দুর্নীতিতে শীর্ষে পাসপোর্ট অফিস, দ্বিতীয় বিআরটিএ

সেবা খাতের দুর্নীতি নিয়ে টিআইবি

Printed Edition
Back------------2
টিআইবি কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলনে বক্তব্য রাখেন ড. ইফতেখারুজ্জামান : নয়া দিগন্ত

বিশেষ সংবাদদাতা

* ৮১.৬ শতাংশ মানুষ কমপক্ষে একটি খাতে দুর্নীতির শিকার

* ২০২৫ সালে ঘুষের পরিমাণ ১২ হাজার ৬৩৩ কোটি টাকা

দেশে সরকারি সেবা খাতগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি দুর্নীতি ও ঘুষের শিকার হতে হয় পাসপোর্ট অফিসে। এর পরেই দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআরটিএ)। পাসপোর্ট সেবায় সর্বোচ্চ ৮৪.৪ শতাংশ গ্রাহক দুর্নীতির এবং ৭৬.৬ শতাংশ ঘুষের শিকার হয়েছেন। অন্য দিকে বিআরটিএতে এই দুর্নীতির হার ৭৯.৩ শতাংশ এবং ঘুষের হার ৬৩.৫ শতাংশ। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) প্রকাশিত ‘সেবা খাতে দুর্নীতি : জাতীয় খানা জরিপ ২০২৫’ এর প্রতিবেদনে এই উদ্বেগজনক চিত্র উঠে এসেছে। পাসপোর্টে ঘুষ ও দুর্নীতির শিকার বেশি হলো গ্রামের মানুষ, যথাক্রমে ৭৯.১ এবং ৮৭ শতাংশ। আর সার্বিকভাবে দেশের ৬৩.৬ শতাংশ মানুষ অন্তত একটি খাতে ঘুষের শিকার হয়েছেন। অন্য দিকে ৮১.৬ শতাংশ মানুষ সেবা গ্রহণে কমপক্ষে একটি খাতে দুর্নীতির শিকার হয়েছেন। এর মধ্যে পাসপোর্ট খাতের চিত্রটি সবচেয়ে উদ্বেগজনক। খানা জরিপ ২০২৫-এ জাতীয় পর্যায়ে প্রাক্কলিত মোট ঘুষের পরিমাণ উল্লেখ করা হয় ১২ হাজার ৬৩৩ কোটি ২০ লাখ টাকা। যা ২০২৩ এর তুলনায় ১৫.৯ শতাংশ বেশি এবং ২০২৪-২৫ অর্থবছরের জাতীয় বাজেটের (সংশোধিত) ১.৫৮ শতাংশ। এই প্রাক্কলিত মোট ঘুষের পরিমাণ ২০২৪-২৫ অর্থবছরে দেশের জিডিপির ০.২৩ শতাংশ।

রাজধানীর ধানমন্ডিতে টিআইবির কার্যালয়ে গতকাল বৃহস্পতিবার এক সংবাদ সম্মেলনে এ তথ্য তুলে ধরা হয়। প্রতিবেদন উপস্থাপন অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখেন টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান। সংস্থাটির জরিপে বলা হয়, গণ-অভ্যুত্থান পরবর্তী ২০২৫ সালেও দেশের বিভিন্ন সেবা খাতে দুর্নীতি ও ঘুষের শিকার হওয়া মানুষের সংখ্যা বেড়েছে। খাতভেদে সেবা গ্রহণে পাসপোর্টে ঘুষের শিকার হওয়ার হার ভৌগোলিক অবস্থানভেদে গ্রামাঞ্চলে ৭৯.১ শতাংশ এবং শহরাঞ্চলে ৭১.৮ শতাংশ। এছাড়া সেবা গ্রহণে পাসপোর্টে দুর্নীতির শিকার হওয়ার হার ভৌগোলিক অবস্থানভেদে গ্রামাঞ্চলে ৮৭ শতাংশ এবং শহরাঞ্চলে ৭৯.৪ শতাংশ। পাসপোর্ট অফিসের পর বিআরটিএতে সেবা খাতগুলোর মধ্যে ঘুষের হার ভৌগোলিক অবস্থানভেদে গ্রামাঞ্চলে ৬১.৫ শতাংশ ও শহরাঞ্চলে ৬৬.৩ শতাংশ এবং ভৌগোলিক অবস্থানভেদে সেবা গ্রহণে বিআরটিএতে দুর্নীতির শিকার হওয়ার হার গ্রামাঞ্চলে ৮০.৪ শতাংশ এবং শহরাঞ্চলে ৭৭.৭ শতাংশ।

বিচার সংশ্লিষ্ট সেবায় ঘুষ ৭১.৩ শতাংশ : টিআইবি জানায়, সেবা গ্রহণে ঘুষের শিকার হওয়া অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের মধ্যে রয়েছে, বিচার সংশ্লিষ্ট সেবা ৭১.৩ শতাংশ, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থা ৬৯.৪ শতাংশ, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থা ৪৯.৩ শতাংশ, কৃষি ৪৯.৩ শতাংশ, ভূমি ৪৭.৬ শতাংশ, শিক্ষা (সরকারি ও এমপিওভুক্ত) ৩৪.৮ শতাংশ, স্বাস্থ্য (সরকারি) ২৯.৭ শতাংশ, স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান ২৭.৭ শতাংশ, জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি) ২১.৯ শতাংশ, জলবায়ু পরিবর্তন ও দুর্যোগ সহায়তা ১২.৫ শতাংশ, বিদ্যুৎ ৬.৮ শতাংশ, গ্যাস ৬ শতাংশ, কর ও শুল্ক ২.৮ শতাংশ, বিমা ২.৭ শতাংশ, ব্যাংকিং (সরকারি ও বেসরকারি) ১.৪ শতাংশ এবং এনজিও (প্রধানত ক্ষুদ্র ও মাঝারি ঋণ) ১.৪ শতাংশ।

এদিকে সেবা গ্রহণে দুর্নীতির শিকার হওয়া অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের মধ্যে রয়েছে, ভূমি ৬৬.৩ শতাংশ, স্বাস্থ্য (সরকারি) ৬৪.৪ শতাংশ, শিক্ষা (সরকারি ও এমপিওভুক্ত) ৫২.৫ শতাংশ, জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি) ৪৭.৪ শতাংশ, স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান ৪৬ শতাংশ, জলবায়ু পরিবর্তন ও দুর্যোগ সহায়তা ৪১.৩ শতাংশ, বিদ্যুৎ ৩৬.১ শতাংশ, বিমা ২৫.৬ শতাংশ, গ্যাস ২৫.৪ শতাংশ, ব্যাংকিং (সরকারি ও বেসরকারি) ১৬.৩ শতাংশ, এনজিও (প্রধানত ক্ষুদ্র ও মাঝারি ঋণ) ১৩.১ শতাংশ এবং কর ও শুল্ক ১১.২ শতাংশ।

ঘুষ লেনদেন বেড়েছে ১৫.৯ শতাংশ: প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, ২০২৩ সালের প্রাক্কলিত মোট ঘুষের পরিমাণের তুলনায় ২০২৫ সালে প্রায় ১৫ দশমিক ৯ শতাংশ ঘুষ লেনদেন বেশি হয়েছে। যার পরিমাণ ১ হাজার ৭২৯ কোটি ৯০ লাখ টাকা। প্রাক্কলিত মোট ঘুষের পরিমাণ ২০২৪-২৫ অর্থবছরে বাংলাদেশের জিডিপির ০.২৩ শতাংশ। জাতীয় বাজেটের (সংশোধিত) ১.৫৮ শতাংশ।

স্বাস্থ্য ও কৃষি সেবায় ঘুষ ৫ গুণ বৃদ্ধি : স্বাস্থ্যসেবায় টিকিট সংগ্রহ ও কৃষি খাতে সার প্রাপ্তির মতো সেবায় ঘুষের বা নিয়মবহির্ভূত অর্থের লেনদেনের হার দ্বিগুণ থেকে প্রায় পাঁচ গুণ পর্যন্ত বৃদ্ধি পেয়েছে। এসব সেবায় কম অঙ্কের কিন্তু উচ্চ-সংখ্যক ঘুষ লেনদেন ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। শিক্ষা খাতে দুর্নীতি বৃদ্ধির প্রধান কারণ নিয়মবহির্ভূত অর্থের লেনদেনের হারের উল্লেখযোগ্য বৃদ্ধি, যা প্রায় ১৫ শতাংশ থেকে ৩৫ শতাংশে পৌঁছেছে। এ খাতে সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত দুটি সেবা - মাসিক বেতন প্রদান এবং ভর্তি ফি পরিশোধ - উভয় ক্ষেত্রেই নিয়মবহির্ভূত অর্থের লেনদেনের ঘটনা ব্যাপকভাবে বেড়েছে। মাসিক বেতন প্রদানে নিয়মবহির্ভূত অর্থ আদায়ের হার প্রায় ৩ গুণ এবং ভর্তি ফি পরিশোধে প্রায় ৪.৫ গুণ বৃদ্ধি পাওয়ায় শিক্ষা খাতে সামগ্রিক দুর্নীতির হার দ্বিগুণ হয়েছে।

আর ঘুষের হার উল্লেখযোগ্যভাবে না বাড়লেও অন্যান্য অনিয়মের বৃদ্ধি এনজিও খাতে সামগ্রিক দুর্নীতি বাড়িয়েছে। বিশেষ করে দায়িত্বে অবহেলা ২২.৭ শতাংশ থেকে ৩৬.৫ শতাংশ এবং অসদাচরণ/দুব্যবহার ১৫.২ শতাংশ থেকে ২৩.২ শতাংশে উন্নীত হওয়ায় সার্বিক দুর্নীতির হার ৬.৫ শতাংশ থেকে ১৩.১ শতাংশে পৌঁছেছে।

প্রতি পরিবার বছরে ঘুষ দিচ্ছে আয়ের ১.৭ শতাংশ ঃ টিআইবির’ তথ্য বলছে, সামগ্রিকভাবে একটি পরিবার বছরে গড়ে তার মোট আয়ের ১.৭ শতাংশ ঘুষ বাবদ ব্যয় করেছে। তবে শীর্ষ পাঁচটি দুর্নীতিপ্রবণ খাতে এই হার দারিদ্র্যসীমার নিচে থাকা খানার জন্য ৫.১ শতাংশ। যেখানে দারিদ্র্যসীমার ওপরে থাকা পরিবারের জন্য ৩.২ শতাংশ। ১৩টি খানায় ঘুষের পরিমাণ তাদের বার্ষিক আয়ের থেকেও বেশি, যা কিছুক্ষেত্রে বার্ষিক আয়ের ৫-৬ গুণ পর্যন্ত। দারিদ্র্যসীমার নিচে থাকা পরিবারের জন্য পাসপোর্ট সেবা গ্রহণে মোট ব্যয় মাসিক আয়ের ৭৮ শতাংশ, যার মধ্যে ৩৭ শতাংশ শুধুঘুষ বাবদ ব্যয় হয়েছে। একইভাবে, আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর সেবা গ্রহণে দারিদ্র্যসীমার নিচে থাকা পরিবারগুলোকে গড়ে তাদের মাসিক আয়ের ৩৪ শতাংশ ঘুষ হিসেবে ব্যয় করতে হয়েছে। কিছুক্ষেত্রে এই ব্যয় সংশ্লিষ্ট পরিবারের মাসিক আয়ের সাড়ে চার গুণ পর্যন্ত ঘুষ দিতে।

২০২৫ এ ঘুষের পরিমাণ ১২ হাজার ৬৩৩ কোটি টাকা : টিআইবির নির্বাহী পরিচালক উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, কর্তৃত্ববাদী সরকার পতনের পর ছাত্র-জনতার বৈষম্যহীন, সুশাসিত, দুর্নীতিমুক্ত, সম-অধিকারভিত্তিক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক ‘নতুন বাংলাদেশ’ গড়ার প্রত্যাশার বিপরীত চিত্র লক্ষ করা যায়। ২০২৩-এর তুলনায় ২০২৫-এ জরিপের আওতাভুক্ত সেবাখাতে সার্বিকভাবে দুর্নীতি বেড়েছে। তিনি বলেন, একদিকে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থা ও বিচারসংশ্লিষ্ট সেবায় দুর্নীতি ও ঘুষের উচ্চ হার অব্যাহত রয়েছে। যা সাধারণ জনগণের ন্যায়বিচার প্রাপ্তির ক্ষেত্রে বড় বাধা; অন্যদিকে কৃষি, স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান, ভূমি, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, পাসপোর্ট এবং বিআরটিএ’র মতো জনগুরুত্বপূর্ণ খাতে উচ্চ দুর্নীতি ও ঘুষ বৃদ্ধি পেয়েছে বা একইরকম রয়েছে, যা মানুষের দৈনন্দিন জীবনে স্বাভাবিক সেবাপ্রাপ্তির অধিকারকে বাধাগ্রস্ত করছে।