জাতীয় কবির পাশে শায়িত বিপ্লবী হাদি

জানাজা জনসমুদ্রে পরিণত

Printed Edition
first 1
জাতীয় সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজা ও মানিক মিয়া এভিনিউ এলাকায় শরিফ ওসমান হাদির নামাজে জানাজা রূপ নেয় জনসমুদ্রে : আবদুল্লাহ আল বাপ্পী

নিজস্ব প্রতিবেদক

জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের পাশে শায়িত হলেন জুলাই বীর শহীদ মো: শরিফ ওসমান হাদি। গতকাল শনিবার সংসদ প্লাজায় লাখ লাখ মানুষের উপস্থিতিতে স্মরণকালের বৃহত্তম নামাজে জানাজা শেষে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় মসজিদ সংলগ্ন কবি কাজী নজরুল ইসলামের কবরের পাশে দাফন করা হয় ওসমান হাদিকে। মানিক মিয়া এভিনিউয়ের পুরো এক বর্গকিলোমিটার জায়গা জুড়ে তিল ধারণের ঠাঁই ছিল না। নিকট অতীতে এত বড় সমাবেশ মানিক মিয়া এভিনিউসহ সংসদ প্লাজায় ঘটেনি বলে জানাজা শেষে উপস্থিত জনতার অনেকেই দাবি করেন। মানুষের মুখে মুখে ছিল ওসমান হাদির যুক্তিসহকারে টিভি টকশোর বিভিন্ন বিষয়। তার যুক্তির কাছে প্রতিপক্ষ হার মানতে বাধ্য হয়েছে বলে জনতা আলোচনা করছিলেন। মানিক মিয়া এভিনিউয়ে শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের জানাজার পর এত বড় জানাজা আর হয়নি বলে উপস্থিত বয়স্করা বলেছেন।

মানিক মিয়া এভিনিউও সংসদ প্লাজা গতকাল রূপ নেয় জনতার সমুদ্রে। জানাজার পূর্বে যে তিনজন বক্তৃতা করেন তাদের বক্তব্যে যেমন ছিল আবেগ, তেমনি উপস্থিত জনতার চোখেও ছিল নীরব অশ্রু। চোখের কোণে জমে থাকা অশ্রু আর দোয়ার সাথে সাথে আমিন আমিন শব্দে বাতাস আরো ভারী হয়ে ওঠে। পরিবেশ ছিল হৃদয়স্পর্শী। শরিফ ওসমান হাদির নামাজে জানাজায় উপস্থিত জনতার মুখে মুখে ফুটে উঠেছিল ভালোবাসা, শ্রদ্ধা ও হারানোর বেদনা। সংসদ ভবনের ইট-পাথরের মাঝখানে অনুষ্ঠিত নামাজে জানাজা যেন সময়কে থামিয়ে দিয়েছিল, স্মৃতিকে করে তুলেছিল চিরস্থায়ী। যতদিন বাংলাদেশ থাকবে শরিফ ওসমান হাদির স্মৃতি মানুষের হৃদয়ে জমে থাকবে নিশ্চিত।

গতকাল ওই এলাকায় জনতা উপস্থিত হওয়ার আগেই নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যরা চার দিকে অবস্থান নেয়। সেনাবাহিনীর বিশেষ ইউনিটের সদস্যরা মানিকমিয়া এভিনিউয়ের দক্ষিণে সংসদ সদস্যদের জন্য সংরক্ষিত ভবনে নিচতলা থেকে ছাদ পর্যন্ত অবস্থান নেয়। আর্চওয়ে মেটাল ডিটেক্টরের ভেতর দিয়ে জনতাকে সংসদ প্লাজায় প্রবেশ করতে দেয়া হয়।

বেলা ১২টার আগেই মানিকমিয়া এভিনিউয়ে যান চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। নামাজে জানাজা পড়তে আসা জনতা রাস্তার দুই পাশে দাঁড়িয়ে পড়েছিলেন।

এ দিকে ওসমান হাদির খুনিদের ধরতে না পারায় জনতা ক্ষোভে ফেটে পড়েন। প্রধান উপদেষ্টার বক্তব্যের মধ্যেও জনতা খুনিদের ধরার দাবিতে মুহুর্মুহু সেøাগান দেন। নামাজে জানাজা পড়ান ওসমান হাদির বড় ভাই ড. মাওলানা আবু বকর সিদ্দিক। নামাজে জানাজা শেষে বিশেষ ব্যবস্থায় এই বীর যোদ্ধার লাশ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে নিয়ে যাওয়া হয়। সাড়ে ৩টার দিকে তাকে দাফন করা হয়। সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজায় বেলা ২টা ২০ মিনিটের দিকে শুরু হওয়া নামাজে জানাজার আগে বক্তব্য রাখেন প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস, ওসমান হাদির বড় ভাই ড. মাওলানা আবু বকর সিদ্দিক ও ইনকিলাব মঞ্চের সদস্যসচিব আব্দুল্লাহ আল জাবের। উপস্থিত ছিলেন বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের শীর্ষ নেতারা।

বক্তব্যে আব্দুল্লাহ আল জাবের শহীদ ওসমান হাদির খুনি বিষয়ে কী পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে, তা জনগণের সামনে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে তুলে ধরতে না পারলে স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী ও প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী খোদা বকশ চৌধুরীকে পদত্যাগ করতে প্রস্তুত থাকতে বলা হয়। উপস্থিত জনতা গলা ফাটিয়ে চিৎকার করে ‘ঠিক’ বলে সমর্থন জানায়।

প্রধান উপদেষ্টা ওসমান হাদির লাশকে সামনে রেখে বলেন, ‘প্রিয় হাদি, আমরা তোমাকে ভুলব না, কেউ তোমাকে ভুলবে না। আজ তোমাকে আমরা বিদায় দিতে আসিনি। তুমি যে ‘চির উন্নত মম শির’ সেøাগান দিতে সেইটাকে ধারণ করতে আমরা এখানে এসেছি। চির উন্নত মম শিরের সেøাগান আমাদের সব কাজে আমরা প্রমাণ করব। আমরা দুনিয়ার সামনে মাথা উঁচু করে চলব। কারো কাছে আমরা মাথা নত করব না, সেই তুমি আমাদের দিয়ে গেছো, আমরা সেটা পূরণ করে যাবো।

তিনি বলেন, তুমি যে মন্ত্র রেখে গেছো, সেটাকে ধারণ করে আমরা স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব অক্ষুণœœ রাখার লড়াই চালিয়ে যাবো। তোমার দেখানো পথে সবাই আগামীর বাংলাদেশকে এগিয়ে নেবে। কেউ তোমাকে ভুলবে না, তোমার মন্ত্র বয়ে নিয়ে যাবো। প্রধান উপদেষ্টা আরো বলেন, কিভাবে নির্বাচন করতে হয়, কিভাবে প্রচারণা চালিয়ে নিতে হয় তা তুমি দেখিয়ে গেছো। মানুষকে কষ্ট না দিয়ে তার নির্বাচনী বক্তব্য কিভাবে প্রকাশ করতে হয় কিভাবে বিনীতভাবে কথা বলতে হয়, তা তুমি আমাদের দেখিয়ে গিয়েছ। আমরা এ শিক্ষা গ্রহণ করলাম। তিনি বলেন, হাদি তুমি হারিয়ে যাবে না। আমরা তোমাকে ভুলতে পারব না, যুগ যুগ ধরে তুমি আমাদের মাঝে থাকবে। ‘বল বীর চির উন্নত মম শির’ বলে আমরা স্মরণ করব। তিনি বক্তব্য শেষ করার আগে ‘বিচার চাই, বিচার চাই’ বলে উপস্থিত জনতা গগণ বিদারী আওয়াজ তুলে বিচার চাইতে থাকেন।

নামাজে জানাজার আগে ওসমান হাদির বড় ভাই মাওলানা আবু বকর সিদ্দিক গুলি করার চার থেকে পাঁচ ঘণ্টার মধ্যে খুনি কিভাবে পালিয়ে গেল (দেশ ছেড়ে) সেই প্রশ্ন করেন। তিনি আরো বলেন, সাত থেকে আট দিন (প্রকৃতপক্ষে গতকাল শনিবার ৯ দিন) হয়ে গেলো কেন হত্যাকারীদের ধরা সম্ভব হলো না সেই প্রশ্ন করেন তিনি। তার ভাইয়ের হত্যার বিচার যেন দ্রুত করা হয় সেই দাবিও জানান তিনি। তিনি বলেন, আমার ভাইদের মধ্যে সবচেয়ে ছোট ছিল ওসমান হাদি। সেই ছোট ভাইটির লাশ আজকে আমাকে বহন করতে হচ্ছে।’ তিনি বলেন, ওসমান হাদির আট মাসের সন্তানটি তার বাবার চেহারা মনে করতে পারবে না। এ কথা বলে তিনি আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন। ড. আবু বকর বলেন, আমাদের চাওয়া-পাওয়ার কিছু নেই। আমরা খুনিদের বিচার চাই।

গতকাল বেলা ১টার মধ্যেই সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজাসহ মানিক মিয়া এভিনিউয়ের পুরো রাস্তা পূর্ণ হয়ে যায়। বাসে, প্রাইভেট কারে ও মেট্রোরেল ভরে মানুষ আসে নামাজে জানাজায় অংশ নিতে। পরে যারা এসেছেন তারা ভিড়ের মধ্যে ফাঁক-ফোকড় গলিয়ে ভেতরে ঢুকে যান। মানিক মিয়া এভিনিউ ধরে সংসদ প্লাজার কাছাকাছি ঢুকতে একজনের আধা ঘণ্টার বেশি লাগে, এত মানুষের ঠাসাঠাসির মধ্যে সামনে এগোনো যাচ্ছিল না। সবাই নামাজে জানাজায় অংশগ্রহণ করতেও পারেননি। কারণ ওসমান হাদির লাশ যেখানে রাখা হয়েছে তার পশ্চিম পাশেও মানুষ গিয়ে দাঁড়িয়েছেন। উপস্থিত জনতা কোথাও সংসদ প্লাজা অথবা মানিক মিয়া এভিনিউয়ে স্থান না পেয়ে পশ্চিম পাশের ফায়ার সার্ভিস সড়কে দাঁড়িয়ে যান। পূর্ব দিকে ফার্মগেট এলাকাও ভরে যায়। উপস্থিত জনতা মুহুর্মুহু ‘নারায়ে তাকবির-আল্লাহু আকবর’ বলে গগণবিদারী স্লোগান দিতে থাকেন। তাদের মুখে আরো স্লোগান ছিল, ‘দিল্লি না, ঢাকা, ঢাকা ঢাকা’, ‘গোলামী না আজাদী, আজাদী, আজাদী, ইনকিলাব ইনকিলাব, জিন্দাবাদ জিন্দাবাদ’ যারা বেলা ১টার আগে সেখানে উপস্থিত ছিলেন তারা মানিক মিয়া এভিনিউয়ের মূল রাস্তায়, ফুটপাথে, সংসদ প্লাজার সবুজ ঘাসে বোতলের পানি দিয়ে ওজু করে জোহরের নামাজ আদায় করে নেন।

শহীদ শরিফ ওসমান হাদির নামাজে জানাজায় আরো উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলনের আমির মাওলানা হাবিবুল্লাহ মিয়াজী, নায়েবে আমির মাওলানা মুজিবুর রহমান হামিদী, সাংগঠনিক সম্পাদক মাওলানা সুলতান মহিউদ্দিন ও কেন্দ্রীয় নেতা মুফতি আ ফ ম আকরাম হোসাইন প্রমুখ।

খেলাফত মাজলিসের সিনিয়র নায়েবে আমির মাওলানা সাখাওয়াত হোসাইন, নায়েবে আমির মাওলানা আহমাদ আলী কাসেমী, যুগ্ম মহাসচিব অধ্যাপক মো: আবদুল জলিলসহ কেন্দ্রীয় মহানগরী উত্তর ও দক্ষিণের নেতাকর্মীরা শরিক ছিলেন।

ওসমান হাদির পুরো নাম মো: শরিফ ওসমান বিন হাদি, তিনি ১৯৯৩ সালে ঝালকাঠির নলছিটিতে ৩০ নভেম্বর জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতার নাম মাওলানা আব্দুল হাদি। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের ছাত্র ছিলেন। পেশা ছিল শিক্ষক এবং তিনি রাজনীতির পাশাপাশি লেখালেখি করতেন। পিতা-মাতা, ভাইবোন ও স্ত্রীসহ আট মাসের একটি পুত্র সন্তান রয়েছে। গত ১২ ডিসেম্বর জুমার নামাজের পর ঢাকা- ৮ আসনে নির্বাচনী প্রচার শেষে তার অফিসে ফেরার পথে বিজয়নগর সড়কে ঘাতকের গুলিতে গুরুতর আহত হলে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয় তাকে। সেখান থেকে তাকে উন্নতমানের আইসিইউ সাপোর্টের জন্য রাজধানীর বসুন্ধরার এভারকেয়ার হাসপাতালে নেয়া হয়। পরে ১৫ ডিসেম্বর তাকে সিঙ্গাপুর নিয়ে সেখানকার জেনারেল হাসপাতালে ভর্তি করানো হয়। কিন্তু ১৮ ডিসেম্বর তিনি বাংলাদেশের মানুষকে কাঁদিয়ে চির বিদায় নেন।