আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিকেই দুষলেন সংশ্লিষ্টরা

সূচক পতনেই সপ্তাহ শুরু পুঁজিবাজারের

Printed Edition
artho-1
আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিকেই দুষলেন সংশ্লিষ্টরা

অর্থনৈতিক প্রতিবেদক

সূচক হারানোর মধ্য দিয়েই নতুন সপ্তাহ শুরু করল পুঁজিবাজার। গতকাল রোববার সপ্তাহের প্রথম কার্যদিবসে দেশের দুই পুঁজিবাজারই সব সূচক হারায়। ভালো বাজার আচরণের প্রত্যাশার মধ্যে দিনের শুরুটা কিছুটা ভালো হলেও পরবর্তীতে যে বিক্রয়চাপের মুখে পড়ে বাজারগুলো তা দিনের বাকি সময় আর সামলে উঠতে পারেনি। এতে হ্রাস পায় বাজারের লেনদেনও। পুঁজিবাজার সংশ্লিষ্টরা নেতিবাচক বাজার আচরণের জন্য এবার দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিকে দায়ী করলেন।

দেশের প্রধান পুঁজিবাজার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) প্রধান সূচক ডিএসইএক্স গতকাল ৩০ দশমিক ৮৬ পয়েন্ট অবনতির শিকার হয়। চার হাজার ৯৬৩ দশমিক ৮৩ পয়েন্ট থেকে দিন শুরু করা সূচকটি গতকাল দিনশেষে নেমে আসে চার হাজার ৯৩২ দশমিক ৯৬ পয়েন্টে। দিনের শুরুতে ডিএসই সূচকের উন্নতি রেকর্ড করা হয় ১৮ পয়েন্ট। সূচকের এ অবস্থান থেকেই বিক্রয়চাপের শুরু। প্রথমদিকে শুরু হওয়া এ চাপ সামলে নিলেও দিনের বাকি সময় চাপের মাত্রা ক্রমেই বাড়তে থাকে। এতে সূচকের পতনেই লেনদেন শেষ করে ডিএসই। একই সময় বাজারটির দুই বিশেষায়িত সূচক ডিএসই-৩০ ও ডিএসই শরিয়াহ হারায় যথাক্রমে ১১ দশমিক ৮১ ও ৬ দশমিক ৪৫ পয়েন্ট। দেশের দ্বিতীয় পুঁজিবাজার চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জে (সিএসই) প্রধান সূচক সিএএসপিআই এদিন ২৭ দশমিক ২১ পয়েন্ট হারায়। বাজারটির দুই বিশেষায়িত সূচক সিএসই-৩০ ও সিএসসিএক্স সূচকের অবনতি ঘটে যথাক্রমে ৫৬ দশমিক ৭৭ ও ২৬ দশমিক ৪১ পয়েন্ট।

পুঁজিবাজার সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বৃহস্পতিবার নির্বাচন কমিশন জাতীয় সংসদ নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করলে দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে কিছুটা আশাবাদ তৈরি হয়েছিল। বিনিয়োগকারীরাও সামনের দিনগুলোর বাজার আচরণ নিয়ে ভালো কিছু প্রত্যাশায় ছিলেন। কিন্তু শুক্রবার দুপুরে ঘটল রাজধানী ঢাকার প্রাণকেন্দ্রে জাতীয় সংসদের সম্ভাব্য এক প্রার্থীকে হত্যাপ্রচেষ্টা। দেশের আর্থিক খাতের এমন করুণ অবস্থার মধ্যে পুঁজিবাজারের মতো একটি সংবেদনশীল খাতকে এ ঘটনাগুলো অনেক বেশি প্রভাবিত করে। তাই গতকাল দিনের শুরুটা ভালো হলেও শেষদিকে এসে বিক্রয়চাপের মাত্রা বৃদ্ধি পায়।

দিনের বাজার আচরণ বিশ্লেষণে দেখা যায় ব্যাংক, বীমা, টেলিকমিউনিকেশন, আর্থিক প্রতিষ্ঠান, সিরামিকস, পেপার, তথ্যপ্রযুক্তির মতো খাতগুলোতে গতকাল প্রায় শতভাগ কোম্পানিই দরপতনের শিকার ছিল। কিছুটা ভালো অবস্থানে ছিল মিউচুয়াল ফান্ড ও টেক্সটাইল খাত। এ দুই খাতে কয়েকটি করে কোম্পানির মূল্যবৃদ্ধি ঘটতে দেখা যায়। আর কিছু খাতে মূল্যবৃদ্ধির তাািলকায় ছিল হাতেগোনা কয়েকটি কোম্পানি। তবে ব্যাংক, টেলিকমিউনিকেশন, আর্থিক প্রতিষ্ঠান ও বীমা খাতই সূচকের পতনের জন্য বেশি দায়ী। কারণ এ খাতগুলোই মূলধনসমৃদ্ধ যা বরাবরই সূচককে বেশি প্রভাবিত করে। গতকাল এ খাতগুলোতে প্রায় শতভাগ কোম্পানিই দর হারায় যা সূচককে নি¤œগামী করে। এদিন ডিএসইর লেনদেনের চিত্র দেখলেই তা স্পষ্ট হয়ে ওঠে। বাজারটিতে মোট লেনদেন হওয়া ৩৯১টি কোম্পানি ও মিউচুয়াল ফান্ডের মধ্যে ২৪৯টিই দরপতনের শিকার হয়। মূল্যবৃদ্ধির তালিকায় ছিল মাত্র ৭৯টি কোম্পানি ও ফান্ড। আর দর অপরিবর্তিত ছিল ৬৩টির।

গতকাল মতিঝিলে অবস্থিত বিভিন্ন ব্রোকার হাউজ ও মার্চেন্ট ব্যাংকের ট্রেডিং ফ্লোরে লেনদেনে অংশ নেয়া বিনিয়োগকারীদের সাথে বাজার পরিস্থিতি নিয়ে কথা বললে তারা নয়া দিগন্তকে জানান, বাজার নিয়ে এখনো তারা আশাবাদী। শুক্রবারের দুঃখজনক ঘটনার কথা উল্লেখ করে বিনিয়োগকারীরা বলেন, এটা হতে পারে একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা। সরকার নিশ্চয়ই আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির দিকে নজর রাখছে। অপরাধীও শনাক্ত হয়েছে। এখন তাকে গ্রেফতার করে শাস্তির আওতায় নিয়ে আসতে পারলে সাধারণ মানুষের মধ্যে স্বস্তি ফিরে আসতে পারে। আর তাতে বাজারও প্রাণ ফিরে পাবে।

গতকাল ঢাকা শেয়ারবাজারে লেনদেনের শীর্ষে উঠে আসে ওষুধ ও রসায়ন খাতের প্রতিষ্ঠান ওরিয়ন ইনফিউশন। ১৪ কোটি ৭৪ লাখ টাকায় কোম্পানিটির তিন লাখ ৯৪ হাজার শেয়ার হাতবদল হয় গতকাল। ১২ কোটি ৬৪ লাখ টাকায় ১৭ লাখ ৬১ হাজার শেয়ার বেচাকেনা করে দিনের দ্বিতীয় কোম্পানি ছিল লাভেলো আইসক্রিম। ডিএসইর লেনদেনের শীর্ষ ১০ কোম্পানির অন্যগুলো ছিল যথাক্রমে মুন্নু ফ্যাব্রিক্স, এশিয়াটিক ল্যাবরেটরিজ, ফাইন ফুডস, ডমিনেজ স্টিলস, একমি পেস্টিসাইডস, সিমটেক্স ইন্ডাস্ট্রিজ, রহিমা ফুড করপোরেশন ও খান ব্রাদার্স পিপি ওভেন ব্যাগ।

ডিএসইর দিনের মূল্যবৃদ্ধির শীর্ষে উঠে আসে প্রাইম ফিন্যান্স ফার্স্ট মিউচুয়াল ফান্ড। গতকাল ১০ শতাংশ মূল্যবৃদ্ধি ঘটে এ ফান্ডটির। ৯ দশমিক ৯৫ শতাংশ মূল্যবৃদ্ধি ঘটে এ তালিকায় দ্বিতীয় স্থানে উঠে আসে খাদ্য খাতের বঙ্গজ লিমিটেড। মূল্যবৃদ্ধিতে ডিএসইর শীর্ষ দশে উঠে আসা অন্যান্য কোম্পানি ও ফান্ডের মধ্যে ছিল যথাক্রমে রিলায়ান্স ওয়ান ফার্স্ট মিউচুয়াল ফান্ড, এপেক্স ট্যানারি, দেশ গার্মেন্টস, সিএপিএম আইবিবিএল মিউচুয়াল ফান্ড, জিকিউ বলপেন, বিডি অটোকারস, ডিবিএইচ ফার্স্ট মিউচুয়াল ফান্ড ও রহিমা ফুড করপোরেশন।

ডিএসইর দরপতনের শীর্ষে ছিল খাদ্য খাতের রাষ্ট্রায়ত্ত কোম্পানি ঝিল বাংলা সুগার মিলস। গতকাল ৯ দশমিক ৫৬ শতাংশ দর হারায় কোম্পানিটি। ৯ দশমিক ৮৭ শতাংশ দর হারিয়ে আর্থিক প্রতিষ্ঠান খাতের এফএএস ফিন্যান্স ছিল দ্বিতীয় অবস্থানে। ডিএসইর দরপতনের শীর্ষ ১০ কোম্পানির মধ্যে অন্যগুলো ছিল উসমানিয়া গ্লাস শিট ফ্যাক্টরি, নর্দার্ন জুট, শ্যামপুর সুগার মিলস, মেঘনা কনডেন্সড মিল্ক, রেনউইক যজ্ঞেশ^র, প্রিমিয়ার লিজিং অ্যান্ড ফিন্যান্স, ফার ইস্ট ফিন্যান্স ও ফিনিক্স ফিন্যান্স।