গাজায় স্থায়ী সামরিক ঘাঁটি গড়ছে ইসরাইল
Printed Edition
নয়া দিগন্ত ডেস্ক
- সেনাবাহিনীর সহযোগিতায় পশ্চিমতীরে ফিলিস্তিনিদের জমি দখল
- ফিলিস্তিনি বন্দীদের কারাগার ঘিরে কুমির রাখার প্রস্তাব ইসরাইলি মন্ত্রীর
- গাজায় ওষুধের সঙ্কট চরমে
বহুমুখী গবেষণা প্রতিষ্ঠান ফরেনসিক আর্কিটেকচার জানিয়েছে, যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার পর ইসরাইল গাজায় অন্তত ১৩টি নতুন সামরিক ঘাঁটি স্থাপন করেছে এবং বিদ্যমান ৪৮টি ঘাঁটির সম্প্রসারণ দ্রুততর করেছে। এ খবর জানিয়েছে তাসনিম নিউজ এজেন্সি। গতকাল প্রকাশিত ফরেনসিক আর্কিটেকচারের রিপোর্টে বলা হয়েছে, ইসরাইলি বাহিনী শুধু অস্থায়ী অবস্থান ধরে রাখছে না, বরং গাজাকে দীর্ঘমেয়াদি নিয়ন্ত্রণের উপযোগী করে পুনর্গঠন করছে। ১০ অক্টোবর থেকে ২ ডিসেম্বর পর্যন্ত স্যাটেলাইট চিত্র বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ইসরাইল যুদ্ধবিরতির অধীনে নির্ধারিত আংশিক প্রত্যাহার সীমারেখা বা ‘ইয়েলো লাইন’-এর পূর্বে ঘন সামরিক অবকাঠামো বজায় রেখেছে। গবেষকরা জানিয়েছেন, ইসরাইল এখন গাজার অর্ধেকের বেশি এলাকা নিয়ন্ত্রণ করছে এবং নির্মাণ ও ধ্বংসলীলার মাধ্যমে সেই নিয়ন্ত্রণ আরো বাড়াচ্ছে।
ফরেনসিক আর্কিটেকচার জানিয়েছে, ইসরাইল গাজার ভেতরের সামরিক ঘাঁটিগুলোকে ইসরাইলি ঘাঁটি, সড়ক ও অবৈধ বসতির সাথে যুক্ত করতে নতুন সড়ক নেটওয়ার্ক তৈরি করেছে। এতে গাজা ও দখলকৃত ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডের মধ্যে লজিস্টিক সংযোগ আরো শক্তিশালী হয়েছে। দক্ষিণ গাজার খান ইউনুসে নতুন সড়ক নির্মাণের প্রমাণ পাওয়া গেছে, যা ইসরাইলের মাগেন ওজ সামরিক করিডরকে পুরোপুরি তাদের নিয়ন্ত্রিত এলাকায় সরিয়ে নিয়েছে। এই সম্প্রসারণের সাথে ফিলিস্তিনি সম্পত্তি ধ্বংসও চলছে। বিশেষ করে পূর্ব খান ইউনিস ও দক্ষিণ গাজার রাফাহ এলাকায় বহু ভবন যুদ্ধবিরতির পর ধ্বংস করা হয়েছে। উত্তর গাজার জাবালিয়ায় নতুন ইসরাইলি ঘাঁটি স্থাপন করা হয়েছে, যেখানে তাঁবু এলাকা ভেঙে দেয়া হয়েছে এবং আশপাশের ভবন ধ্বংস করা হয়েছে।
স্যাটেলাইট চিত্রে দেখা গেছে, ‘ইয়েলো লাইন’-এর পূর্বে নতুন সড়ক, বড় সামরিক বাঁধ ও উঁচু স্থানে নতুন স্থাপনা তৈরি হয়েছে, যা বাস্তুচ্যুত ফিলিস্তিনিদের এলাকা পর্যবেক্ষণ করছে। জাতিসঙ্ঘের সাবেক কর্মকর্তা মঈন রাব্বানি বলেছেন, এই পদক্ষেপ ইসরাইলের দীর্ঘ দিনের কৌশলের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ। তিনি বলেন, আন্তর্জাতিক চাপ কমে গেলে এসব পদক্ষেপ স্থায়ী হয়ে যায়। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের তথাকথিত ২০ দফা গাজা পরিকল্পনায় ইসরাইলকে ‘ইয়েলো লাইন’-এ সরে যাওয়ার কথা ছিল। কিন্তু ফরেনসিক আর্কিটেকচার জানিয়েছে, যুদ্ধবিরতির পর ইসরাইল অন্তত ২৭টি নতুন চিহ্ন বসিয়েছে, যা তাদের নিজস্ব মানচিত্রে ‘ইয়েলো লাইন’-এর পশ্চিমে অবস্থিত।
গণহত্যার নতুন মাত্রা : বোমায় নয়, শীতে ফিলিস্তিনি শিশুদের মৃত্যু
বোমা হামলা কিছুটা কমলেও ফিলিস্তিনি শিশুদের মৃত্যু থামেনি। এবার তারা মারা যাচ্ছে ইসরাইলি বিমান হামলায় নয়, বরং শীতে জমে গিয়ে এবং ক্ষতিগ্রস্ত ভবন ধসে পড়ে। ইসরাইল যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘন করে শিশুদের জন্য জরুরি সেবা ও আশ্রয় প্রবেশে বাধা দিয়েছে। সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে ভারী বৃষ্টি গাজার তাবু শিবির প্লাবিত করেছে। অস্থায়ী আশ্রয় ভেসে গেছে এবং ক্ষতিগ্রস্ত ভবন ধসে পরিবার চাপা পড়েছে। পর্যাপ্ত আশ্রয় পাওয়া যাচ্ছে না, কারণ ইসরাইল রাফাহ সীমান্ত দিয়ে তা প্রবেশে বাধা দিয়েছে। ঝড়ে অন্তত ১৬ জন ফিলিস্তিনি, যাদের মধ্যে শিশু রয়েছে, মারা গেছে। অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল এটিকে ‘সম্পূর্ণ প্রতিরোধযোগ্য বিপর্যয়’ বলেছে।
দুই মাসের বেশি সময় ধরে যুদ্ধবিরতি মানা হয়নি। ইসরাইল ইতোমধ্যে এক হাজার ৪০০-এর বেশি ফিলিস্তিনিকে হত্যা ও আহত করেছে। পানি ও পয়োনিষ্কাশন ব্যবস্থা মেরামতের জন্য জরুরি সরবরাহও আটকে দিয়েছে। ইউএনআরডব্লিউএ জানিয়েছে, তাদের কাছে ১৩ লাখ মানুষের জন্য আশ্রয়সামগ্রী প্রস্তুত আছে; কিন্তু গাজায় ঢুকতে দেয়া হয়নি। বারবার বাস্তুচ্যুতি, অন্তত ৯২ শতাংশ স্থাপনা ধ্বংস বা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া এবং গাজার ৫৮ শতাংশ এলাকা প্রবেশ নিষিদ্ধ ঘোষণার পর অধিকাংশ ফিলিস্তিনি এখন ভাঙা তাঁবু বা ঝুলন্ত কংক্রিটের নিচে আশ্রয় নিচ্ছে। ইসরাইল প্রথমে খাদ্যকে অস্ত্র বানিয়েছিল, এখন প্রকৃতিকেও যুদ্ধের অস্ত্র বানিয়েছে। অ্যামনেস্টির তদন্তে দেখা গেছে, জাবালিয়া, আল রিমাল, শেখ রাদওয়ান ও আল শাতি শরণার্থী ক্যাম্পে ভবন ধসে পরিবার চাপা পড়েছে। মোহাম্মদ নাসর তার দুই সন্তান লিনা ও গাজিকে হারিয়েছেন। তারা দুবার বিমান হামলা থেকে পালিয়ে ক্ষতিগ্রস্ত বাড়িতে ফিরেছিলেন। কিন্তু ঝড়ে বাড়ি ধসে পড়ে তাদের মৃত্যু হয়। তিনি বলেন, সন্তানরা বোমা হামলা থেকে বেঁচেছিল, কিন্তু ঝড়ে মারা গেল। ইউএনআরডব্লিউএ এক মাস আগে সতর্ক করেছিল, শীত আসছে, আশ্রয়সামগ্রী জরুরি। কিন্তু সেই সতর্কবার্তা উপেক্ষা করা হয়েছে।
সেনাবাহিনীর সহযোগিতায় পশ্চিমতীরে ফিলিস্তিনিদের জমি দখল
মিডল ইস্ট মনিটর জানিয়েছে, ইসরাইলি বসতি পর্যবেক্ষক সংগঠন পিস নাউ পশ্চিমতীরে ফিলিস্তিনিদের ওপর বসতি স্থাপনকারীদের হামলায় সেনাবাহিনীর সহযোগিতার অভিযোগ তুলেছে। তারা ইসরাইলি সেনার সেন্ট্রাল কমান্ড প্রধান মেজর জেনারেল আভি ব্লুথকে বরখাস্ত করার দাবি জানিয়েছে। পিস নাউ এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, ব্লুথ আসলে ‘হিলটপ ইয়ুথ’ নামের বসতি স্থাপনকারী গোষ্ঠীর প্রতিনিধি হিসেবে কাজ করছেন। এই গোষ্ঠী ফিলিস্তিনি বেসামরিকদের ওপর হামলা এবং জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুত করে তাদের জমি দখল করে অবৈধ বসতি স্থাপনের জন্য দায়ী।
পিস নাউ-এর মহাপরিচালক লিওর আমিখাই বলেন, ব্লুথ বসতি স্থাপনকারীদের সাথে সহযোগিতা করছেন। তিনি ইসরাইলি সেনাপ্রধান এয়াল জামিরকে অবিলম্বে ব্লুথকে বরখাস্ত করার আহ্বান জানান। এই দাবি আসে ইসরাইলি পাবলিক ব্রডকাস্টার কান ১১-এর ‘জমান এমেত’ অনুষ্ঠানে সম্প্রচারিত এক অনুসন্ধানী খবরের পর। খবরে পশ্চিমতীরে নতুন হিলটপ বসতি স্থাপনের বিষয়টি খতিয়ে দেখা হয়। তদন্তে প্রমাণ পাওয়া গেছে যে ব্লুথ বসতি স্থাপনকারীদের সাথে সমন্বয় ও সহযোগিতা করেছেন। একই নৃশংসতা চলছে পশ্চিমতীরেও। গাজা ডুবে থাকলেও পশ্চিমতীরে শরণার্থী ক্যাম্পে বুলডোজার চলছে, ইহুদি দাঙ্গাবাজরা বাড়ি ও জলপাই বাগান পুড়িয়ে দিচ্ছে। নুর শামস ক্যাম্পে ইসরাইলি সেনারা আরো ২৫টি বাড়ি ভাঙার নির্দেশ দিয়েছে। ফিলিস্তিনি নেতারা সতর্ক করেছেন, শত শত মানুষ আবার বাস্তুচ্যুত হবে। পশ্চিমতীরে বাড়ি ভাঙা ও নতুন ইহুদি বসতি অনুমোদন একসাথে চলছে। ফিলিস্তিনিদের জমি ১৯৪৮ সালে দখল করা হয়েছিল। এখন তাদের কোথাও যাওয়ার জায়গা নেই। ইসরাইল অবশিষ্ট জমিও ইহুদিদের জন্য দখল করছে এবং অ-ইহুদিদের নির্মাণ অনুমতি দিচ্ছে না।
ফিলিস্তিনি বন্দীদের কারাগার ঘিরে কুমির রাখার প্রস্তাব ইসরাইলি মন্ত্রীর
ফিলিস্তিনি বন্দীদের রাখার জন্য একটি ‘কুমির-ঘেরা কারাগার’ তৈরির প্রস্তাব দিয়েছেন ইসরাইলের অতি ডানপন্থী জাতীয় নিরাপত্তামন্ত্রী ইতামার বেন গভির। দেশটির সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে, জেলপালানো রোধে ইসরাইল প্রিজন সার্ভিস প্রস্তাবটি পর্যালোচনা করছে। তবে এটিকে অস্বাভাবিক প্রস্তাব বলেও আখ্যা দেয়া হয়েছে।
পশ্চিমতীরে আরো ১৯টি অবৈধ বসতির অনুমোদন
ইসরাইলের নিরাপত্তা মন্ত্রিসভা পশ্চিমতীরে নতুন করে ১৯টি অবৈধ বসতি স্থাপনের অনুমোদন দিয়েছে। গত তিন বছরে অনুমোদিত বসতির সংখ্যা দাঁড়াল ৬৯। ইসরাইলি অর্থমন্ত্রী বেজালেল স্মোটরিচ ও প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইসরাইল কাটজের প্রস্তাব মন্ত্রিসভা অনুমোদন করেছে। স্মোটরিচ বলেন, ‘আমরা মাটিতে ফিলিস্তিনি সন্ত্রাসী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা ঠেকাচ্ছি। আমরা আমাদের পূর্বপুরুষদের ভূমিতে উন্নয়ন, নির্মাণ ও বসতি স্থাপন অব্যাহত রাখব।’
এর আগে স্মোটরিচ পূর্ব জেরুসালেমে তিন হাজার ৬০০ আবাসিক ইউনিট নিয়ে নতুন অবৈধ ইহুদি বসতি স্থাপনের পরিকল্পনা অনুমোদন করেন। চ্যানেল ৭ জানিয়েছে, ‘মিশমার ইয়েহুদা’ নামের এই বসতি শহরের পূর্বাংশে তিন হাজার ৩৮০ দুনাম জমিতে গড়ে তোলা হবে। স্মোটরিচ জানান, এই বসতি পূর্ব দিক থেকে জেরুসালেম রক্ষার কৌশলগত ঘাঁটি হিসেবে কাজ করবে। তার ভাষায়, এই ‘ঐতিহাসিক’ পরিকল্পনা ইসরাইলি সার্বভৌমত্বকে দৃঢ় করবে এবং পশ্চিমতীরে ফিলিস্তিনি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা ঠেকাবে। ইসরাইলি বামপন্থী সংগঠন পিস নাউ জানিয়েছে, বর্তমানে পশ্চিমতীরে প্রায় পাঁচ লাখ অবৈধ ইসরাইলি বসতি স্থাপনকারী রয়েছে। পূর্ব জেরুসালেমে আরো দুই লাখ ৫০ হাজার বসতি স্থাপনকারী বসবাস করছে।
গাজায় ওষুধ সঙ্কট চরমে
গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, উপত্যকার হাসপাতালগুলোতে ওষুধ ও চিকিৎসা সরঞ্জামের ভয়াবহ সঙ্কট দেখা দিয়েছে। মজুদ ওষুধ ৫২ শতাংশ এবং চিকিৎসা সরঞ্জাম ৭১ শতাংশ কমে গেছে।
আল শিফা হাসপাতালে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, দুই বছরের যুদ্ধ ও অবরোধের কারণে স্বাস্থ্য ব্যবস্থা ‘অভূতপূর্ব ও বিপজ্জনক ক্লান্তির অবস্থায়’ পৌঁছেছে। ৩২১ ধরনের জরুরি ওষুধের মজুদ শেষ হয়ে গেছে। জরুরি ও নিবিড় পরিচর্যা সেবায় ৩৮ শতাংশ ঘাটতি দেখা দিয়েছে। এতে প্রায় দুই লাখ রোগী জরুরি সেবা, এক লাখ রোগী অস্ত্রোপচার এবং ৭০০ রোগী নিবিড় পরিচর্যা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। কিডনি চিকিৎসার সরঞ্জাম না থাকায় ৬৫০ জন ডায়ালাইসিস রোগী চিকিৎসা পাচ্ছেন না। ক্যান্সার চিকিৎসায় ৭০ শতাংশ ওষুধের ঘাটতির কারণে কয়েকজন মারা গেছেন এবং প্রায় এক হাজার রোগী চিকিৎসা পাচ্ছেন না।
প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবার ৬২ শতাংশ ওষুধ নেই। এতে দুই লাখ ৮৮ হাজার রোগীর চিকিৎসা ব্যাহত হচ্ছে। কার্ডিয়াক ক্যাথেটারাইজেশন ও ওপেন হার্ট সার্জারি সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে গেছে। হাড় জোড়া লাগানোর যন্ত্র না থাকায় ৯৯ শতাংশ অর্থোপেডিক সার্জারি স্থগিত হয়েছে। চোখের বিশেষায়িত সার্জারিও বন্ধ হওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে। প্রয়োজনীয় ল্যাব পরীক্ষার ৫৯ শতাংশ বন্ধ হয়ে গেছে।