ঐক্যবদ্ধ থাকলে জনতার বিজয় কেউ ঠেকাতে পারবে না : তারেক রহমান
Printed Edition
বিশেষ সংবাদদাতা
বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান বলেছেন, পতিত চক্রের অপরিণামদর্শী অপচেষ্টার কারণে পরিস্থিতির সুযোগ নিয়ে এখন আবার মুক্তিযুদ্ধের পরাজিত একটি চক্র বিজয়ের নতুন ইতিহাস রচনার অপচেষ্টা করছে। পরাজিত চক্রকে মোকাবেলায় প্রতিশোধ প্রতিহিংসার পরিবর্তে বিজয়ের স্বপ্ন প্রতিটি মানুষের ঘরে পৌঁছে দেয়ার জন্য স্বনির্ভর, সমৃদ্ধ একটি গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠাই হোক বিজয় দিবসে আমাদের অঙ্গীকার। শুধু আমার নয়, বিএনপি মনে করে, যত দিন পর্যন্ত এই রাষ্ট্রে জনগণের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ক্ষমতা নিশ্চিত করা না যাবে তত দিন পর্যন্ত স্বাধীনতা ও গণতন্ত্র টেকসই ভিত্তির ওপর দাঁড় করানো যাবে না।
গতকাল সোমবার বিকেলে বিজয় দিবসের আলোচনা সভায় তারেক রহমান এসব কথা বলেন। তিনি বলেন, প্রতিটি আন্দোলন-সংগ্রামে প্রমাণিত হয়েছে জনগণ ঐক্যবদ্ধ থাকলে জনতার বিজয় কেউ ঠেকিয়ে রাখতে পারে না। ভয়ের কোনো কারণ নেই। আমি দৃঢ় কণ্ঠে বলতে চাই, নির্ধারিত সময়েই নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে।
তারেক রহমান বলেন, আমি বিজয় দিবসের এই গৌরবজনক সময় দৃঢ়ভাবে বলতে চাই, যারা স্বাধীনতা প্রিয় গণতন্ত্রকামী জনগণকে ভয় দেখাতে চায় তারা অবশ্যই ব্যর্থ হবে ইনশাআল্লাহ। ভয় কোন কারণে? মানুষের জয়-পরাজয়, জীবন-মৃত্যু সবকিছু আল্লাহর হাতে নির্ধারিত। সুতরাং আল্লাহর ওপরে ভরসা রেখে আমরা সবাই যদি ঐক্যবদ্ধভাবে জনগণের অধিকার প্রতিষ্ঠার মিছিল এগিয়ে নিয়ে যেতে থাকি ইনশাআল্লাহ ষড়যন্ত্রকারী অবশ্যই পিছু করতে বাধ্য হবে।
তিনি বলেন, ১৯৭১ সালে প্রমাণিত হয়েছে, ২০২৪ সালে প্রমাণিত হয়েছে, ১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বর , ৯০ সালের স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলনসহ প্রতিটি আন্দোলন-সংগ্রামে প্রমাণিত হয়েছে জনগণ ঐক্যবদ্ধ থাকলে জনতার বিজয় কেউ ঠেকিয়ে রাখতে পারে না। আমি দৃঢ় কণ্ঠে বলতে চাই, নির্ধারিত সময়ে নির্বাচন ইনশাআল্লাহ অনুষ্ঠিত হবে।
নির্বাচনের প্রচারণায় নিজে অংশ নেয়ার প্রত্যাশা ব্যক্ত করে তারেক রহমান নেতাকর্মীদের তুমুল করতালির মধ্যে বলেন, আসন্ন নির্বাচনকে সামনে রেখে গ্রামেগঞ্জে, শহরে-বন্দরে, ওয়ার্ডে-মহল্লায়, অলি-গলিতে, রাজপথে জনগণের নিজেদের অধিকার প্রতিষ্ঠার এই নির্বাচনে মিছিলে আমিও আপনাদের সাথে থাকব ইনশাআল্লাহ। ১৮ বছর লন্ডনে নির্বাসিত জীবন কাটানোর পর আগামী ২৫ ডিসেম্বর তারেক রহমান ঢাকায় ফিরবেন বলে ইতোমধ্যে বিএনপির সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে ঘোষণা দেয়া হয়েছে। রমনার ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউট মিলনায়তনে বিএনপির উদ্যোগে মহান বিজয় দিবস উপলক্ষে এই আলোচনা সভা হয়। আলোচনা সভার শুরুতে এভারকেয়ার হাসপাতালে চিকিৎসাধীন বেগম খালেদা জিয়ার আশু আরোগ্য কামনায় বিশেষ মোনজাত হব।
এটি এক্সিপেরিমেন্ট অর্জনের নির্বাচন নয় : তারেক রহমান বলেন, আসন্ন জাতীয় নির্বাচন কিন্তু কেবল একটি এক্সপেরিমেন্ট বা এক্সপেরিয়েন্স অর্জনের নির্বাচন নয়। সম্মানিত মহাসচিব বলেছেন, আমিও অতীতে বারবার বলেছি, আসন্ন জাতীয় নির্বাচন অতীতের যেকোনো নির্বাচনের চেয়ে জটিল ও গুরুত্বপূর্ণ। কেন? এবারের নির্বাচনের সাথে জড়িত আছে বর্তমান এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের স্বাদ-আশা-আকাক্সক্ষা স্বার্থ ও সম্ভাবনা। সর্বোপরি এবারের নির্বাচনের সাথে জড়িত আছে, বাংলাদেশের স্বার্থ ও সার্বভৌমত্বকে সুসংহত রাখার প্রশ্ন।
আগামী দশকটি রূপান্তরের দশক : সভায় তারেক রহমান বলেন, আগামী দশকটি হবে রূপান্তরের দশক। এই চিন্তা নিয়ে আমরা আমাদের দেশ গড়ার কর্মসূচি বাস্তবায়নের পরিকল্পনা তৈরি করেছি। দেশের জনসংখ্যার অর্ধেক নারী, চার কোটি বা তারও বেশি তরুণ, কোটি কোটি কৃষক-শ্রমিক কর্মক্ষম এই জনসংখ্যাকে কাজে লাগিয়ে বাংলাদেশের বিজয়কে সুসম্মত করাই হচ্ছে বিএনপির একমাত্র লক্ষ্য। একটি স্বনির্ভর সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়ে তোলার মাধ্যমেই আমরা আমাদের আগামী প্রতিটি বিজয় দিবসকে আরো গৌরবান্বিত এবং আরো অর্থবহ করে গড়ে তুলতে চাই।
তারেক বলেন, বিজয়ের যে বার্তা এই বার্তাকে আমরা শুধু স্লোগানের ভেতরে সীমাবদ্ধ রাখব না। বিজয়ের সুফল প্রতিটি নাগরিকের ঘরে ঘরে পৌঁছে দিতে আসন্ন জাতীয় নির্বাচনে বিএনপি ও ধানের শীষ আর জনগণের সহযোগিতা, সমর্থন প্রত্যাশা করছে। আল্লাহর দরবারে ১৯৭১ সালে স্বাধীনতা অর্জনের যুদ্ধের শহীদ এবং ২০১৪ সালের স্বাধীনতা অর্জনের যুদ্ধের শহীদ এবং ৭১ থেকে আজ পর্যন্ত দেশে গণতান্ত্রিক আন্দোলনের শহীদদের রূহের মাগফেরাত কামনা করছি।
জিয়াউর রহমানের প্রবন্ধ একটি জাতির জন্ম : তারেক রহমান তার বাবার স্বাধীনতা ঘোষণার প্রসঙ্গ টেনে বলেন, অনেকেই হয়তো জানেন স্বাধীনতা ও মুক্তিযুদ্ধের পূর্বাপর ঘটনা বলে নিয়ে স্বাধীনতার ঘোষক বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষক শহীদ জিয়াউর রহমানের নিজের লেখা একটি প্রবন্ধ রয়েছে এবং সেটির নাম হচ্ছে, ‘একটি জাতির জন্ম’। এই প্রবন্ধটি আমাদের স্বাধীনতা এবং মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের একটি অনন্য দলিল। পতিত, পলায়নপর একটি চক্র শুধু নিজেদের হীন দলীয় স্বার্থে বাংলাদেশের স্বাধীনতা এবং মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের বিকৃতি ঘটিয়েছিল। তিনি বলেন, বাংলাদেশের স্বাধীনতা অর্জনের পর থেকে আজ পর্যন্ত যতবার দেশের গণতন্ত্র হুমকির সম্মুখীন হয়েছে। আমরা দেখেছি ততবারই দেশের স্বাধীনতা সার্বভৌমত্ব হুমকির সম্মুখীন হয়েছে। ১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বর কিংবা ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ইতিহাসের প্রতিটি বাঁকে এ সত্যতা প্রমাণিত হয়েছে। কখনোই জনগণকে ক্ষমতাহীন করে রাষ্ট্রযন্ত্র কখনোই ক্ষমতাশীল হয়ে উঠতে পারে না। জনগণকে ক্ষমতাবান করার পূর্বশর্তই হচ্ছে জনগণের সরাসরি ভোটে জনগণের কাছে দায়বদ্ধ, জনগণ জবাবদিহিমূলক সরকার প্রতিষ্ঠা এবং এ কারণেই বিএনপির সব সময় রাষ্ট্র এবং সরকারের জনগণের অধিকার প্রতিষ্ঠা করতেই যেকোনো মূল্যে দেশে অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন অনুষ্ঠানের পক্ষে সব সময় দৃঢ় অবস্থান গ্রহণ করেছেন।
নির্বাচনে প্রতিবন্ধকতায় একটি চক্রের কূটকর্ম : আলোচনা সভায় তারেক রহমান বলেন, বাংলাদেশের জনগণ কারণে-অকারণে, শর্তের পর শর্ত জুড়ে দিয়ে কিংবা নানা অজুহাতে বাংলাদেশের স্বার্থবিরোধী একটি চক্র নির্বাচন অনুষ্ঠানের পথে বারবার নানা রকম বিঘœ সৃষ্টির অপচেষ্টা তারা চালিয়ে যাচ্ছে। এখনো চলছে ক্ষেত্রে বিশেষ। আল্লাহ রহমতে সব রকম উপেক্ষা করে প্রায় দেড় দশকের বেশি সময়ের পর নির্বাচন কমিশন শেষ পর্যন্ত জনগণের সেই আকাক্সিক্ষত-কাক্সিক্ষত জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠানে তারিখটি ঘোষণা করেছে। সবাইকে সতর্ক থাকতে হবে, ষড়যন্ত্র কিন্তু এখনো থেমে নেই ।
হাদি হত্যার অপচেষ্টা প্রসঙ্গে : তারেক বলেন, গণতন্ত্রের পক্ষের সাহসী সন্তান ওসমান হাদিকে গুলি করার যে ঘটনাটি এটা সেই ষড়যন্ত্রের অংশ। কী ছিল ওসমান হাদির অপরাধ? আমার মতো একজন রাজনৈতিক কর্মী হিসেবে যে প্রশ্নগুলো দেখা দিয়েছে- এক. বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকার বা সরকারকে যদি ব্যর্থ করা যায় কারা খুশি হবে? দুই. নির্বাচন ছাড়াই বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকারকে বহাল রাখা গেলে কারা লাভবান হবে? তিন. দেশের জনগণের ভোটে জনগণের সরকার প্রতিষ্ঠিত না হলে কাদের লাভ? আমি বিশ্বাস করি এসব প্রশ্নের জবাবের মধ্যেই হাদি ঘাতকেরা লুকিয়ে রয়েছে। স্বাধীনতাপ্রিয় গণতন্ত্রকামী জনগণের শত্রুরা ঘাপটি মেরে রয়েছে এইসব প্রশ্নের ভেতরে । বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের সভাপতিত্বে ও প্রচার সম্পাদক সুলতান সালাউদ্দিন টুকুর সঞ্চালনায় আলোচনা সভায় বিএনপি স্থায়ী কমিটির সদস্য মির্জা আব্বাস, আবদুল মঈন খান, নজরুল ইসলাম খান, সালাহ উদ্দিন আহমদ, হাফিজ উদ্দিন আহমেদ, চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা কাউন্সিলের সদস্য আবদুস সালাম, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ভিসি অধ্যাপক আনোয়ার উল্লাহ চৌধুরী, যুবদলের নুরুল ইসলাম নয়ন, স্বেচ্ছাসেবক দলের রাজীব আহসান প্রমুখ বক্তব্য রাখেন।