বিডিআর মামলার দীর্ঘসূত্রতা ও ব্যয় নিয়ে প্রশ্ন
৩৬ পিপি দিয়েও মাসে সাক্ষী মাত্র ১ জন!
Printed Edition
আলমগীর কবির
পিলখানায় বিডিআর হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় দায়ের করা বিস্ফোরক মামলার বিচার প্রক্রিয়া নিয়ে চাঞ্চল্যকর তথ্য সামনে এসেছে। যেখানে তিন থেকে পাঁচজন পাবলিক প্রসিকিউটর (পিপি) দিয়েই মামলাটি স্বচ্ছন্দে পরিচালনা করা সম্ভব, সেখানে সরকার ৩৬ জন আইনজীবীর এক বিশাল বহর নিয়োগ দিয়ে রেখেছে। রাষ্ট্রের কোষাগার থেকে প্রতি মাসে এদের পেছনে কোটি টাকার বেশি ব্যয় হলেও বিচারিক কাজে তার প্রতিফলন নেই বললেই চলে। ১ হাজার ২৮৭ জন সাক্ষীর এই মামলায় মাসে গড়ে মাত্র একজন সাক্ষীর সাক্ষ্য নেয়া হচ্ছে।
এ বিষয়ে আসামি পক্ষের অন্যতম আইনজীবী অ্যাডভোকেট পারভেজ হোসেনের দেয়া তথ্যে বিডিআর মামলার বিচার প্রক্রিয়ার এমন নজিরবিহীন ধীরগতি ও রাষ্ট্রীয় অর্থের অপচয়ের চিত্র ফুটে উঠেছে।
গতকাল নয়া দিগন্তকে অ্যাডভোকেট পারভেজ হোসেন জানান, বিডিআর ট্র্যাজেডির ঘটনায় বিস্ফোরক মামলাটি বর্তমানে জজ কোর্টে চলমান। এই মামলায় মোট সাক্ষী ১২৮৭ জন, যার মধ্যে গত ১৭ বছরে মাত্র ৩০৬ জনের সাক্ষ্য গ্রহণ সম্পন্ন হয়েছে। মামলার বর্তমান গতি নিয়ে প্রশ্ন তুলে তিনি বলেন, ‘৩৬ জন পিপি নিয়োগ দেয়া হয়েছে যারা অ্যাসিস্ট্যান্ট অ্যাটর্নি জেনারেল থেকে শুরু করে ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল পদমর্যাদার। তারা প্রত্যেকে লাখ টাকার ওপরে বেতন পাচ্ছেন। সব মিলিয়ে এই মামলার পেছনে সরকারের মাসে এক কোটি টাকার বেশি খরচ হচ্ছে। কিন্তু কাজের কাজ কিছুই হচ্ছে না। মাসে বড়জোর একজন সাক্ষী হাজির করা হচ্ছে।’
তিনি অভিযোগ করেন, পূর্ববর্তী সরকার মূলত দলীয় কর্মীদের সুযোগ-সুবিধা দেয়ার জন্যই এই বিশাল পিপি বহর নিয়োগ করেছিল। এই ‘অপ্রয়োজনীয়’ খরচ বন্ধ করে বিচারিক গতি বাড়ানো এখন সময়ের দাবি।
এ দিকে এই মামলার সর্বশেষ অগ্রগতি পর্যালোচনা করে দেখা গেছে এক করুণ চিত্র। ট্রায়াল কোর্ট ও হাইকোর্ট থেকে যারা চূড়ান্তভাবে খালাস পেয়েছেন, তারাও গত ১৭ বছর ধরে মুক্ত বাতাসে নিঃশ্বাস নিতে পারছেন না। বিস্ফোরক মামলার জালে আটকা পড়ে তারা কারাগারেই ধুঁকছেন। তবে ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পটপরিবর্তনের পর থেকে পরিস্থিতির কিছুটা বদল শুরু হয়েছে। আদালত ইতোমধ্যে ১০ বছরের নিচে সাজাপ্রাপ্ত ও খালাসপ্রাপ্তদের মধ্য থেকে ১২৪ জনকে জামিন দিয়েছেন। সর্বশেষ গত বৃহস্পতিবার ২১ জনের জামিন হওয়ায় এই সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১৪৫ জনে। আসামিপক্ষের আইনজীবীরা আশা করছেন, আইনি প্রক্রিয়ায় বাকিরাও দ্রুত মুক্তি পাবেন।
বিডিআর হত্যাকাণ্ডের তদন্তকে ‘ভুল ও ত্রুটিপূর্ণ’ আখ্যা দিয়ে অ্যাডভোকেট পারভেজ হোসেন বলেন, এই ঘটনার প্রকৃত পরিকল্পনাকারী, কুশীলব ও অর্থদাতাদের তৎকালীন তদন্তের আওতায় আনা হয়নি। তিনি বলেন, ‘শুরু থেকেই আমরা বলে আসছি এটি একটি রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত তদন্ত ছিল। ঘটনার আসল মাস্টারমাইন্ড শেখ হাসিনা বা তাপসের মতো ব্যক্তিদের আড়াল করা হয়েছে।’
২০০৯ সালের ২৫ ও ২৬ ফেব্রুয়ারি সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিডিআরের (বর্তমানে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ-বিজিবি) সদর দফতরে নৃশংস এ হত্যাকাণ্ডের ঘটনা তদন্ত করতে অন্তর্বর্তী সরকার একটি জাতীয় স্বাধীন তদন্ত কমিশন গঠন করেছিল। আ ল ম ফজলুর রহমানের নেতৃত্বে গঠিত ওই কমিশন ১১ মাস সময় নিয়ে একটি প্রতিবেদন তৈরি করে। ওই রিপোর্টটি এখন বর্তমান সরকারের হাতে রয়েছে। অ্যাডভোকেট পারভেজ হোসেন বলেন, বর্তমান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাউদ্দিন আহামেদ বিষয়টি গুরুত্বের সাথে নিয়েছেন। তিনি দাবি করেন, ‘সিআরপিসি-এর ১৭৩ ধারা অনুযায়ী এই তদন্ত রিপোর্টের ভিত্তিতে অধিকতর তদন্ত হওয়া প্রয়োজন। তবেই প্রকৃত অপরাধীরা আইনের আওতায় আসবে এবং নির্দোষ ব্যক্তিরা ন্যায়বিচার পাবে।’
আসামিপক্ষের এই আইনজীবীর মতে, বর্তমান সরকার যেহেতু জনআকাক্সক্ষার প্রতিফলন ঘটাতে চায়, তাই পিলখানা হত্যাকাণ্ডের আদ্যোপান্ত রহস্য উদ্ঘাটন করা তাদের নৈতিক দায়িত্ব। অপ্রয়োজনীয় পিপি বহর কমিয়ে এবং স্বাধীন তদন্ত কমিশনের রিপোর্টের আলোকে দ্রুত আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করলেই নিহত সেনাকর্মকর্তা ও কারাবন্দী নির্দোষ জওয়ানদের পরিবার ন্যায়বিচার পাবে বলে তিনি মনে করেন।
প্রসঙ্গত কমিশনের সভাপতি আ ল ম ফজলুর রহমান গত বছর সাংবাদিকদের বলেছিলেন, সেনাবাহিনীকে দুর্বল করতে ও ক্ষমতা টিকিয়ে রাখতে বিডিআর হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটানো হয়েছে। এ ঘটনার সাথে শেখ হাসিনাসহ ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগের বেশ কয়েকজন নেতা এবং ভারতের সম্পৃক্ততা পাওয়া গেছে। এ ছাড়া বিডিআর সদস্যদের মধ্যেও বিভিন্ন বিষয় নিয়ে ক্ষোভ ছিল বলেও কমিশনপ্রধান জানান।