জুরাইন রেলগেটে ধুলোমাখা ইফতারের গল্প

Printed Edition
back-2
রাজধানীর ফুটপাথে শ্রমজীবীদের ইফতারের সংক্ষিপ্ত আয়োজন : নয়া দিগন্ত

হাবিবুল বাশার

রাজধানীর জুরাইন রেলগেট। দিন-রাত চব্বিশ ঘণ্টা যেখানে যানজট, মানুষের কোলাহল আর ট্রেনের হুইসেল মিলেমিশে একাকার। এই ধুলোবালি আর যান্ত্রিকতার মধ্যেই লুকিয়ে আছে হাজারো স্বপ্নবাজ মানুষের জীবনযুদ্ধের গল্প। যারা গ্রাম ছেড়েছেন কেবল দু’মুঠো অন্নের খোঁজে নয়, বরং বাড়িতে রেখে আসা বৃদ্ধ মা-বাবা কিংবা সন্তানের সোনালি ভবিষ্যতের আশায়। রমজান এলে এই মানুষগুলোর সংগ্রাম কয়েক গুণ বেড়ে যায়। আসন্ন ঈদকে সামনে রেখে বাড়তি কিছু আয়ের আশায় তারা নিজেদের আরাম-আয়েশ বিসর্জন দিয়ে লিপ্ত হন এক অবিরাম পরিশ্রমে।

পথের পাশেই যখন দস্তরখান

ইফতারের সময় ঘনিয়ে এলে জুরাইন মোড়ে এক অদ্ভুত দৃশ্য চোখে পড়ে। যখন শহরের বিত্তবানরা শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত রেস্তোরাঁয় হরেক পদের ইফতারের অপেক্ষায় থাকেন, তখন জুরাইন রেলগেটের রিকশাচালক, লেগুনাচালক আর বাস হেলপারদের ইফতার জমে ওঠে রাস্তার পাশেই। ধুলোমাখা ফুটপাথ কিংবা দাঁড়িয়ে থাকা রিকশার সিটই তখন তাদের ডাইনিং টেবিল। আজানের সাথে সাথেই হাতের ময়লা গামছায় মুছে নিয়ে তারা মুখে তুলে নেন নামমাত্র কিছু খাবার।

মুড়ি ভর্তায় দারিদ্র্যের স্বাদ

এই শ্রমজীবী মানুষগুলোর ইফতারের প্রধান আকর্ষণ হলো ‘মুড়ি ভর্তা’। তবে এই ভর্তায় আভিজাত্য নয়, মিশে থাকে সারা দিনের ক্লান্তি। বড় একটি প্লাস্টিকের মগ বা পলিথিনে করে চলে এই মাখানো। তাতে থাকে:

আলুর চপ ও বেগুনি : রাস্তার ধারের খোলা কড়াইয়ে ভাজা কালচে তেলের আলুর চপ আর পাতলা বেগুনি, যা মুড়ির সাথে চটকে মাখানো হয়।

বুট-ছোলা : আগের রাতে ভেজানো সেদ্ধ ছোলা, যা অল্প মশলায় ভাজা হয়েছে। এটিই তাদের প্রোটিনের একমাত্র উৎস।

মুড়ি ও কাঁচা মরিচ : সাথে থাকে প্রচুর পরিমাণে মুড়ি আর ঝাল ঝাল কাঁচা মরিচ, যা ক্ষুধা মেটাতে সাহায্য করে।

ফুটপাথের জুস ও রুটি-কলা : তৃষ্ণা মেটাতে রঙ মেশানো সস্তা শরবত আর পেট ভরাতে অনেকের ভরসা বনরুটি ও সাগর কলা।

বাস্তবতার বয়ান : ঘামভেজা স্বপ্ন

রেলগেটের জ্যামে আটকে থাকা এক বাসের হেলপার। সারা দিন বাসের দরজায় ঝুলে ডাকাডাকি করেন। ইফতারের আগ মুহূর্তে তিনি বলেন, ‘বাবা, ইফতারের টাইম হইছে কি না বুঝনের সময় পাই না। প্যাসেঞ্জার নামাইতে নামাইতে যখন আজান দেয়, তখন এক মুঠো বুট-মুড়ি মুখে দিই। বাড়ির পোলাপাইনগো নতুন জামা দিমু বইলা রোজা রাইখাই এই রোদে চিল্লাই। নিজের খাবারের কথা ভাবলে তো আর চাকা ঘুরবো না।’

পাশেই দাঁড়িয়ে থাকা রিকশাচালক আক্ষেপের সুরে বলেন, ‘গ্রামের বাড়ি কুড়িগ্রাম। অহন রাইতের বেলাও রিকশা চালাই ঈদ বোনাসের আশায়। ইফতারে এক গ্লাস ফুটপাথের জুস আর দুটো আলুর চপ-বেগুনি দিয়া মাখানো মুড়িই যথেষ্ট। আমাগো মত গরিবের লাইগ্যা ইফতার মানে পেট ভরা না, শুধু জানটা টিকাইয়া রাখা।’

ফুটপাথের এক ছোট ফাস্টফুড বা জুস বিক্রেতার ব্যস্ততা সবচেয়ে বেশি। তিনি বলেন, ‘মানুষরে শরবত আর বেগুনি খাওয়াইতে খাওয়াইতে নিজের ইফতারের কথা ভুইলা যাই। যখন সবাই ইফতার কইরা চইলা যায়, তখন অবশেষ যা থাকে, একটু ঠাণ্ডা বুট আর মুড়ি- তা দিয়াই নিজের ইফতার সারি। এইটাই জীবন।’

স্বপ্ন ও পুনর্বাসনের আকাক্সক্ষা

জুরাইনের এই বিশাল জনসমষ্টির লড়াই কেবল নিজের জন্য নয়। এখানে কাজ করা প্রতিটা মানুষের পেছনে আছে একটি করে পরিবারের স্বপ্ন। এই সামান্য আয়ে তারা কেউ বোনের বিয়ে দিতে চান, কেউ ভেঙে যাওয়া টিনের ঘরটা মেরামত করতে চান, আবার কেউ সন্তানের স্কুলের বেতন জোগাতে চান। এই চরম দারিদ্র্য আর পরিশ্রমের মধ্যেও তাদের মুখে তৃপ্তির হাসি দেখা যায় তখন, যখন তারা ভাবেন মাস শেষে বাড়িতে টাকা পাঠাতে পারবেন।

জুরাইন রেলগেটের এই ইফতার কোনো উৎসব নয়, বরং বেঁচে থাকার তাগিদে এক অনিবার্য বিরতি। এখানকার বাতাস ধুলোবালি আর ডিজেলের ধোঁয়ায় ভারী হলেও, মানুষের নিরন্তর পরিশ্রমের ঘ্রাণ তাতে এক অন্যরকম আবেদন তৈরি করে। বিত্তবানদের আভিজাত্যের পাশে এই নি¤œবিত্তের অভাবী ইফতারি আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয়, দুনিয়ার সব আনন্দ সবার জন্য সমান নয়।