ট্রাইব্যুনালে সাবেক সেনাপ্রধান ইকবাল করিমের অবশিষ্ট সাক্ষ্য

ডিজিএফআইয়ের মিটিং রুমে কাজ করত ‘র’-এর এজেন্টরা

বাংলাদেশের প্রতিরক্ষা গোয়েন্দা মহাপরিদফতরের (ডিজিএফআই) কার্যালয়ে ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থা ‘র’য়ের (রিসার্চ অ্যান্ড অ্যানালাইসিস উইং) কর্মকর্তাদের জন্য বিশেষ কক্ষ বরাদ্দ ছিল এবং তারা নিয়মিত সেখানে যাতায়াত করতেন। ক্ষমতাচ্যুত সরকারের আমলে শতাধিক গুম ও খুনের অভিযোগে অভিযুক্ত মেজর জেনারেল (অব:) জিয়াউল আহসানের বিরুদ্ধে দায়েরকৃত মামলায় তিনি এই জবানবন্দী দেন।

নিজস্ব প্রতিবেদক
Printed Edition
Iqbal Karim Bhuiyan

  • ডিজিএফআই ও র‌্যাব বিলুপ্তির দাবি
  • হত্যার বিনিময়ে ১০ হাজার টাকা
  • লাশ গুমের বীভৎস পদ্ধতি

সাবেক আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে সংঘটিত গুম, খুন ও মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে দ্বিতীয় দিনের মতো চাঞ্চল্যকর সাক্ষ্য দিয়েছেন সাবেক সেনাপ্রধান জেনারেল (অব:) ইকবাল করিম ভূঁইয়া। তিনি দাবি করেছেন, বাংলাদেশের প্রতিরক্ষা গোয়েন্দা মহাপরিদফতরের (ডিজিএফআই) কার্যালয়ে ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থা ‘র’য়ের (রিসার্চ অ্যান্ড অ্যানালাইসিস উইং) কর্মকর্তাদের জন্য বিশেষ কক্ষ বরাদ্দ ছিল এবং তারা নিয়মিত সেখানে যাতায়াত করতেন। ক্ষমতাচ্যুত সরকারের আমলে শতাধিক গুম ও খুনের অভিযোগে অভিযুক্ত মেজর জেনারেল (অব:) জিয়াউল আহসানের বিরুদ্ধে দায়েরকৃত মামলায় তিনি এই জবানবন্দী দেন।

গতকাল সোমবার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১-এর চেয়ারম্যান বিচারপতি মো: গোলাম মর্তূজা মজুমদারের নেতৃত্বাধীন বিচারিক প্যানেলে তিনি তার সাক্ষ্যের বাকি অংশ তুলে ধরেন। এর আগে রোববার তার সাক্ষ্যগ্রহণ শুরু হয়। জবানবন্দীতে তিনি গোয়েন্দা সংস্থার গোপন তৎপরতা, বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড এবং তৎকালীন রাজনৈতিক চাপের বর্ণনা দেন।

ডিজিএফআই ও ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থার সম্পৃক্ততা : জেনারেল (অব:) ইকবাল করিম ভূঁইয়া তার জবানবন্দীতে বলেন, ‘আমি আমার দায়িত্ব পালনকালে জানতে পারি যে, মেজর জেনারেল তারিক আহম্মেদ সিদ্দীকির ছত্রছায়ায় ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থা ‘র’-এর কিছু ব্যক্তি নিয়মিত ডিজিএফআইয়ের অফিস ভিজিট করতেন। সেখানে থাকা সাতটি মিটিং রুমের একটিতে তাদের কাজ করতে দেয়া হতো। তারা বিভিন্ন সময়ে কিছু ব্যক্তিকে ‘জঙ্গী’ হিসেবে চিহ্নিত করে তালিকা ডিজিএফআইয়ের কাছে দিতেন। তবে সেই লিস্টের ওপর ডিজিএফআই কোনো কার্যকরী ব্যবস্থা নিয়েছে কি না, তা আমার জানা নেই।’

অফিসারদের বিপথগামী করা ও ক্রসফায়ার প্রসঙ্গ : ইকবাল করিম ভূঁইয়া তার সাক্ষ্যে দাবি করেন, তার কাছে থাকা বিভিন্ন গোয়েন্দা সূত্র এবং র‌্যাব কর্মকর্তাদের সাথে আলাপের মাধ্যমে তিনি জানতে পারেন যে সেনাবাহিনীর জুনিয়র অফিসারদের ভুল পথে পরিচালিত করা হচ্ছে। এর প্রমাণ হিসেবে তিনি তিনটি ঘটনার উল্লেখ করেন।

প্রথম ঘটনা : র‌্যাব থেকে ফিরে আসা এক কনিষ্ঠ অফিসারকে কতজন মানুষ হত্যার বিষয়ে প্রশ্ন করলে সে জানায়, সে ছয়জনকে হত্যা করেছে। এর মধ্যে দু’জনকে সরাসরি এবং চারজনের হত্যার সময় সে উপস্থিত ছিল। প্রতিটি হত্যার বিনিময়ে সে ১০ হাজার টাকা করে পায় এবং অপরাধবোধ থেকে সেই টাকাগুলো সে গ্রামের মসজিদে অনুদান হিসেবে দেয়।

দ্বিতীয় ঘটনা : একজন লেফটেন্যান্ট কর্নেল স্বীকার করেন যে তিনি ছয়জনকে হত্যা করেছেন। ঊর্ধ্বতন অফিসারের আদেশে তিনি এটি করেছেন জানালে আমি তাকে প্রশ্ন করি ‘আমি যদি আমার হাগু তোমাকে খেতে বলি খাবে কি না?’ সে না বললে আমি তাকে বলি ‘নিরস্ত্র বেসামরিক ব্যক্তিকে হত্যা করা এবং হাগু খাওয়ার মধ্যে কোনটা নিকৃষ্ট?’ সে উত্তর দেয় ‘নিরস্ত্র বেসামরিক ব্যক্তিকে হত্যা করা’। এরপর সে নিশ্চুপ হয়ে যায়।

তৃতীয় ঘটনা : একজন মেজর হোটেল রেডিসনের এক কর্মীকে ধর্ষণ ও হত্যার প্রতিশোধ হিসেবে আইন নিজের হাতে তুলে নিয়ে অভিযুক্তদের হত্যা করেন। পরবর্তীতে সেই অফিসার ফেসবুকে একটি পোস্ট দেন যেখানে দেখা যায় শাপলা চত্বরের হত্যাকাণ্ডের ধোঁয়াটে পটভূমিতে সে এবং কর্নেল জিয়া একে অপরের কাঁধে হাত রেখে দাঁড়িয়ে আছে।

লাশ গুমের নৃশংসতা ও প্রশাসনিক পদক্ষেপ : জবানবন্দীতে তিনি আরো বলেন, ‘আমি শুনেছি র‌্যাব যাদেরকে হত্যা করত তাদের পেট চিরে নাড়িভুঁড়ি বের করে ইট-পাথর বেঁধে নদীতে ডুবিয়ে দিত।’ এসব দেখে তিনি বিভিন্ন ডিভিশন ও প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠান ভিজিট করে অফিসারদের মোটিভেট করতে শুরু করেন। তিনি সব কমান্ডিং অফিসারদের ঢাকায় এনে সতর্ক করে বলেন যে, শেখ মুজিব এবং জিয়া হত্যার দায়ে অনেক অফিসারের ফাঁসি হয়েছে এবং দশ ট্রাক অস্ত্র মামলায়ও অফিসাররা সাজা খাটছে।

শেখ হাসিনা ও বেনজীর আহমেদের চাপ

ক্রসফায়ার বন্ধ না হওয়ায় একপর্যায়ে সাবেক সেনাপ্রধান ডিজিএফআই, বিজিবি এবং র‌্যাবে অফিসার পোস্টিং বন্ধ করে দেন। তিনি বলেন, ‘আমাকে অনেকে বলেছিলেন এটা বিদ্রোহের শামিল। আমার উত্তর ছিল হাশরের ময়দানে আমাকে আল্লাহর কাছে জবাব দিতে হবে।’ এই সিদ্ধান্তের কারণে তৎকালীন র‌্যাব ডিজি বেনজীর আহমেদ এবং পরবর্তীতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নিজে তাকে চট্টগ্রামে হোটেল রেডিসন উদ্বোধনের সময় ডেকে নিয়ে র‌্যাবে অফিসার দেয়ার নির্দেশ দেন। কিন্তু তিনি জনবল স্বল্পতার কারণ দেখিয়ে তা প্রত্যাখ্যান করেন এবং অবসরে যাওয়ার আগ পর্যন্ত নিজের সিদ্ধান্তে অটল থাকেন।

র‌্যাব ও ডিজিএফআই বিলুপ্তির দাবি

জবানবন্দীর শেষ অংশে তিনি বলেন, ‘সেনাবাহিনী কলুষিত হয়েছে এবং আমাদের আত্মশুদ্ধির এই সুযোগ হেলায় হারানো উচিত নয়। এতে সেনাবাহিনীর গৌরব ক্ষুণœ হবে না বরং বৃদ্ধি পাবে।’ অনেকেই ভাবছেন আমি সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছি। এ ব্যাপারে আমার ব্যাখ্যা হচ্ছে, আমরা যতই অস্বীকার করার চেষ্টা করি না কেন সেনাবাহিনী কলুষিত হয়েছে। আমাদের উচিত হবে না আমাদের আত্মশুদ্ধির যে সুযোগ এসেছে তা কোনো অবস্থাতেই হেলায় হারানো। এতে সেনাবাহিনীর গৌরব ক্ষুণœ হবে না বরং সেনাবাহিনী গৌরবের উচ্চশিখরে আসীন হবে। পুরো জাতি জানবে সেনাবাহিনী কখনো দোষী ব্যক্তিদেরকে ছাড় দেয় না। এতে সেনাবাহিনীর গৌরব এবং সম্মানের সাইনবোর্ডের আড়ালে অফিসারদের অপকর্ম করে পার পেয়ে যাওয়ার প্রবৃত্তি দূর হবে। তিনি দাবি করেন যে, র‌্যাব অবিলম্বে বিলুপ্ত করা দরকার অথবা এর সামরিক সদস্যদের ফিরিয়ে আনা উচিত। একই সাথে তিনি ডিজিএফআই বিলুপ্তির দাবি জানিয়ে বলেন, এই সংস্থাটি আয়নাঘরের মতো অপসংস্কৃতি জন্ম দেয়ার পরে আর টিকে থাকার বৈধতা হারিয়েছে।