ওর পেছনে হাঁটা শুরু করলাম। রাস্তায় মানুষের অস্থির চলাফেরা, চায়ের কেটলির শব্দ, বাসের ধোঁয়া, রিকশার বেল- সবকিছু যেন পেছনে পড়ে রইল। মিলিবাগ উড়ছে এক ধরনের ভাঁজ-খোলা নকশার মতো। কখনো মুচির বাক্সের গায়ে ঠাঁই দাঁড়িয়ে থাকা মোমবাতির আলোয় তার ডানার ওপর ধূসরতার রোশনাই আসে, কখনো রাস্তার ধুলো তাকে দিয়ে যায় সাদাফুলের সুগন্ধহীন ছটা।

এক সময় মিলিবাগ আমাকে নিয়ে গেল এক পুরনো গলির মুখে। গলিটা এত সরু যে দুই পাশের দেয়ালে সাঁটানো পোস্টারগুলো প্রায় আমার কাঁধ ছুঁয়ে যাচ্ছিল। সেখানকার বাতাসে ছিল পুরনো সময়ের গন্ধঘাম, কাপড়ের রঙ, রিকশার টায়ারের দাগ। সেই গলি দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে মনে হলো, আমি যেন কোনো অচেনা শহরের ভেতর ঢুকে পড়েছি, যদিও নামটা মালিবাগই। মিলিবাগ মাঝে মধ্যে থেমে থাকছিল, যেন আমাকে বলছে- ‘দেখো, দেখার মতো জিনিস শুধু উঁচু বিল্ডিংয়ের আলোতে থাকে না, থাকে এই ফাঁক-ফোঁকরেও।’ আমি থেমে তাকালাম। দেয়ালের ওপর শুকনো শ্যাওলা, একটা বাঁকা কাঠের জানালা, ভাঙা ইটের গায়ে টান দেয়া তার সবকিছুই অদ্ভুত রকম সুন্দর লাগছিল। হয়তো সৌন্দর্য তৈরি হয় আলোর পরিমাণে না, বরং আলোর সাথে যুক্ত গল্পে।

শেষে মিলিবাগ আমাকে এনে দাঁড় করাল এক চায়ের দোকানের সামনে। দোকানের আলো খুবই মলিন, কিন্তু সেই মলিনতার মধ্যেও মিলিবাগের তুলতুলে শরীর আরো স্পষ্ট হয়ে উঠল। দোকানদার হাসল, ‘বললেন, মালিবাগের পোকা দেখছেন নাকি?’ মনে মনে বললাম, এই পোকা শুধু আলোর প্রতিসরণ নয়- গল্পও শোনায়। চা নিয়ে বসে আমি দেখলাম, মিলিবাগ এখনো উড়ছে। প্রতিবার শরীর নড়ালে মনে হচ্ছে শহরটাকে নতুন করে ব্যাখ্যা করছে- যেন বলছে, ‘ঢাকা শুধু শব্দ নয়; কখনো কখনো নীরবতারও রূপ আছে। কেউ দেখলে ভালো, না দেখলে সে জানেও না।’ রাতের গভীরতা বাড়তে লাগল, আর মিলিবাগও হারিয়ে গেল অন্ধকারে। মিলিবাগ তুমি ক্ষুদ্র; অথচ তোমার উড়ানেই আমি আজ শহরটাকে অন্য চোখে দেখলাম। বুঝলাম, একেকটা শহরকে বোঝা যায় তার বড় আয়োজন দিয়ে নয়- তার ক্ষুদ্র, অদেখা প্রাণীদের চোখে।