ট্রাইব্যুনালে ব্যারিস্টার আরমান
প্রশাসনের বিভিন্ন পর্যায়ে এখনো ফ্যাসিবাদের দোসররা বহাল
Printed Edition
নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রশাসনের বিভিন্ন পর্যায়ে এখনো ফ্যাসিবাদের দোসররা স্বপদে বহাল রয়েছেন বলে মন্তব্য করেছেন ব্যারিস্টার মীর আহমাদ বিন কাসেম আরমান। গতকাল সোমবার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে একটি মামলায় সাক্ষী হিসেবে অবশিষ্ট জবানবন্দী দেয়ার সময় তিনি এই মন্তব্য করেন।
রথ্যাবের টাস্কফোর্স ফর ইন্টারোগেশন (টিএফআই) সেলে গুম ও নির্যাতনের ঘটনায় দায়ের করা মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবং সাবেক ও বর্তমান সেনাকর্মকর্তাসহ ১৭ জনের বিরুদ্ধে গত ২১ জানুয়ারি প্রথম সাক্ষী হিসেবে জবানবন্দী দিয়েছিলেন ব্যারিস্টার আরমান। গতকাল দ্বিতীয়বারের মতো ট্রাইব্যুনালে পূর্বের জবানবন্দীর বাকি অংশ শেষ করেন। এ পর্যায়ে তিনি বলেন, ‘আমার মনে হয় প্রশাসনের বিভিন্ন পর্যায়ে এখনো ফ্যাসিবাদের দোসররা স্বপদে বহাল আছে।’
এদিন দুপুরে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১-এর বিচারপতি মো: শফিউল আলম মাহমুদ এবং অবসরপ্রাপ্ত জেলা ও দায়রা জজ মো: মুহাম্মদ হক এনাম চৌধুরীর বেঞ্চে এই জবানবন্দী রেকর্ড করা হয়।
শুরুতে সাত আসামিপক্ষের আইনজীবী তাবারক হোসেন জবানবন্দী গ্রহণের বিরোধিতা করেন। তিনি বলেন, এই মামলার ৮ নম্বর অভিযুক্ত ব্যক্তি অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে রয়েছেন; তার অনুপস্থিতিতে সাক্ষীর জবানবন্দী গ্রহণ করা ঠিক হবে না। এ সময় তিনি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের একটি ঘটনার উদাহরণ টেনে ন্যায়বিচার প্রার্থনা করেন। এই আবেদনের বিরোধিতা করে প্রসিকিউটর গাজী এমএইচ তামীম বলেন, আসামি অসুস্থ থাকলে তার আইনজীবীর উপস্থিতিতে সাক্ষীর জবানবন্দী গ্রহণ করা যায়। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল আইনের ৪৩/এ এবং ৫৩-এর সাব-রুল ৩-এ এ বিষয়ে বিধান রয়েছে। তখন বিচারপতি মো: শফিউল আলম মাহমুদ ব্যারিস্টার আরমানের জবানবন্দী রেকর্ডের নির্দেশনা দেন।
দ্বিতীয় দফায় জবানবন্দীর শুরুতে ব্যারিস্টার আরমান বলেন, ‘আমি মুক্ত হয়ে আসার পর জানতে পারি, আমি যেদিন গুম হই সেদিন আমার স্ত্রী ও বোন পল্লবী থানায় জিডি করতে গিয়েছিলেন। পুলিশ প্রথমে জিডি গ্রহণ করতে অস্বীকার করে। ওই দিন রাতে পল্লবী থানার সামনে আমার পরিবারের পক্ষ থেকে সংবাদ সম্মেলন করা হলে পরদিন পুলিশ জিডি গ্রহণ করে। ২০১৬ সালের ডিসেম্বর মাসে থানা থেকে ফোন করে আমার পরিবারকে থানায় এফআইআর দায়ের করার জন্য বলা হয়। সেই অনুযায়ী আমার স্ত্রী পল্লবী থানায় এজাহার দাখিল করেন। মামলার তদন্ত শেষে তদন্তকারী কর্মকর্তা এই মর্মে চূড়ান্ত রিপোর্ট দেন যে- গুমের ঘটনা সত্য, তবে গুমের সাথে কারা জড়িত তা নির্ণয় করা সম্ভব হয়নি। আমার স্ত্রী উক্ত চূড়ান্ত রিপোর্টের বিরুদ্ধে আদালতে নারাজি দরখাস্ত দাখিল করেন।
তিনি আরো জানান, আদালত নারাজি দরখাস্ত মঞ্জুর করে মামলাটি প্রথমে অধিকতর তদন্তের জন্য ডিবিতে ন্যস্ত করেন এবং পরবর্তীতে ডিবি থেকে সিআইডিতে ন্যস্ত করেন। মামলাটি এখনো উক্ত সংস্থার তদন্তাধীন আছে।
পরবর্তীতে ব্যারিস্টার আরমান গুম কমিশনে অভিযোগ দায়ের করেন। গুম কমিশন তার বক্তব্য গ্রহণ করে এবং তার দেয়া তথ্য মতে, তাকে গুম করে যেখানে রাখা হয়েছিল, সেই স্থান ও সেল শনাক্ত করে। গুম কমিশন তাকে নিশ্চিত করে যে, তাকে রথ্যাব-১-এর কম্পাউন্ডে রথ্যাব সদর দফতর কর্তৃক পরিচালিত ইন্টেলিজেন্সের অধীনে টিএফআই সেলে বন্দী রাখা হয়েছিল। প্রধান উপদেষ্টার সাথে পরবর্তীতে তিনি উক্ত বন্দিশালা পরিদর্শন করেন।
পরিদর্শন প্রসঙ্গে তিনি বলেন, পরিদর্শনে গিয়ে আমি দেখতে পাই, আমি যে সেলে বন্দী ছিলাম সেই সেলের দরজা ভেঙে ইট গেঁথে দেয়াল তুলে দেয়া হয়েছে। ভেতরের সংযুক্ত (অ্যাটাচড) টয়লেটের দরজা ভেঙেও দেয়াল তুলে দেয়া হয়েছে। এতে প্রতীয়মান হয় যে, যারা এই বন্দিশালার দায়িত্বে ছিল, তারা প্রমাণ বিনষ্ট করার উদ্দেশ্যেই এই কাজগুলো করেছিল।
তিনি বলেন, আমার মনে হয় (পরে বলেন) আমার গুমের নির্দেশদাতা সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল, সামরিক উপদেষ্টা জেনারেল তারেক সিদ্দিকী এবং এই নির্দেশ বাস্তবায়ন করেন রথ্যাবের তৎকালীন ডিজি, এডিজি (অপারেশনস) এবং রথ্যাবের ইন্টেলিজেন্স কমান্ডার। আমার গুম হওয়া থেকে মুক্তি পাওয়া পর্যন্ত যারা যারা দায়িত্বে ছিলেন, তারা সবাই এতে জড়িত। এ সময় ব্যারিস্টার আরমান জোর দিয়ে বলেন, আমার মনে হয় প্রশাসনের বিভিন্ন পর্যায়ে এখনো ফ্যাসিবাদের দোসররা স্বপদে বহাল আছে। আমি আমার গুমের ঘটনার সাথে জড়িতদের সর্বোচ্চ শাস্তি চাই, যেন ভবিষ্যতে কেউ এ ধরনের অপরাধ করার সাহস না পায়।
জবানবন্দী শেষ হওয়ার পর মামলার ১০ নম্বর আসামি রথ্যাবের সাবেক অতিরিক্ত মহাপরিচালক (অপারেশনস) কে এম আজাদের পক্ষে ব্যারিস্টার আরমানকে জেরা করেন অ্যাডভোকেট আমিনুল গণি টিটু।
প্রথমে তিনি জানতে চান, এই মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা কতদিন আগে তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করেছেন? জবাবে আরমান বলেন, ৬-৭ মাস আগে। অপর এক প্রশ্নের জবাবে আরমান বলেন, ‘আয়নাঘরের সাক্ষী : গুম জীবনের আট বছর’ বইটি আমার বর্ণনা অনুযায়ী অন্যেরা লিখেছে এবং আমি বইটির চূড়ান্ত পাণ্ডুলিপি (ফাইনাল প্রুফ) দেখে অনুমোদন দিয়েছি। বইটি তদন্তকারী কর্মকর্তার কাছে জবানবন্দী দেয়ার পরে প্রকাশিত হয়েছে। তবে বইটি লিখতে শুরু করেছিলাম মুক্ত হওয়ার পরপরই।
এরপর আমিনুল গণি টিটু জানতে চান, ২০১৬ সালের ৪ আগস্ট কিছু লোক রথ্যাব পরিচয় দিয়ে তার বাসায় ঢুকলে ওই ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে তিনি নিজে কোনো মামলা বা অভিযোগ দায়ের করেছিলেন কি না। জবাবে আরমান বলেন, ‘না, আমি থানায় কোনো অভিযোগ দায়ের করিনি। কারণ সেই সময় রাজনৈতিক পরিবেশ অনুকূলে না থাকায় হয়রানির প্রতিকার চেয়ে কোনো আবেদন করার সুযোগ ছিল না। এমনকি ওই বছরের ৪ থেকে ৯ আগস্ট পর্যন্ত সোস্যাল মিডিয়ায়ও এই বিষয়ে কোনো পোস্ট করিনি। তবে আমি আমার পরিচিত বন্ধু-বান্ধব, দেশী-বিদেশী সাংবাদিক ও আন্তর্জাতিক মানবাধিকার কর্মীদের ইমেইল এবং মেসেজের মাধ্যমে বিষয়টি অবহিত করি।
অপর এক প্রশ্নের জবাবে আরমান বলেন, ২০১৬ সালের ৯ আগস্ট পুলিশ তাকে নিয়ে যায়। উল্লেখ্য, রথ্যাবের অভ্যন্তরে পুলিশসহ অন্যান্য বাহিনীর সদস্যরাও থাকেন। সে সময় তার মনে হয়েছিল যে ব্যক্তি তার মেয়ের কাছ থেকে জুতো নিয়েছিলেন, তিনি পুলিশ সদস্য ছিলেন। তিনি আরো জানান, ডিওএইচএসের বাসাটি তিনি গুম হওয়ার বছর দুই আগে ভাড়া নেন। সেই বাসায় কয়েকজন দারোয়ান ছিলেন, তাদের মধ্যে একজন হিন্দু সম্প্রদায়ের ছিলেন। তবে ওই বাসায় সিসি ক্যামেরা ছিল কি না, তা তার মনে নেই।
ট্রাইব্যুনালে প্রসিকিউশনের পক্ষে উপস্থিত রয়েছেন চিফ প্রসিকিউটর মোহাম্মদ তাজুল ইসলামসহ প্রসিকিউটর মিজানুল ইসলাম, গাজী এমএইচ তামিম, শাইখ মাহদী প্রমুখ। আসামিপক্ষের আইনজীবী ও স্টেট ডিফেন্স আইনজীবীরাও আদালতে উপস্থিত ছিলেন।
এ মামলার ১৭ আসামির মধ্যে ১০ জন বর্তমানে গ্রেফতার রয়েছেন। তারা হলেন রথ্যাবের সাবেক অতিরিক্ত মহাপরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো: জাহাঙ্গীর আলম, ব্রিগেডিয়ার জেনারেল তোফায়েল মোস্তফা সারোয়ার, ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো: কামরুল হাসান, ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো: মাহাবুব আলম, কর্নেল কে এম আজাদ, কর্নেল আবদুল্লাহ আল মোমেন, কর্নেল আনোয়ার লতিফ খান (অবসর প্রস্তুতিমূলক ছুটিতে), রথ্যাবের গোয়েন্দা শাখার সাবেক পরিচালক কর্নেল মো: মশিউর রহমান, লেফটেন্যান্ট কর্নেল সাইফুল ইসলাম সুমন এবং লেফটেন্যান্ট কর্নেল মো: সারওয়ার বিন কাশেম।
অন্য দিকে শেখ হাসিনাসহ পলাতক আসামিরা হলেন- তার প্রতিরক্ষাবিষয়ক সাবেক উপদেষ্টা মেজর জেনারেল (অব:) তারিক আহমেদ সিদ্দিক, সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল, সাবেক আইজিপি বেনজীর আহমেদ, রথ্যাবের সাবেক ডিজি এম খুরশিদ হোসেন, সাবেক মহাপরিচালক ব্যারিস্টার হারুন অর রশিদ এবং সাবেক পরিচালক লেফটেন্যান্ট কর্নেল (অব:) মো: খায়রুল ইসলাম।
এর আগে, গত ২৩ ডিসেম্বর এই মামলায় ১৭ আসামির বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ গঠন করে বিচার শুরুর আদেশ দেন ট্রাইব্যুনাল-১। একই সাথে সূচনা বক্তব্য ও সাক্ষ্যগ্রহণের জন্য বুধবার দিন ধার্য করা হয়। এর ধারাবাহিকতায় সাক্ষ্যগ্রহণ চলছে।