উপকূলে সুপারফুড সিউইড বিপ্লবের হাতছানি
উপকূলে শৈবাল চাষে ব্যাপক কর্মসংস্থান, পুষ্টি নিরাপত্তা ও হাজার কোটি টাকার আগার আমদানি কমানোর আশা
Printed Edition
বাংলাদেশের ৭১০ কিলোমিটার দীর্ঘ উপকূলরেখা এত দিন মূলত মাছ, লবণ ও চিংড়ির জন্য পরিচিত ছিল। কিন্তু এখন এই উপকূলেই তৈরি হচ্ছে আরেকটি সম্ভাবনার গল্প- সামুদ্রিক শৈবাল বা সুপারফুড সিউইড (উচ্চ পুষ্টিমানসম্পন্ন খাদ্য)। বিশ্বের উন্নত দেশগুলো বহু বছর ধরেই খাদ্য, ওষুধ, প্রসাধনী, জৈবসার ও শিল্পের কাঁচামাল হিসেবে সিউইড ব্যবহার করছে। বাংলাদেশও এবার সেই পথে দৃশ্যমান অগ্রগতি অর্জন করেছে। এক দশকের গবেষণার ফল হিসেবে দেশে প্রথমবারের মতো দু’টি সামুদ্রিক শৈবালের জাত অবমুক্ত হয়েছে, উদ্ভাবিত হয়েছে উচ্চমূল্যের আগার (অমধৎ) উৎপাদন প্রযুক্তি। প্রশিক্ষণ পেয়েছেন প্রায় ৫০০ চাষি। কক্সবাজার উপকূলে প্রায় তিন হাজার চাষি এখন বাণিজ্যিকভাবে সিউইড চাষ করছেন। গবেষকদের মতে, সরকারি ও বেসরকারি বিনিয়োগ বাড়লে শুধু আগার আমদানিতেই বছরে প্রায় পাঁচ হাজার কোটি টাকা সাশ্রয় সম্ভব। একই সাথে সৃষ্টি হবে হাজার হাজার মানুষের কর্মসংস্থান এবং ব্লু-ইকোনমির নতুন দিগন্ত।
গত জুনে শেষ হয়েছে ‘উপকূলীয় এলাকায় সামুদ্রিক শৈবাল চাষ প্রযুক্তির যাচাই ও সম্প্রসারণ’ শীর্ষক প্রকল্পের কাজ। কৃষি গবেষণা ফাউন্ডেশনের (কেজিএফ) অর্থায়নে এটি বাস্তবায়িত হয়। প্রায় ৩৮ লাখ টাকায় প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করে বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা কাউন্সিলের (বিএআরসি) সমন্বয়ে এবং বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের (বারি) পরিচালনায়। এর আগে ২০১৬ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৫ সালের জুন পর্যন্ত আরেকটি প্রকল্প বাস্তবায়িত হয়। জানা যায়, চলতি জুলাই থেকে দুই বছর মেয়াদি আরেকটি প্রকল্প কেজিএফের টেকনিক্যাল কমিটিতে অনুমোদিত হয়েছে।
খাতসংশ্লিষ্ট গবেষক ও নীতিনির্ধারকরা বলছেন, বিশ্বের অন্যতম ঘনবসতিপূর্ণ দেশ বাংলাদেশে ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যার খাদ্য ও পুষ্টি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা ভবিষ্যতের বড় চ্যালেঞ্জ। সে কারণে প্রচলিত কৃষির পাশাপাশি নতুন খাদ্য ও পুষ্টির উৎস খুঁজে বের করার ওপর গুরুত্ব দিচ্ছেন কৃষি বিজ্ঞানীরা।
জানা যায়, দেশের ১৯টি উপকূলীয় জেলার ১৪৭টি উপজেলায় প্রায় তিন কোটি মানুষের বসবাস। তাদের বড় একটি অংশ প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে সামুদ্রিক সম্পদের ওপর নির্ভরশীল। প্রায় ৭১০ কিলোমিটার দীর্ঘ উপকূলরেখা, এক লাখ ৬৬ হাজার বর্গকিলোমিটার একান্ত অর্থনৈতিক অঞ্চল এবং প্রায় ৩৭ হাজার বর্গকিলোমিটার মহীসোপান অঞ্চল বাংলাদেশের জন্য এক বিশাল সামুদ্রিক সম্পদের ভাণ্ডার। বিজ্ঞানীদের মতে, এই বিশাল সমুদ্রসম্পদের অন্যতম সম্ভাবনাময় কিন্তু এখনো কম ব্যবহৃত সম্পদ হলো সামুদ্রিক শৈবাল।
প্রথম প্রকল্পটি শেষ ২০২৫ সালের ১ জুলাই থেকে ২০২৬ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত উপকূলীয় এলাকায় সামুদ্রিক শৈবাল চাষ প্রযুক্তির যাচাই ও সম্প্রসারণ প্রকল্পের মাধ্যমে গবেষণাকে মাঠপর্যায়ে সম্প্রসারণ করা হয়। কক্সবাজারের উন্মুক্ত সমুদ্র ও গবেষণাগারে পরিচালিত এই প্রকল্পে শৈবাল চাষ, বীজ উৎপাদন, প্রজাতি নির্বাচন এবং শিল্পোপযোগী প্রযুক্তি উদ্ভাবনের কাজ করা হয়েছে।
গবেষণায় দেখা গেছে, কক্সবাজারের নুনিয়ারছড়া সমুদ্রসৈকতে দীর্ঘ দড়ি বা লং-লাইন পদ্ধতিতে শৈবাল চাষ অত্যন্ত সফল হয়েছে। নির্দিষ্ট দূরত্বে দড়ির সাথে ছোট ছোট শৈবালের অংশ বেঁধে সমুদ্রে স্থাপন করা হয়। জোয়ার-ভাটার অনুকূল পরিবেশে মাত্র ১৫ থেকে ৩০ দিনের মধ্যেই তা সংগ্রহের উপযোগী হয়ে ওঠে। পরীক্ষায় প্রতি বর্গমিটারে প্রায় ১০ কেজি কাঁচা শৈবাল উৎপাদন সম্ভব হয়েছে; অর্থাৎ এক হেক্টর এলাকায় মাত্র ৩০ দিনে প্রায় ১০০ টন কাঁচা এবং প্রায় ১০ টন শুকনা শৈবাল উৎপাদনের সম্ভাবনা রয়েছে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এই চাষে রাসায়নিক সার, কীটনাশক কিংবা অতিরিক্ত পরিচর্যার প্রয়োজন হয় না। ফলে উৎপাদন ব্যয় খুবই কম, কিন্তু লাভের সম্ভাবনা অনেক বেশি।
প্রকল্প সংশ্লিষ্টরা জানান, গবেষণার আওতায় এ পর্যন্ত প্রায় ৫০০ চাষিকে প্রশিক্ষণ দেয়া হয়েছে। তাদের অনেকেই এখন নিজ উদ্যোগে শৈবাল চাষ করছেন। বর্তমানে কক্সবাজারের নুনিয়ারছড়াসহ আশপাশের এলাকায় প্রায় তিন হাজার খামারি অগভীর পানিতে রশি পদ্ধতি এবং অপেক্ষাকৃত গভীর সমুদ্রে ভাসমান পদ্ধতিতে শৈবাল চাষ করছেন। উৎপাদিত শৈবাল রোদে শুকিয়ে ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন বাজার, পাঁচতারকা হোটেল এবং কক্সবাজারের রেস্তোরাঁয় সরবরাহ করা হচ্ছে। সীমিত পরিসরে বিদেশেও রফতানি শুরু হয়েছে। বর্তমানে প্রতি কেজি কাঁচা শৈবাল ১০০ থেকে ১৫০ টাকায় বিক্রি হলেও শুকানোর পর এর দাম বেড়ে দাঁড়ায় ৬০০ থেকে ৮০০ টাকা। ফলে স্বল্প বিনিয়োগেই ভালো আয় করছেন উপকূলের খামারিরা।
সম্প্রতি সিউইড প্রকল্পের সমাপনী অনুষ্ঠানে কৃষি সচিব ড. রফিকুল ই মোহাম্মদ বলেন, শৈবাল থেকে উৎপাদিত আগার, ক্যারাজিনান ও সোডিয়াম অ্যালজিনেট বিশ্বের বিভিন্ন শিল্পের অত্যন্ত মূল্যবান কাঁচামাল। নিয়মিত সিউইড খেলে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি পায়, অপুষ্টি দূর হয় এবং মানুষের দৈনন্দিন খাদ্যতালিকায় এটি অন্তর্ভুক্ত করা প্রয়োজন।
সংশ্লিষ্টরা জানান, গবেষণার মাধ্যমে অর্থনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ ১২টি শৈবাল নির্বাচন করা হয়েছে। এর মধ্যে ৯টি প্রজাতির উপযোগিতা যাচাই শেষে জাতীয় বীজ বোর্ড দু’টি জাত অনুমোদন দিয়েছে। এগুলো হলো বারি সিউইড-১ (এৎধপরষধৎরধ ঃবহঁরংঃরঢ়রঃধঃধ) এবং বারি সিউইড-২ (টষাধ ষধপঃঁপধ)। প্রথমটি স্থানীয় জাত, যেখান থেকে উচ্চমূল্যের আগার উৎপাদন সম্ভব হয়েছে। দ্বিতীয়টি জাপান থেকে সংগৃহীত হলেও গবেষণার মাধ্যমে বাংলাদেশে বীজ উৎপাদন এবং সমুদ্রে চাষ উপযোগী করা হয়েছে।
বিএআরসির সদস্য পরিচালক (প্রাণিসম্পদ) ও প্রকল্পের প্রধান গবেষক ড. মোহাম্মদ রফিকুল ইসলাম বলেন, সিউইড প্রকৃত অর্থেই একটি সুপারফুড। এতে ভিটামিন, মিনারেল, আয়োডিন, অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট এবং নানা ধরনের মাইক্রোনিউট্রিয়েন্ট রয়েছে, যা মানুষের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায় এবং সুস্থ জীবন নিশ্চিত করতে সহায়তা করে। তিনি জানান, বাংলাদেশে প্রায় ২০০ প্রজাতির সামুদ্রিক শৈবাল থাকার তথ্য পাওয়া গেলেও এখন পর্যন্ত ১২টি প্রজাতি শনাক্ত করা হয়েছে। গবেষণার ধারাবাহিকতায় দু’টি জাত অবমুক্ত করা সম্ভব হয়েছে। চীন, জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়ার মানুষ নিয়মিত সিউইড খাওয়ায় এটি তাদের খাদ্যাভ্যাসের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠেছে। বাংলাদেশেও মানুষের মধ্যে সচেতনতা বাড়ানো গেলে এর ব্যবহার দ্রুত বাড়বে বলে তিনি মনে করেন।
ড. রফিকুল ইসলাম বলেন, শৈবাল থেকে উৎপাদিত সবচেয়ে মূল্যবান শিল্পপণ্য হলো আগার। এটি ব্যাকটেরিয়া কালচার, টিস্যু কালচার, আইসক্রিম, পুডিং, বেকারি, খাদ্যশিল্প, ওষুধশিল্প ও প্রসাধনী শিল্পে ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হয়। বাংলাদেশে প্রতি বছর প্রায় পাঁচ হাজার কোটি টাকার আগার আমদানি করা হয়; অথচ বারি সিউইড-১ থেকে ইতোমধ্যে আগার উৎপাদনের প্রযুক্তি উদ্ভাবন করা হয়েছে। ২০২৩ সালে বৈশ্বিক আগারের বাজারের আকার ছিল প্রায় ৩০৩ মিলিয়ন মার্কিন ডলার। দেশেই বৃহৎ পরিসরে আগার উৎপাদন শুরু হলে বিপুল বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয়ের পাশাপাশি নতুন শিল্পখাতের বিকাশ ঘটবে এবং দেশীয় উদ্যোক্তাদের জন্য নতুন বিনিয়োগের সুযোগ সৃষ্টি হবে।
কেজিএফ সূত্র জানায়, প্রকল্পের আওতায় কক্সবাজারের তারাবুনিয়ারছড়ায় আধুনিক সামুদ্রিক শৈবাল গবেষণাগার স্থাপন করা হয়েছে। সেখানে অত্যাধুনিক যন্ত্রপাতির মাধ্যমে নতুন নতুন গবেষণা চলছে। ইতোমধ্যে শৈবাল ব্যবহার করে ১০টির বেশি উন্নতমানের খাদ্য রেসিপি উদ্ভাবন করা হয়েছে, যা কক্সবাজারের বিভিন্ন রেস্তোরাঁ ও উদ্যোক্তারা ব্যবহার করছেন। পাশাপাশি শৈবাল থেকে তরল জৈব সার ও কম্পোস্ট সার তৈরির গবেষণাও এগিয়ে চলছে।
জানা যায়, বিশ্বের যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, চীন, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, ইন্দোনেশিয়া, ফিলিপাইন, মালয়েশিয়া ও ভারতসহ বহু দেশে বাণিজ্যিকভাবে শৈবাল চাষ হচ্ছে। শুধু ফিলিপাইনেই প্রায় ১০ লাখ মানুষ এ খাতের সাথে যুক্ত। বিশেষজ্ঞদের মতে, বাংলাদেশের উপকূলীয় পরিবেশ, অনুকূল জলবায়ু এবং কম উৎপাদন ব্যয়ের সুবিধা কাজে লাগিয়ে পরিকল্পিতভাবে এ খাতের সম্প্রসারণ করা গেলে সামুদ্রিক শৈবাল দেশের নীল অর্থনীতির অন্যতম চালিকাশক্তিতে পরিণত হতে পারে। এটি যেমন মানুষের খাদ্য ও পুষ্টি নিরাপত্তা জোরদার করবে, তেমনি উপকূলীয় অঞ্চলে টেকসই কর্মসংস্থান সৃষ্টি, নতুন শিল্পের বিকাশ, রফতানি আয় বৃদ্ধি এবং বছরে হাজার হাজার কোটি টাকার আগার আমদানি কমিয়ে বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয়ে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখতে সক্ষম হবে।