বিদায়ী ভাষণে বিচারপতি আশফাকুল ইসলাম

বিচারকের পদ থেকে অবসর নেয়া যায়, কিন্তু ন্যায়বিচারের আদর্শ থেকে নয়

Printed Edition

নিজস্ব প্রতিবেদক

বিচারকের পদ থেকে অবসর নিলেও ন্যায়বিচারের আদর্শ, সংবিধানের প্রতি আনুগত্য এবং আইনের শাসনের প্রতি বিশ্বাস আজীবন অটুট থাকবে বলে জানিয়েছেন আপিল বিভাগের বিচারপতি মো: আশফাকুল ইসলাম। একই সাথে তিনি বিচার বিভাগের স্বাধীনতা, জনগণের আস্থা, বার-বেঞ্চের পারস্পরিক সহযোগিতা এবং প্রযুক্তিনির্ভর আধুনিক বিচারব্যবস্থা গড়ে তোলার ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন। গতকাল মঙ্গলবার আপিল বিভাগের এজলাস কক্ষে তার শেষ কর্মদিবসে বিদায়ী বক্তব্যে তিনি এ কথা বলেন। এ উপলক্ষে অ্যাটর্নি জেনারেল কার্যালয় ও সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির পক্ষ থেকে বিচারপতি মো: আশফাকুল ইসলামকে বিদায় সংবর্ধনা দেয়া হয়। অনুষ্ঠানে অ্যাটর্নি জেনারেল ব্যারিস্টার মো: রুহুল কুদ্দুস কাজল ও সুপ্রিম কোর্ট বার অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি ব্যারিস্টার মাহবুব উদ্দিন খোকন বক্তব্য রাখেন। এ সময় প্রধান বিচারপতি, আপিল বিভাগের বিচারপতিরা, আইনজীবী ও বিচার বিভাগের সংশ্লিষ্টরা উপস্থিত ছিলেন।

দুই দশকেরও বেশি সময় বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টে বিচারক হিসেবে দায়িত্ব পালনের পর অবসরে যাওয়ার প্রেক্ষাপটে বিচারপতি আশফাকুল ইসলাম বলেন, তিনি এটিকে শুধু বিচারিক জীবনের সমাপ্তি হিসেবে দেখছেন না; বরং আইনাঙ্গনে চার দশকেরও বেশি সময়ের পথচলার একটি অধ্যায়ের সমাপ্তি হিসেবে দেখছেন।

তিনি মহান আল্লাহর প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশের পাশাপাশি মহান মুক্তিযুদ্ধের সব বীর শহীদকে গভীর শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করেন। একই সাথে ২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থানের শহীদ ও আহত সংগ্রামীদেরও স্মরণ করে বলেন, তাদের অবদান জাতীয় ইতিহাসের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে থাকবে এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্ম তাদের শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করবে।

তিনি তার বাবা, প্রাক্তন উপ-রাষ্ট্রপতি বিচারপতি এ কে এম নূরুল ইসলাম এবং সদ্যপ্রয়াত মা, একুশে পদকপ্রাপ্ত কবি জাহানারা আরজুকে শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করেন।

আইনজীবী জীবন স্মরণ করে তিনি বলেন, যেসব প্রবীণ ও জ্যেষ্ঠ আইনজীবীর কাছ থেকে শেখার সুযোগ পেয়েছেন, তাদের প্রজ্ঞা, পেশাগত সততা ও আইনের প্রতি নিষ্ঠাই তার পেশাগত জীবনের ভিত গড়ে দিয়েছে। একইভাবে বিচারক হিসেবে দায়িত্ব পালনের সময় জ্যেষ্ঠ ও কনিষ্ঠ সহকর্মীদের কাছ থেকেও তিনি অনেক কিছু শিখেছেন বলে উল্লেখ করেন। প্রধান বিচারপতি, আপিল বিভাগের সহকর্মী বিচারপতি, অ্যাটর্নি জেনারেল, সুপ্রিম কোর্ট বার অ্যাসোসিয়েশন এবং আদালতের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের প্রতিও তিনি কৃতজ্ঞতা জানান।

বিচার বিভাগের ভবিষ্যৎ নিয়ে নিজের প্রত্যাশা তুলে ধরে বিচারপতি আশফাকুল ইসলাম বলেন, বিচার বিভাগ শুধু বিচারকদের নয়, শুধু আইনজীবীদেরও নয় এটি সবার প্রতিষ্ঠান। বিচারক, আইনজীবী এবং কর্মকর্তা-কর্মচারী সবাই যদি প্রতিষ্ঠানটিকে নিজের বলে মনে করেন, তাহলে বিচার বিভাগের মর্যাদা, স্বাধীনতা এবং জনগণের আস্থা আরো সুদৃঢ় হবে। ভবিষ্যতেও বিচার বিভাগের কল্যাণে বার ও বেঞ্চ একসাথে কাজ করবে বলেও তিনি আশা প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, বিচার বিভাগের সামনে মামলার জট কমানো, বিচারকে আরো দ্রুত ও কার্যকর করা এবং মানুষের ক্রমবর্ধমান প্রত্যাশা পূরণের মতো বড় চ্যালেঞ্জ রয়েছে। এসব মোকাবেলায় বিচার বিভাগকে আরো দক্ষ, আধুনিক ও সেবামুখী হতে হবে।

নবীন আইনজীবীদের উদ্দেশে বিচারপতি আশফাকুল ইসলাম বলেন, একজন আইনজ্ঞের সবচেয়ে বড় সম্পদ সততা, এরপর চরিত্র এবং তারপর অধ্যয়ন। তিনি নিয়মিত সংবিধান, আইন, দেশী-বিদেশী রায় ও বিচারতত্ত্ব অধ্যয়নের আহ্বান জানিয়ে বলেন, শেখার কোনো শেষ নেই। বই না পেলেও তথ্যপ্রযুক্তির মাধ্যমে পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়ার পরামর্শ দেন তিনি।

তিনি বলেন, ‘আমি আজ বিদায় নিচ্ছি বিচারকের আসন থেকে, কিন্তু ন্যায়ের আদর্শ থেকে নয়। সংবিধানের প্রতি আমার আনুগত্য, আইনের শাসনের প্রতি আমার বিশ্বাস এবং এই মহান প্রজাতন্ত্রের প্রতি আমার অঙ্গীকার আজীবন অক্ষুণœ থাকবে।’ কর্মজীবনে তার কোনো আচরণ বা সিদ্ধান্তে কেউ অনিচ্ছাকৃতভাবে কষ্ট পেয়ে থাকলে তা ক্ষমাসুন্দর দৃষ্টিতে দেখারও অনুরোধ জানান তিনি।

বিদায়ী সংবর্ধনায় অ্যাটর্নি জেনারেল ব্যারিস্টার মো: রুহুল কুদ্দুস কাজল বিচারপতি আশফাকুল ইসলামের দীর্ঘ আইনজীবী ও বিচারিক জীবনের বিভিন্ন দিক তুলে ধরেন। তিনি বলেন, ১৯৫৯ সালের ১৫ জুলাই ওয়ারীর ঐতিহ্যবাহী ‘কবিতাঙ্গন’-এ জন্ম নেয়া বিচারপতি আশফাকুল ইসলাম প্রাক্তন উপ-রাষ্ট্রপতি বিচারপতি এ কে এম নূরুল ইসলাম এবং একুশে পদকপ্রাপ্ত কবি জাহানারা আরজুর সন্তান। সাহিত্য-সংস্কৃতিমনস্ক পারিবারিক পরিবেশ তার ব্যক্তিত্ব ও জীবনদর্শন গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।