জবানবন্দীতে প্রত্যক্ষদর্শী ইমরান

দু’বার গুলিবিদ্ধ হয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়েন আবু সাঈদ

জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের বিচার; মানবতাবিরোধী অপরাধ

দুই হাত প্রসারিত করে বিশ্ববিদ্যালয়ের ১ নম্বর গেটের সামনে দাঁড়িয়ে ছিলেন আবু সাঈদ। মুহূর্তের মধ্যেই গুলির শব্দে কেঁপে ওঠে এলাকা। প্রথম গুলিতে ঢলে পড়েন তিনি, আর দ্বিতীয় গুলিতে লুটিয়ে পড়েন মাটিতে। পরে হাসপাতালে নেয়ার পর চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন।

নিজস্ব প্রতিবেদক
Printed Edition
আবু-সাঈদ

দুই হাত প্রসারিত করে বিশ্ববিদ্যালয়ের ১ নম্বর গেটের সামনে দাঁড়িয়ে ছিলেন আবু সাঈদ। মুহূর্তের মধ্যেই গুলির শব্দে কেঁপে ওঠে এলাকা। প্রথম গুলিতে ঢলে পড়েন তিনি, আর দ্বিতীয় গুলিতে লুটিয়ে পড়েন মাটিতে। পরে হাসপাতালে নেয়ার পর চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে দেয়া জবানবন্দীতে এমন হৃদয়বিদারক বর্ণনা দিয়েছেন রংপুর কারমাইকেল কলেজের শিক্ষার্থী ও প্রত্যক্ষদর্শী ইমরান আহমেদ; যিনি জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের প্রথম শহীদ আবু সাঈদের সহযোদ্ধা ছিলেন। গতকাল মঙ্গলবার ট্রাইব্যুনাল-২-এর চেয়ারম্যান বিচারপতি নজরুল ইসলাম চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের বিচারিক প্যানেলে তার জবানবন্দী রেকর্ড করা হয়। ট্রাইব্যুনালের অন্য দুই সদস্য হলেন অবসরপ্রাপ্ত জেলা ও দায়রা জজ মো: মঞ্জুরুল বাছিদ এবং জেলা ও দায়রা জজ নূর মোহাম্মদ শাহরিয়ার কবীর।

জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের প্রথম শহীদ আবু সাঈদ হত্যার ঘটনায় মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের (বেরোবি) সাবেক ভিসি হাসিবুর রশীদসহ ৩০ আসামির বিরুদ্ধে ১৩ নম্বর সাক্ষী হিসেবে সাক্ষ্য দেন ইমরান। ২৭ বছর বয়সী এই তরুণ কারমাইকেল কলেজের ইতিহাস বিভাগ থেকে মাস্টার্স শেষ করেন। ২০১৮ সালের কোটা সংস্কার আন্দোলনকারীদেরও একজন ছিলেন। তখন অনার্সে পড়তেন। মাস্টার্সে থাকতে ২০২৪ সালের জুলাইয়ে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ব্যানারে রংপুরে কর্মসূচি পালন করেছিলেন তিনি। ইমরান বলেন, গত বছরের ১৬ জুলাই দুপুর ১২টার দিকে রংপুর নগরীর চারতলা মোড় এলাকা থেকে আমরা একটি মিছিল নিয়ে মডার্ন মোড় অভিমুখে যাত্রা শুরু করি। নগরীর লালবাগ এলাকায় পৌঁছালে দেশীয় অস্ত্রশস্ত্রে আমাদের বাধা দেয়ার চেষ্টা করেন ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা। কিন্তু আমরা সংখ্যায় বেশি থাকায় পিছু হটেন তারা। আমরা আবারো স্লোগান দিতে দিতে রওনা হই। বেলা ১টার দিকে বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের দুই নম্বর গেট পার হয়ে এক নম্বর গেটের কাছাকাছি পৌঁছাই। ঘণ্টাখানেক পর আমাদের বাধা দেয় পুলিশ। কিন্তু আমরা স্লোগান দিতে থাকি। একপর্যায়ে কোনো রকম সতর্কবার্তা ছাড়াই সাউন্ড গ্রেনেড ও টিয়ার শেল নিক্ষেপ করতে থাকে পুলিশ। এ ছাড়া অতর্কিত হামলা চালানো হয়। এতে শিক্ষার্থীরা ছত্রভঙ্গ হয়ে বিভিন্ন দিকে ছোটাছুটি করেন। অনেকে গুরুতর আহত হন।

তিনি বলেন, বেরোবি শিক্ষার্থী আবু সাঈদও মাথার পেছনে মারাত্মক আঘাত পান। ফলে রক্ত পড়া শুরু হয়। ওই সময় বিশ্ববিদ্যালয়ের গেটের ভেতরে অবস্থান নেয় পুলিশ। সেখানে ছাত্রলীগের পোমেল বড়ুয়া, মাহফুজ, আরিফ, বাবুল, টগর, ফজলে রাব্বী, আক্তার, আকাশ, মাসুদ রানা, সেজান মাহমুদসহ রংপুর মহানগর, জেলা-উপজেলা ছাত্রলীগ, যুবলীগ ও আওয়ামী লীগের অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মীরা আগে থেকেই ছিলেন। কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসন কোনো ভূমিকা রাখেনি বা অবৈধভাবে বহিরাগত ছাত্রলীগের নেতাকর্মীদের সরিয়ে দেয়ার চেষ্টা করেনি। উল্টো ছাত্রলীগ-পুলিশের সাথে কিছুক্ষণ থেকে চলে যান প্রক্টর।

বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকদের মধ্যে ছিলেন মশিউর রহমান, আসাদ মণ্ডল, কর্মকর্তা রাফিউল হাসান রাসেল, মনিরুজ্জামান পলাশ, হাফিজুর রহমান তুফান, কর্মচারী নুরুন্নবী, নূর আলম, মাহবুবুর রহমান, আমির হাসান আমু ও আনোয়ার পারভেজ আপেল। বেলা ২টার পর আমাদের মধ্যে বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রদের একটি অংশ গেট খোলার চেষ্টা করে। তবে ভেতরে থাকা আওয়ামী লীগ, ছাত্রলীগ, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, কর্মকর্তা, কর্মচারী, পুলিশ কর্মকর্তা এসি আরিফ, এসি ইমরান, বিশ্ববিদ্যালয়ের ফাঁড়ির ইনচার্জ বিভূতীভূষণ রায়, তাজহাট থানার ওসি রবিউলসহ সবাই মিলে ছাত্রদের দিকে ঢিল ছোড়েন। একপর্যায়ে পুলিশ কর্মকর্তারা গুলি করতে করতে বেরিয়ে আসতে থাকেন। তখন গেটের সামনে অবস্থান নেয়া ছাত্ররা ছত্রভঙ্গ হয়ে যান।

এই সাক্ষী বলেন, ঠিক তখনই বিশ্ববিদ্যালয়ের এক নম্বর গেটের সামনে দুই হাত প্রসারিত করে দাঁড়িয়ে যান আবু সাঈদ। ওই সময় খুব কাছ থেকে তাকে গুলি করে পুলিশ। প্রথম গুলি খাওয়ার পর সামন্য একটু পিছিয়ে পড়েন তিনি। কিন্তু আবারো গুলিবিদ্ধ হন। তখন সড়কের বিভাজক (ডিভাইডার) পার হয়ে একটু পেছনে আসেন। আরেকটু পেছনে থাকা আয়ান এগিয়ে এসে আবু সাঈদকে ধরেন। এরপর একটু সরে যাওয়ার পর সাজু রায়সহ আরো কয়েকজন মিলে তাকে হাসপাতালে নিয়ে যান। এক ঘণ্টা পর তার মৃত্যুর খবর পাই আমরা। পরবর্তীতে জানতে পারি তৎকালীন পুলিশ কমিশনার মনিরুজ্জামান, ডিসি (ক্রাইম) আবু মারুফ, এডিসি (ডিবি) শাহ নুর আলম পাটোয়ারী, এসি আরিফ, তাজহাট থানার ওসি রবিউলের নেতৃত্বে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক মশিউর রহমান, আসাদ মণ্ডল, কর্মকর্তা রাফিউল হাসান রাসেল, হাফিজুর রহমান তুফান, মনিরুজ্জামান পলাশের সহযোগিতায় এএসআই আমির হোসেন ও কনস্টেবল সুজন চন্দ্রের গুলিতে আবু সাঈদ মারা গেছেন। যাদের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ সহযোগিতায় তার মৃত্যু হয়েছে; সহযোদ্ধা ও প্রত্যক্ষদর্শী হিসেবে আমি তাদের প্রত্যেকের শাস্তি দাবি করছি।

সাক্ষ্যগ্রহণ শেষে ইমরানকে জেরা করেন পলাতক ২৪ জনের পক্ষে রাষ্ট্রনিযুক্ত চার আইনজীবী ও উপস্থিত ছয় আসামির আইনজীবীরা। প্রসিকিউশনের পক্ষে শুনানি করেন প্রসিকিউটর মিজানুল ইসলাম। সাথে ছিলেন প্রসিকিউটর মঈনুল করিম, আবদুস সাত্তার পালোয়ানসহ অন্যরা।

ডিএমপির সাবেক কমিশনারসহ পাঁচজনের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য : এ দিকে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সময় রাজধানীর রামপুরায় ছাদের কার্নিশে ঝুলে থাকা আমির হোসেনকে গুলি করা এবং আরো দু’জনকে হত্যার ঘটনায় দায়ের করা মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় ষষ্ঠ দিনের মতো সাক্ষ্যগ্রহণ সম্পন্ন হয়েছে। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) সাবেক কমিশনার হাবিবুর রহমানসহ পাঁচ আসামির বিরুদ্ধে গতকাল মঙ্গলবার ৯, ১০ ও ১১তম সাক্ষী জবানবন্দী দিয়েছেন।

আদালতে সাক্ষ্য দেয়া ব্যক্তিদের মধ্যে রয়েছেন মামলার তদন্ত প্রক্রিয়ার সাথে যুক্ত আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের তদন্ত সংস্থার ফিল্ড অফিসার ও একজন পুলিশ কর্মকর্তা এবং ঘটনার সময় আহতদের চিকিৎসা দেয়া হাসপাতালের একজন স্টাফ নার্স।

গুলিবিদ্ধদের চিকিৎসায় প্রত্যক্ষদর্শী নার্সের জবানবন্দী : ১১তম সাক্ষী লিংকন মাঝি, যিনি ঘটনার সময় ফেমাস স্পেশালাইজড হাসপাতাল, মেরাদিয়া বনশ্রীতে স্টাফ নার্স হিসেবে কর্মরত ছিলেন, ঘটনার দিনের ভয়াবহ বর্ণনা দিয়েছেন। জবানবন্দীতে তিনি বলেন, ১৯ জুলাই ২০২৪, শুক্রবার জুমার নামাজের কিছুক্ষণ পর হাসপাতালসংলগ্ন রামপুরা এলাকায় গোলাগুলির শব্দ শোনা যায়। এর পরপরই প্রায় ৮০ থেকে ১০০ জন গুলিবিদ্ধ রোগী তাদের হাসপাতালে আসতে থাকেন। তাদের প্রাথমিক চিকিৎসা দিয়ে গুরুতর আহতদের ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে রেফার করা হয়।

তিনি আরো জানান, সে দিন বিকেল ৪টার দিকে একটি ফোন কলের ভিত্তিতে তারা রামপুরা থানার সামনে নির্মাণাধীন একটি তিনতলা ভবনের ছাদে গুলিবিদ্ধ অবস্থায় পড়ে থাকা এক তরুণকে উদ্ধার করেন। হাসপাতাল থেকে প্রাথমিক চিকিৎসা শেষে তাকেও ঢাকা মেডিক্যালে পাঠানো হয়। পরে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভিডিও দেখে এবং বিভিন্ন মাধ্যমে তিনি জানতে পারেন এই গুলিবিদ্ধ তরুণের নাম আমির হোসেন।

সাক্ষী দাবি করেন, পরবর্তীতে রামপুরা থানা থেকে হাসপাতালের চিকিৎসক, ম্যানেজার ও অ্যাম্বুলেন্স ড্রাইভারকে ডেকে নিয়ে আমির হোসেনের ঠিকানা দেয়ার জন্য চাপ সৃষ্টি করা হয়েছিল। তিনি আরো জানতে পারেন যে, পুলিশ কর্মকর্তা চঞ্চল ও তারেকই আমির হোসেনকে গুলি করেছিলেন।

তদন্ত সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সাক্ষ্য : মামলার তদন্ত ও আলামত জব্দের প্রক্রিয়ার সাথে সংশ্লিষ্ট দুই পুলিশ সদস্যও সাক্ষ্য দিয়েছেন। ৯ম সাক্ষী এএসআই (নিরস্ত্র) মো: বায়জীদ খাঁন তার জবানবন্দীতে জানান, তিনি দু’টি ভিন্ন তারিখে মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা সৈয়দ আবদুর রউফ কর্তৃক জব্দ কার্যক্রমে উপস্থিত ছিলেন। এর মধ্যে গত ২২ এপ্রিল ২০২৫ তারিখে তার সামনে দু’টি সিআইডি ফরেনসিক রিপোর্ট এবং ২৯ জুলাই ২০২৫ তারিখে রামপুরা থানা থেকে দু’টি জিডি ও দু’টি কমান্ড সার্টিফিকেটের (সিসি) সত্যায়িত ফটোকপি জব্দ করা হয়। তিনি উভয় জব্দ তালিকায় (প্রদর্শনী-৮ ও ৯) স্বাক্ষর করেন।

১০ম সাক্ষী এসআই (নিরস্ত্র) মো: শাহিন মিয়া নিশ্চিত করেন যে, ২৯ জুলাই ২০২৫ তারিখে তিনি রামপুরা থানায় ডিউটি অফিসার হিসেবে কর্মরত থাকাবস্থায় তদন্তকারী কর্মকর্তা তার সামনেই দু’টি জিডি এবং দু’টি সিসির সত্যায়িত ফটোকপি জব্দ করেন এবং তিনি জব্দ তালিকায় (প্রদর্শনী-৯) স্বাক্ষর করেন।