গাজা বিপর্যয় দেখিয়ে দিলো শক্তিনির্ভর বিশ্বব্যবস্থার ত্রুটি
আল জাজিরার মন্তব্য কলাম
Printed Edition
গাজায় চলমান মানবিক বিপর্যয় আবারো প্রমাণ করেছে যে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ পরবর্তী বিশ্বব্যবস্থা ন্যায়বিচার রক্ষা করার জন্য নয়, বরং শক্তিধর রাষ্ট্রগুলোকে সুবিধা দেয়ার জন্যই তৈরি হয়েছিল। ইসরাইলের দীর্ঘ দিনের হামলা থামাতে জাতিসঙ্ঘের অক্ষমতা দেখিয়েছে এই ব্যবস্থার মৌলিক ত্রুটি।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর একটি শান্তিপূর্ণ পৃথিবী গড়ার কথা বলা হয়েছিল। জাতিসঙ্ঘ সনদকে সেই ভিত্তি হিসেবে ধরা হয়েছিল। কিন্তু বিজয়ী রাষ্ট্রগুলোর স্বার্থই শেষ পর্যন্ত মুখ্য হয়ে ওঠে। নিরাপত্তা পরিষদকে দেয়া হয় একচ্ছত্র ক্ষমতা। পাঁচ স্থায়ী সদস্যকে দেয়া হয় ভেটো অধিকার। ফলে শক্তিধর দেশগুলো আইন ভঙ্গ করলেও দায়মুক্তি পায়।
এই কাঠামোতে তিনটি বিষয় স্পষ্ট- শক্তির প্রতি পক্ষপাত, সামরিক শক্তির ওপর আস্থা এবং যুদ্ধ-অস্ত্রনির্ভর অর্থনীতি। যার ফল আজও বিশ্ব দেখছে। গাজায় ইসরাইলের বর্বর হামলা থামাতে জাতিসঙ্ঘ কিছুই করতে পারেনি।
তবে সীমাবদ্ধতার মধ্যেও কিছু গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ ছিল। আন্তর্জাতিক আদালত গাজায় সম্ভাব্য গণহত্যা বিষয়ে দক্ষিণ আফ্রিকার আবেদন গ্রহণ করে। আদালত ইসরাইলের বিরুদ্ধে অন্তর্বর্তীকালীন ব্যবস্থা দেয়। পরে আরো একটি মতামতে আদালত ঘোষণা করে- গাজা, পশ্চিম তীর ও পূর্ব জেরুসালেমে ইসরাইল আন্তর্জাতিক আইন ভঙ্গ করছে। আদালত ইসরাইলকে এক বছরের মধ্যে দখল প্রত্যাহারের নির্দেশ দেয়।
সাধারণ পরিষদ এতে সমর্থন দেয়। কিন্তু ইসরাইল তা উপেক্ষা করে। যুক্তরাষ্ট্র আদালতের এখতিয়ারকে প্রশ্নবিদ্ধ করে। জাতিসঙ্ঘ মানবাধিকার পরিষদ গাজার বাস্তবতা তুলে ধরে। তারা স্পষ্টভাবে বলে যে ইসরাইল আন্তর্জাতিক মানবিক আইন লঙ্ঘন করছে। বিশেষ প্রতিনিধি ফ্রান্সেসকা আলবানেজের রিপোর্টগুলো গণহত্যার অভিযোগকে আরো শক্তিশালী করে।
আরো বড় ভূমিকা রাখে ইউএনআরডব্লিউএ। সঙ্ঘাতের মধ্যেও তারা গাজায় আশ্রয়, খাদ্য, স্বাস্থ্যসেবা ও শিক্ষা প্রদান চালিয়ে যায়। এ সময় সংস্থার ২৮১ জন কর্মী নিহত হয়। এরপরও তারা মানবিক কাজ থামায়নি। অথচ ইসরাইল সংস্থাটিকে ভুলভাবে অভিযুক্ত করে। অনেক পশ্চিমা দেশ তহবিল কেটে দেয়।
অক্টোবর ২০২৫-এ যুদ্ধবিরতির পরও ইসরাইলি হামলায় ৩৫০ এর বেশি ফিলিস্তিনি নিহত হয়। এটি প্রমাণ করে যে, আন্তর্জাতিক আইন শক্তিধর রাষ্ট্রগুলোকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারছে না। সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো নিরাপত্তা পরিষদের ২৮০৩ নম্বর প্রস্তাব। এই প্রস্তাব ট্রাম্প পরিকল্পনাকে সমর্থন করেছে। এতে গাজার ভবিষ্যৎ নির্ধারণ থেকে ফিলিস্তিনিদের বাদ দেয়া হয়েছে। এটি জাতিসঙ্ঘের নিরপেক্ষতা ও ন্যায়বিচার প্রক্রিয়ার সাথে সাংঘর্ষিক। গাজা সঙ্কট এখন এক বড় প্রশ্ন ছুড়ে দিয়েছে যে, এই বিশ্বব্যবস্থা কি সত্যিই ন্যায় ও শান্তির জন্য কার্যকর? বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বৈশ্বিক কাঠামোতে বড় ধরনের সংস্কার ছাড়া স্থায়ী ন্যায়বিচার সম্ভব নয়। আদালতের রায় ও প্রতিবেদনগুলো নাগরিক সমাজকে শক্তি দিচ্ছে। কিন্তু বাস্তব পরিবর্তনের জন্য প্রয়োজন নতুন এক বিশ্বব্যবস্থা, যেখানে শক্তির নয়, আইনের ও মানবতার প্রাধান্য থাকবে।