এনসিপির গোলটেবিলে বক্তারা

গণভোটে গড়িমসি ও অধ্যাদেশ বাতিল করে সরকার জুলাইকে সঙ্কটে ফেলেছে

Printed Edition
back-4
জাতীয় প্রেস ক্লাবে এনসিপির গোলটেবিল বৈঠকে অতিথিরা : নয়া দিগন্ত

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিনিধি

‘গণভোটে জনগণ যে সিদ্ধান্ত দিয়েছে, সেটিই চূড়ান্ত হওয়ার কথা। কিন্তু সরকার সংবিধানের অজুহাত তুলে সেই রায় বাস্তবায়ন থেকে সরে আসছে, যা গণতান্ত্রিক চেতনার পরিপন্থী। এর মাধ্যমে এই সরকার জুলাই সঙ্কটে ফেলে দিয়েছে।’

গতকাল বুধবার বিকেলে জাতীয় প্রেস ক্লাবের তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়া অডিটোরিয়ামে ‘অধ্যাদেশ বাতিল এবং গণভোট এবং গণভোট অস্বীকারের রাজনীতি : সংসদীয় স্বৈরতন্ত্রের যুগে বাংলাদেশ’ শীর্ষক এক গোলটেবিল বৈঠকে বক্তারা এ কথা বলেন।

বক্তারা বলেন, ‘জনগণের সার্বভৌমত্বের জায়গাটি উপেক্ষা করে সংসদীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতার জোরে সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দেয়া হলে তা শেষ পর্যন্ত রাষ্ট্রের জন্য ক্ষতিকর হয়ে দাঁড়াবে।

সুজনের সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদার সামগ্রিক পরিস্থিতিকে ‘অপ্রয়োজনীয় সঙ্কট সৃষ্টির প্রবণতা’ হিসেবে উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, ‘আমরা নিজেরাই নতুন নতুন সঙ্কট তৈরি করছি। গণভোটের রায় বাস্তবায়নে অজুহাত দেয়া দুর্বল যুক্তি।’

তিনি ১৯৯০ সালের উদাহরণ টেনে বলেন, ‘সংবিধানে না থাকলেও রাজনৈতিক ঐকমত্যের ভিত্তিতে তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠন করা হয়েছিল। দেশের স্বার্থে এমন সিদ্ধান্ত নেয়া সম্ভব- যদি সদিচ্ছা থাকে।’

তিনি আরো সতর্ক করে বলেন, ‘দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অনেক সময় অভিশাপ হয়ে দাঁড়ায়, যদি তা দায়িত্বশীলভাবে ব্যবহার না করা হয়।’

ঐক্যের ওপর গুরুত্ব দিয়ে তিনি বলেন, ‘যে ঐক্যের মাধ্যমে স্বৈরাচারের পতন ঘটেছিল, সেই ঐক্য এখন ভেঙে যাচ্ছে। বিভক্তি বাড়লে এর খারাপ ফল সবাইকে ভোগ করতে হবে।’

বিশিষ্ট রাষ্ট্রবিজ্ঞানী অধ্যাপক ড. দিলারা চৌধুরী বলেন, অভ্যুত্থানের পর তিনি লক্ষ করেছেন যে ছাত্র-জনতা অতীতের মতোই যেমন ১৯৭১ ও ১৯৯১ সালে হয়েছিল- বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠিত এলিট স্ট্রাকচার ভাঙার চেষ্টা করেছে। এই এলিট কাঠামোর মধ্যে রয়েছে সিভিল ব্যুরোক্রেসি, সামরিক বাহিনী এবং সুশীল সমাজের একটি অংশ, যারা জনগণের স্বার্থে কাজ করার কথা থাকলেও বাস্তবে অনেক ক্ষেত্রে নিজেদের স্বার্থ রক্ষা করে।

তার মতে, একটি সফল গণতন্ত্র বা সফল বিপ্লব প্রতিষ্ঠা করতে হলে এই ক্ষমতা কাঠামোর ভেতর থেকেই কিছু অংশকে পরিবর্তনের সাথে সম্পৃক্ত হতে হয়।

দিলারা চৌধুরী আরো বলেন, বর্তমান পরিস্থিতি একটি পরিকল্পিত প্রক্রিয়ার অংশ। ঘটনাগুলো যেন ‘মেটিকুলাসলি ডিজাইন করা’- যেখানে একটি গোষ্ঠী ক্ষমতা হস্তান্তরের পেছনে কাজ করেছে এবং উগ্রবাদের ভয় দেখিয়ে রাজনৈতিক উদ্দেশ্য বাস্তবায়নের চেষ্টা হয়েছে।

অন্তর্বর্তী সরকারের সাবেক উপদেষ্টা ফরিদা আক্তার জনগণের সার্বভৌমত্বের প্রশ্নটি জোর দিয়ে তুলে ধরে বলেন, সংসদের সার্বভৌমত্বের কথা বলা হলেও প্রকৃত সার্বভৌমত্ব জনগণের। জনগণের ওপর কোনো সার্বভৌমত্ব থাকতে পারে না।’

অধ্যাদেশ সংশোধনের প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘১৩৩টি অধ্যাদেশকে তিন ভাগে ভাগ করা হয়েছে- কিছু রাখা হবে, কিছু বাতিল হবে, আর কিছু সংশোধন করা হবে। কিন্তু এই প্রক্রিয়ায় জনগণের স্বার্থ উপেক্ষিত হচ্ছে।’

তিনি বলেন, ‘কিছু আইনে করপোরেট স্বার্থকে অগ্রাধিকার দেয়া হচ্ছে, যা দেশের খাদ্য নিরাপত্তা ও জনস্বার্থের জন্য হুমকিস্বরূপ।’

ব্যারিস্টার আবু হেনা রাজ্জাকি বলেন, ‘ফৌজদারি অপরাধের কোনো তামাদি নেই। সংবিধান লঙ্ঘন করে নেয়া সিদ্ধান্ত ভবিষ্যতে সংশ্লিষ্টদের জন্য আইনি জটিলতা তৈরি করতে পারে।’

তিনি আরো বলেন, ‘সংবিধান সংশোধন, স্থগিত বা বাতিল হতে পারে- কিন্তু সেটির অপব্যবহার করা হলে তা রাষ্ট্রের জন্য বিপজ্জনক দৃষ্টান্ত তৈরি করবে।’

তিনি বলেন, ‘যেসব অধ্যাদেশ জনগণের স্বার্থে আনা হয়েছিল, সেগুলো বাতিল করার পেছনে রাজনৈতিক উদ্দেশ্য কাজ করছে।’

সারজিস আলম দেশের বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক স্বাভাবিক করার কথা বলা হলেও বাস্তবে সীমান্তে হত্যাকাণ্ড বন্ধ হয়নি। বরং আমরা দেখছি, দেশের স্বার্থ রক্ষার চেয়ে কূটনৈতিক তৎপরতা প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে উঠছে।’

তিনি আরো অভিযোগ করেন, ‘মাঠপর্যায়ে বিরোধী মতকে দমন করতে মিথ্যা মামলা দেয়া হচ্ছে, প্রশাসনিক সুবিধা একদলীয়ভাবে বণ্টন করা হচ্ছে এবং স্থানীয়ভাবে একক আধিপত্য প্রতিষ্ঠার চেষ্টা চলছে। যেকোনো নতুন স্বৈরাচার তৈরি হলে দেশের একাধিক প্রজন্ম আবারো রাস্তায় নামতে প্রস্তুত রয়েছে।’

তিনি বলেন, বিচারকদের ব্যক্তিগত আলোচনার স্ক্রিনশটের ভিত্তিতে শোকজ করা হচ্ছে- এটি বিচার বিভাগের স্বাধীনতার ওপর সরাসরি হস্তক্ষেপ।’

তিনি বলেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সমালোচনামূলক পোস্টের কারণে গ্রেফতার বাড়ছে। এটি একটি ভয়ভীতির পরিবেশ তৈরি করছে, যেখানে মানুষ স্বাধীনভাবে মত প্রকাশ করতে পারছে না। রাষ্ট্র সংস্কারের যে স্বপ্ন মানুষ দেখেছিল, তা ধীরে ধীরে বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।

গোলটেবিল বৈঠকে বক্তব্য রাখেন- গণভোট বাস্তবায়ন নাগরিক কমিটির সহসমন্বয়ক ফাহিম মাশরুর, এনসিপির যুগ্ম আহ্বায়ক ও সংস্কার বাস্তবায়ন কমিটির উপ-প্রধান সারোয়ার তুষার, যুগ্ম আহ্বায়ক ও সংস্কার বাস্তবায়ন কমিটির সদস্য মনিরা শারমিন, যুগ্ম আহ্বায়ক ও সংস্কার বাস্তবায়ন কমিটির সদস্য জাভেদ রাসিন, যুগ্ম সদস্যসচিব সালেহ উদ্দিন সিফাত প্রমুখ।