পুঁজিবাজারে লেনদেন ও সূচকের বড় উন্নতি
রাষ্ট্রায়ত্ত ও বহুজাতিক কোম্পানির সাথে বৈঠক বিএসইসির
Printed Edition
অর্থনৈতিক প্রতিবেদক
হঠাৎ করে সূচক ও লেনদেনের বড় ধরনের উন্নতি ঘটল পুঁজিবাজারে। গতকাল মঙ্গলবার সপ্তাহের তৃতীয় কর্মদিবসে এসে দেশের দুই পুঁজিবাজারেই এ ঘটনা ঘটে। এ দিন লেনদেনের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত কোনো বিক্রয়চাপ ছাড়াই সূচকের উন্নতি ঘটে। উভয় বাজারেই লেনদেন হওয়া কোম্পানি ও ফান্ডগুলোর প্রায় ৮৫ শতাংশের মূল্যবৃদ্ধি পাওয়ার পাশাপাশি ঢাকা শেয়ারবাজারে লেনদেনেরও বড় ধরনের উন্নতি ঘটে। সংশ্লিষ্টরা দিনের বাজার আচরণকে ইতিবাচক হিসেবেই দেখছেন।
ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) প্রধান সূচক ডিএসইএক্স গতকাল ৫৬ দশমিক ৬১ পয়েন্ট বৃদ্ধি পায়। ৪ হাজার ৯০৬ দশমিক ২৯ পয়েন্ট থেকে লেনদেন শুরু করা সূচকটি মঙ্গলবার দিনশেষে পৌঁছে যায় ৪ হাজার ৯৬২ দশমিক ৯০ পয়েন্টে। সূচকের বড় ধরনের উন্নতি দিয়েই গতকাল লেনদেনের শুরু। সকাল সাড়ে ১০টায়ই ডিএসই সূচকটি পৌঁছে যায় ৪ হাজার ৯৬১ পয়েন্টে। এ পর্যায়ে সূচকের উন্নতি রেকর্ড করা হয় ৫৫ পয়েন্ট। লেনদেনের এ পর্যায়ে মৃদু বিক্রয়চাপ তৈরি হলে বেলা ১২টার দিকে সূচকটি নেমে আসে ৪ হাজার ৯৩৯ পয়েন্টে। সাময়িক এ পতনের পর ফের ঊর্ধ্বমুখী রূপ নেয় সূচকটি। দুপুর সোয়া ১২টার দিকে সূচকটি পৌঁছে যায় ৪ হাজার ৯৭৫ পয়েন্টে। এ পর্যায়ে সূচকের উন্নতি ঘটে প্রায় ৬২ পয়েন্টে। তবে দিনের সমন্বয় শেষে সূচকটির ৫৬ দশমিক ৬১ পয়েন্ট টিকে থাকে। একই সময় বাজারটির দুই বিশেষায়িত সূচক ডিএসই-৩০ ও ডিএসই শরিয়াহর উন্নতি ঘটে যথাক্রমে ১৪ দশমিক ৮২ ও ১১ দশমিক ৬৯ পয়েন্ট।
দেশের দ্বিতীয় পুঁজিবাজার চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জে (সিএসই) প্রধান সূচক সিএএসপিআই এদিন ৯৯ দশমিক ৫৭ পয়েন্ট উন্নতি ধরে রাখতে সক্ষম হয়। বাজারটির দুই বিশেষায়িত সূচক সিএসই-৩০ ও সিএসসিএক্স সূচকের উন্নতি ঘটে যথাক্রমে ৭১ দশমিক ১৮ ও ৫৬ দশমিক ২০ পয়েন্ট।
সূচকের বড় উন্নতি ডিএসইর লেনদেনেও বড় ধরনের প্রভাব ফেলে। গতকাল ঢাকা শেয়ারবাজার ৪৫৮ কোটি টাকার লেনদেন নিষ্পত্তি করে, যা আগের দিন অপেক্ষা ৯৪ কোটি টাকা বেশি। সোমবার ডিএসইর লেনদেন ছিল ৩৬৪ কোটি টাকা। তবে একই সময় চট্টগ্রাম শেয়ারবাজারের লেনদেন আগের দিনের মতো ১৫ কোটিতেই স্থির ছিল। বাজার বিশ্লেষকরা গতকালের বাজার আচরণকে ইতিবাচক হিসেবেই দেখছেন। তারা মনে করেন দীর্ঘ পতনের পর বাজার তার স্বাভাবিক অবস্থা ফিরে পাচ্ছে। কিন্তু এ সময় সাধারণ বিনিয়োগকারীদের সতর্কতার সাথে বিনিয়োগে থাকতে হবে। কারণ এটা ডিসেম্বর মাস। বরাবরই এ মাসের শেষদিকে বিভিন্ন ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো পুঁজিবাজারের বিনিয়োগ থেকে তাদের মুনাফা তুলে নিতে সচেষ্ট থাকে। তাই বাজারের মূল্যস্তরের এ পর্যায়ে নতুন কোনো বিনিয়োগে না গিয়ে ইতঃপূর্বে করা বিনিয়োগকে সংহত করার দিকেই মনযোগী হওয়া উচিত। কারণ আমাদের বাজারের একটি খারাপ দিক হচ্ছে এখানে মূল্যবৃদ্ধির সময়ই সবাই বাজারে ঝাঁপিয়ে পড়েন। আর যারা মুনাফা তুলে নিতে সচেষ্ট থাকেন তারা নিজেদের বিনিয়োগের মুনাফা তুলে নিতে গিয়ে বিক্রয়চাপ বাড়িয়ে দেন। এতে শেষদিকে আসা বিনিয়োগকারীরা ভালো বাজারের সুবিধাও নিতে পারেন না।
গতকালের বাজার আচরণের উল্লেখযোগ্য দিক ছিল ভালো কোম্পানিগুলোতেও বিনিয়োগকারীদের আগ্রহ। এতদিন বাজারে যে মৌলভিত্তিহীন কোম্পানিগুলোর একচ্ছত্র আধিপত্য ছিল গতকালের লেনদেন ও মূল্যবৃদ্ধিতে এগুলোর প্রাধান্য কিছুটা হলেও কমেছে। স্কয়ার ফার্মার মতো কোম্পানি গতকাল লেনদেনের শীর্ষ তালিকায় উঠে এসেছে। আর মূল্যবৃদ্ধিতে শীর্ষ দৃ’টি কোম্পানি ছিল বীমা খাতের। বাজারের স্বাভাবিক আচরণে ফেরার দিকেই তাকিয়ে আছেন সংশ্লিষ্টরা।
এ দিকে খসড়া বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (পাবলিক অফার অব ইকুইটি সিকিউরিটিজ) রুলস, ২০২৫ এবং পুঁজিবাজারে সরাসরি তালিকাভুক্তির বিষয়ে পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের সাথে রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন ও বহুজাতিক কোম্পানিগুলোর বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে।
সোমবার রাজধানীর আগারগাঁওয়ে বিএসইসি ভবনে বিকেল ৩টায় নিয়ন্ত্রক সংস্থার চেয়ারম্যান খন্দকার রাশেদ মাকসুদ উক্ত বৈঠকে সভাপতিত্ব করেন। কমিশনের পরিচালক ও মুখপাত্র মো: আবুল কালাম স্বাক্ষরিত এক প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়। বৈঠকটিতে খসড়া আইপিওর পাবলিক অফার রুলস ২০২৫ সংশ্লিষ্ট বিষয়ে এবং কিভাবে রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন ও বহুজাতিক কোম্পানিগুলোকে পুঁজিবাজারে সরাসরি তালিকাভুক্ত করা যায় সে বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে। বৈঠকে কোম্পানিগুলোর প্রতিনিধিবৃন্দ বিভিন্ন বিষয়ে তাদের মতামত ও পরামর্শ তুলে ধরেন। বিএসইসির চেয়ারম্যান খসড়া আইপিও রুলসের বিষয়ে বলেন, নতুন রূলসের মাধ্যমে আইপিও সংশ্লিষ্ট রেগুলেটরি ফ্রেমওয়ার্কের আধুনিকীকরণ ও শক্তিশালীকরণ করা হয়েছে। নতুন রুলসের মাধ্যমে পুঁজিবাজারের তালিকাভুক্তিতে আগ্রহী কোম্পানিগুলো ন্যায্য প্রাইসিং ও ভ্যালুয়েশনের নিশ্চয়তা পাবেন বলে আশ্বস্ত করেন তিনি।
তিনি আরো বলেন, বহুজাতিক কোম্পানিসহ রাষ্ট্র মালিকানাধীন লাভজনক মৌলভিত্তি সম্পন্ন কোম্পানিগুলোকে পুঁজিবাজারে সরাসরি তালিকাভুক্তির জন্য ইতঃপূর্বে প্রধান উপদেষ্টা নির্দেশনা দিয়েছেন। নির্দেশনা মোতাবেক কোম্পানিগুলোকে পুঁজিবাজারে আসতে হবে। এ ক্ষেত্রে সরকারের সর্বোচ্চপর্যায়ের নির্দেশনা ইতোমধ্যে কোম্পানিগুলোকে জানানো হয়েছে। যত দ্রুত সম্ভব এর বাস্তবায়ন নিয়ে কাজ করতে হবে।
বিএসইসির কমিশনার মু: মোহসিন চৌধুরী, কমিশনার ফারজানা লালারুখ, কমিশনার মো: সাইফুদ্দিন, ইনভেস্টমেন্ট করপোরেশন অব বাংলাদেশের (আইসিবি) ব্যবস্থাপনা পরিচালক নিরঞ্জন চন্দ্র দেবনাথ, আইসিবি ক্যাপিটাল ম্যানেজমেন্ট লিমিটেডের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মাজেদা খাতুন, আইসিবি ক্যাপিটাল ম্যানেজমেন্ট লিমিটেডের উপপ্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা শরীফ মোহাম্মদ কিবরিয়া, বাংলাদেশ কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ করপোরেশনের (বিসিআইসি) উপমহাব্যবস্থাপক (বাণিজ্যিক) মোহাম্মদ শামীম রানা, সিনোভিয়া ফার্মা পিএলসির চিফ ফাইন্যান্সিয়াল অফিসার (সিএফও) গোলাম রব্বানী আকন্দ, নেভিয়ান লাইফ সায়েন্স পিএলসির (নোভারটিস বাংলাদেশ লিমিটেড) ভারপ্রাপ্ত চিফ ফাইন্যান্সিয়াল অফিসার (সিএফও), কর্ণফুলী গ্যাস ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেডের ব্যবস্থাপক মাহমুদা সুলতানা, নর্থ ওয়েস্ট পাওয়ার জেনারেশন কোম্পানি লিমিটেডের কোম্পানি সচিব বিমল চন্দ্র রায় ও উপ-মহাব্যবস্থাপক (অর্থ) আবদুল্লাহ্ আল মামুন, সিলেট গ্যাস ফিল্ড লিমিটেডের সহকারী ব্যবস্থাপক হাসান মাহমুদসহ বিএসইসির ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা এ সময় বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন।