হামের সংক্রমণ বেড়েই চলেছে
Printed Edition
নয়া দিগন্ত ডেস্ক
দেশে শিশুদের হামে আক্রান্তের সংখ্যা বেড়েই চলছে। গতকালও চট্টগ্রাম, নারায়ণগঞ্জসহ বিভিন্ন জেলায় হামের লক্ষণ নিয়ে নতুন করে অনেকে ভর্তি হয়েছে। এ অবস্থায় সরকারের পক্ষ থেকে আগামী রোববার হামের বিশেষ টিকাদান কর্মসূচি শুরু হওয়ার কথা জানানো হয়েছে। তবে ঠাকুরগাঁওসহ অনেক জেলায় বর্তমানে হাম-রুবেলার টিকা নেই বলে জানা গেছে।
চট্টগ্রাম ব্যুরো জানায়, চট্টগ্রামে হাম সন্দেহে আরো ১৭ জন শিশুকে হাসপাতালে ভর্তি করানো হয়েছে। গতকাল সিভিল সার্জন কার্যালয় থেকে পাঠানো প্রতিবেদনে এ তথ্য জানানো হয়। এর আগে বুধবার হাম সন্দেহে ১৮ জনকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছিল।
নতুন করে শনাক্ত হওয়া এসব শিশুর সবাই চট্টগ্রাম মহানগর এলাকার বাসিন্দা। মহানগর এলাকায় এ পর্যন্ত সন্দেহভাজন হাম রোগীর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৮০ জনে। তবে চট্টগ্রামের ১৫টি উপজেলা থেকে গতকাল নতুন কোনো সন্দেহভাজন রোগীর খবর পাওয়া যায়নি।
এ দিকে ঢাকার ন্যাশনাল পোলিও অ্যান্ড মিজেলস ল্যাবরেটরিতে (ঘচগখ, ওচঐ) নতুন করে আরো ১২টি নমুনা পরীার জন্য পাঠানো হয়েছে, এ নিয়ে জেলায় এ পর্যন্ত মোট পাঠানো নমুনার সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১২৩টিতে।
চট্টগ্রাম জেলার সিভিল সার্জন ডা: জাহাঙ্গীর আলম বলেন, আমরা মাঠপর্যায়ে নিবিড় পর্যবেণ চালিয়ে যাচ্ছি। মহানগর এলাকায় বিশেষ নজরদারি রাখা হচ্ছে, যাতে সংক্রমণের বিস্তার নিয়ন্ত্রণ করা যায়।
ঠাকুরগাঁও প্রতিনিধি জানান, দেশের উত্তরের জেলা ঠাকুরগাঁওয়ে হানা দিয়েছে সংক্রামক ব্যাধি হাম ও রুবেলা। জেলা সদর, রানীশংকৈল ও হরিপুর উপজেলার চার শিশু শনাক্ত হয়েছে আক্রান্তের তালিকায়। তাদের মধ্যে হামে আক্রান্ত দুই শিশু ও রুবেলা ভাইরাসে দুই শিশু আক্রান্ত হয়েছে। এতে উদ্বেগ বাড়ার সাথে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে জনমনে। অপর দিকে সতর্ক অবস্থানে রয়েছে স্বাস্থ্য বিভাগ। তবে মাঠপর্যায়ে সংক্রমণের খবর মিললেও কেন্দ্রীয় গুদামে টিকার মজুদ শূন্য বলে জানা গেছে।
ঠাকুরগাঁওয়ের সিভিল সার্জন ডা: আনিছুর রহমান জানান, আক্রান্ত শিশুরা তত্ত্বাবধানে রয়েছে। হামের পরীার জন্য ছয় শিশুর স্যাম্পল পাঠিয়েছিলাম। দু’জন আক্রান্ত হয়েছে হামে এবং রুবেলায় আরো দু’জন শিশু আক্রান্ত হয়েছে। এ ঘটনার পরপরই আশপাশের এলাকায় নজরদারি বাড়ানো হয়েছে, যাতে নতুন করে সংক্রমণ ছড়িয়ে না পড়ে। উপসর্গ দেখা দিলে আতঙ্কিত না হয়ে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেয়ার আহ্বান জানান তিনি।
রূপগঞ্জ (নারায়ণগঞ্জ) সংবাদদাতা জানান, নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে গত ১৫ দিনে হামের লণ নিয়ে অর্ধশতাধিক শিশু এসেছে। গত সোমবার সকাল ৯টা থেকে গতকাল বৃহস্পতিবার বেলা ২টা পর্যন্ত ১৫ শিশু ভর্তি করা হয়। গত বুধবার বিকেলে আট শিশুকে চিকিৎসার পর ছেড়ে দেয়া হয়েছে। গতকাল বেলা ২টা পর্যন্ত ভর্তি ছিল সাত শিশু। তাদের হাসপাতালের হাম আইসোলেশন ওয়ার্ডে রেখে চিকিৎসা দেয়া হচ্ছে। হাসপাতালে হামের লণ থাকা ও আক্রান্ত শিশুদের ভর্তি করা হচ্ছে। হামের প্রাদুর্ভাব বৃদ্ধিতে অভিভাবকরা আতঙ্কিত হয়ে পড়ছেন। আগামী ৫ এপ্রিল হামের জরুরি টিকাদান শুরু হবে জেনে অভিভাবকদের মধ্যে স্বস্তি ফিরে এসেছে। হাসপাতাল কর্তৃপ সূত্রে জানা গেছে, রূপগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে গত ৩০ মার্চ থেকে এ পর্যন্ত হামের লণ নিয়ে ভর্তি হয়েছে ২২ শিশু।
এ ছাড়া হামের লণ নিয়ে গত ২৪ মার্চ রূপগঞ্জ উপজেলার মুড়াপাড়া ইউনিয়নের মাছিমপুর বাড়ইপাড়া এলাকার রকির ছেলে আরিয়ান ইসলাম ঢাকার শহীদ সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যায়। গত ১৯ মার্চ ঢাকার মহাখালী উদরাময় হাসপাতালে মারা যায় কায়েতপাড়া ইউনিয়নের চনপাড়া এলাকার এক বছর বয়সী নুহাশ।
নারায়ণগঞ্জ-১ (রূপগঞ্জ) আসনের সংসদ সদস্য মুস্তাফিজুর রহমান ভুঁইয়া দিপু বলেন, হামের সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে নারায়ণগঞ্জ জেলায় বর্তমানে ৭৫ হাজার ডোজ হাম টিকা মজুদ রয়েছে। এসব টিকা পর্যায়ক্রমে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা ও শিশুদের মধ্যে প্রয়োগের প্রস্তুতি নেয়া হয়েছে। সরকারি স্বাস্থ্য সেবা নিশ্চিত করতে রূপগঞ্জের ৪১টি কমিউনিটি কিনিক, দু’টি ইউনিয়ন উপস্বাস্থ্য কেন্দ্র সচল ও রোগী পরিবহনে নৌ অ্যাম্বুলেন্স ব্যবস্থা করা হবে। হাম নিয়ে একটি প আতঙ্ক ছড়াচ্ছে।
নীলফামারী প্রতিনিধি জানান, নীলফামারীতে হামের উপসর্গ নিয়ে একের পর এক শিশু হাসপাতালে ভর্তি হওয়ায় উদ্বেগ ছড়িয়ে পড়েছে অভিভাবকদের মধ্যে। জ্বর, কাশি ও শরীরে র্যাশ নিয়ে অসুস্থ হয়ে পড়া ছয়টি শিশুকে নীলফামারী জেনারেল হাসপাতালের আইসোলেশন বিভাগে রেখে চিকিৎসা দেয়া হচ্ছে।
গতকাল দুপুরে হাসপাতালের আবাসিক মেডিক্যাল অফিসার ডা: দেবাশীষ সরকার বিষয়টি নিশ্চিত করেন। হাসপাতালে ভর্তি শিশুদের মধ্যে রয়েছে, ডিমলা উপজেলার বালাপাড়া শুকানগঞ্জ এলাকার আয়েশা আক্তারের পাঁচ মাস বয়সী ছেলে মিজান মিয়া ও দুই বছরের সম্রাট ইসলাম, সদর উপজেলার পঞ্চপুকুর এলাকার লিজু বেগমের দুই বছরের ছেলে জিহাদ বাবু, দেবীরডাঙ্গা কাঞ্চনপাড়া এলাকার এক বছরের শিশু রাইয়ান, বাবলি আক্তারের দুই বছরের ছেলে আব্দুল জোবায়ের ও আড়াই বছরের মাইশা।
হাসপাতাল সূত্র জানায়, গত দুই দিনে এসব শিশু হামের উপসর্গ নিয়ে হাসপাতালে আসে। সংক্রমণের আশঙ্কায় তাদের আলাদা করে আইসোলেশন বিভাগে রাখা হয়েছে। এরই মধ্যে নমুনা সংগ্রহ করে পরীক্ষার জন্য ঢাকায় পাঠানো হয়েছে। রিপোর্ট হাতে এলেই নিশ্চিত হওয়া যাবে তারা সত্যিই হামে আক্রান্ত কিনা।
ফরিদপুর প্রতিনিধি জানান, ফরিদপুর মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে হামের উপসর্গ নিয়ে ভর্তি হওয়া সাত মাসের এক কন্যাশিশুর মৃত্যু হয়েছে। গতকাল সকালে জেলা সিভিল সার্জন কার্যালয় থেকে সরবরাহ করা দৈনন্দিনের প্রতিবেদন থেকে এ তথ্য জানানো হয়। মারা যাওয়া শিশুর নাম রহিমা আক্তার। সে মাদারীপুর সদর উপজেলার কাউদিয়া গ্রামের বাসিন্দা রিয়াজ খানের মেয়ে। জানা গেছে, বুধবার সকালে শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে তাকে হামের উপসর্গ নিয়ে ফরিদপুর মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। এরপর বুধবার দুপুরে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয়।
ফরিদপুর সিভিল সার্জনের কার্যালয় সূত্র জানায়, শিশুটির নমুনা সংগ্রহ করে পরীার জন্য ঢাকার মহাখালীর রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটে (আইইডিসিআর) পাঠানো হয়েছে। তবে এখনো পরীার প্রতিবেদন পাওয়া যায়নি। উপসর্গের ভিত্তিতে চিকিৎসকরা এটিকে ‘কিনিক্যালি হামজনিত’ মৃত্যু বলে মন্তব্য করেছেন।
ময়মনসিংহ অফিস জানায়, ময়মনসিংহ মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে নতুন করে হামের উপসর্গ নিয়ে আরো ৩৩ শিশু ভর্তি হয়েছে।
বুধবার সকাল ৯টা থেকে বৃহস্পতিবার দুপুর সাড়ে ১২টা পর্যন্ত সময়ে তাদের ভর্তি করা হয়। বর্তমানে হাসপাতালের হাম আইসোলেশন ওয়ার্ডে রেখে শিশুদের চিকিৎসা দেয়া হচ্ছে। হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, গত ১৭ মার্চ থেকে এ পর্যন্ত হামের লণ নিয়ে মোট ১৭৯ শিশু এখানে ভর্তি হয়েছে। এর মধ্যে পাঁচ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। বর্তমানে ৮৬ শিশু চিকিৎসাধীন রয়েছে, আর বাকিদের সুস্থ হওয়ায় ছাড়পত্র দেয়া হয়েছে। হামের চিকিৎসায় গঠিত মেডিকথ্যাল দলের সহকারী রেজিস্ট্রার মো: মাজহারুল আমিন জানান, মার্চের মাঝামাঝি সময় থেকে হামের উপসর্গ নিয়ে রোগীর সংখ্যা বাড়তে শুরু করে। বর্তমানে ভর্তি হওয়া শিশুদের ৮০ থেকে ৯০ শতাংশই শরীরে র্যাশ, জ্বর, কাশি, চোখ দিয়ে পানি পড়া এবং মুখে ঘা নিয়ে হাসপাতালে আসছে।
তিনি আরো বলেন, ৯ মাসের কম বয়সী শিশুদের মধ্যে হামের ঝুঁকি বেশি দেখা যাচ্ছে। এর সম্ভাব্য কারণ হিসেবে মায়ের শরীর থেকে পর্যাপ্ত অ্যান্টিবডি না পাওয়া এবং বুকের দুধ কম খাওয়াকে উল্লেখ করেন তিনি। তবে এ বিষয়ে বিস্তারিত জানতে আরো গবেষণার প্রয়োজন রয়েছে।
কর্ণফুলী (চট্টগ্রাম) সংবাদদাতা জানান, চট্টগ্রামের কর্ণফুলী উপজেলায় হামের প্রাদুর্ভাব, উপসর্গ মিলেছে দুই শিশুর শরীরে। বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা: মোছাম্মৎ জেবুন্নেছা।
জানা গেছে, ওই দুই শিশুর বাড়ি উপজেলার চরল ইউনিয়নে। উপজেলা স্বাস্থ্য বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, চরল ইউনিয়ন স্বাস্থ্যকেন্দ্রের একটি টিম বাড়ি বাড়ি গিয়ে খোঁজখবর নেয়ার সময় শিশুদের শরীরে হামের লণ শনাক্ত করে। উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স সূত্রে জানা যায়, আক্রান্তদের পর্যবেণে রাখা হয়েছে। একই সাথে এলাকায় নজরদারি জোরদার করা হয়েছে।
পাকুন্দিয়া (কিশোরগঞ্জ) সংবাদদাতা জানান, কিশোরগঞ্জের পাকুন্দিয়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে আদিবা নামের আট মাস বয়সি এক শিশুর হাম ভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছে বলে শনাক্ত করা হয়েছে। এছাড়াও হামের উপসর্গ নিয়ে আরো তিন শিশু হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে।
গতকাল শিশুটিকে পরীার মাধ্যমে হাম ভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছে বলে নিশ্চিত করেছে হাসপাতাল কর্তৃপ। বর্তমানে শিশুটিকে উন্নত চিকিৎসার জন্য কিশোরগঞ্জ শহীদ সৈয়দ নজরুল ইসলাম মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে। হামে আক্রান্ত শিশুটি পাকুন্দিয়া পৌর সদরের নামা লীয়া গ্রামের আসাদ মিয়ায় কন্যাশিশু।
এ ব্যাপারে পাকুন্দিয়া স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা: নূর-এ-আলম খান বলেন, হাসপাতালে হামে আক্রান্ত শিশুদের জন্য আলাদা আইসোলেশন ওয়ার্ডের ব্যবস্থা করা হয়েছে।
ভোলা প্রতিনিধি জানান, সারা দেশের মতো উপকূলীয় জেলা ভোলাতেও হামের প্রাদুর্ভাব দেখা দিয়েছে। ২৪ ঘণ্টায় হামের লক্ষণ নিয়ে ভোলার দুই হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে ১৫ শিশু। যাদের মধ্যে তজুমদ্দিনে একজন এবং ভোলার ২৫০ শয্যার জেনারেল হাসপাতালে ১৪ জন।
আক্রান্ত শিশুদের নমুনা সংগ্রহ করে শিশু ওয়ার্ডের আইসোলেশন ইউনিটে পর্যবেক্ষণে রাখা হয়েছে। সেখানে তাদের সেবা দিচ্ছেন চিকিৎসক ও নার্সরা। হঠাৎ করেই হামের আশঙ্কায় আতঙ্কিত হয়ে পড়েছেন অভিভাবকরা।
রোগীর কয়েকজন অভিভাবক বলছেন। এর আগে হামের প্রাদুর্ভাব ছিল না, কিন্তু এখন হাম নিয়ে আমরা ভীষণ চিন্তিত। চিকিৎসকরা সেবা ও পরামর্শ দিচ্ছেন। নমুনা সংগ্রহ হলেও রিপোর্ট এখনো হাতে পাইনি।
এ দিকে হাম মোকাবেলায় প্রাথমিক প্রস্তুতি হিসেবে জেলায় ছয় হাসপাতালে আইসোলেশন ইউনিট খোলা হয়েছে বলে জানিয়েছে স্বাস্থ্য বিভাগ। প্রাথমিক ধাপে প্রস্তুত রাখা হয়েছে ১৪টি শয্যা।