ঢাকা-১১ আসনে নির্বাচনী জনসভায় ডা: শফিক
জনগণ সুযোগ দিলে আবু সাঈদ-হাদির আকাক্সক্ষার বাংলাদেশ গড়ে তুলবো
Printed Edition
নিজস্ব প্রতিবেদক
সারা বাংলাদেশ জেগে উঠেছে উল্লেখ করে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা: শফিকুর রহমান বলেছেন, তরুণ যুবকরা তাদের দৃষ্টিভঙ্গি জানিয়ে দিয়েছে। পুরনো বন্দোবস্তের সাথে তারা নেই। বস্তাপচা রাজনীতি আর ফিরিয়ে আনতে চায় না। নতুন বাংলাদেশ আমরা দেখতে চাই। তিনি আরো বলেন, বাংলাদেশের নতুন রাজনীতি উত্থান আমরা দেখতে চাই। জনগণ আগামী ১২ তারিখ সেই রায় দেবে। জনগণ দুর্নীতিবাজ, চাঁদাবাজ, দখলদার ও আধিপত্যবাদের গোলামদের লাল কার্ড দেখাবে।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন উপলক্ষে গতকাল সকালে রাজধানীর মেরুল বাড্ডার ডিআইটি মাঠে ঢাকা-১১ আসনে ১১ দলীয় নির্বাচনী ঐক্যের জনসভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এ কথা বলেন। এ আসনে জাতীয় নাগরিক পার্টির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন।
জামায়াত আমির বলেন- আবরার ফাহাদ, আবু সাঈদ, হাদি- আমরা তোমাদের কাছে এবং তোমাদের বন্ধুদের কাছে বড়ই ঋণী। আমরা কথা দিচ্ছি তোমাদের আকাক্সক্ষার নতুন বাংলাদেশ হলে, এ দেশ এবং জনগণের সেবা করার সুযোগ পেলে তোমরা যেমনটা চেয়েছিলে আমরা সে অনুসারেই যোগ্য এবং দীপ্ত বাংলাদেশ গড়ে তুলবো, ইনশা আল্লাহ।
তিনি আরো বলেন, এই বাংলাদেশ আমরা যুবকদের হাতে তুলে দিতে চাই। আমরা যুবকদের হাতে বাংলাদেশের দায়িত্ব দিতে চাই। আমরা বেকার ভাতা দিতে চাই না। ২৪-এর যুবকেরা কোথাও বেকার ভাতা চায় নাই, বেকার ভাতার জন্য সেøাগানও দেয়নি। সে দিন যুবকেরা বলেছিল আমাদের ন্যায্য অধিকার ফিরিয়ে দাও, আমাদের কাজ দাও। বেকার ভাতার কথাই হচ্ছে যুবসমাজকে অপমান করা। জামায়াত আমির যুবকদেরকে জিজ্ঞেস করেন, হে যুবকেরা! আপনারা বেকার ভাতা চান? না কাজ চান? সবাই হাত তুলে বললেন বেকার ভাতা চাই না, আমরা কাজ চাই। জামায়াত আমির বলেন, যেমন দশ টাকা চালের কেজি ছিল ভুয়া, তেমনি এই কার্ডগুলো হবে ভুয়া। এ রকম ভুয়া কার্ড প্রদানকারীদের আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি জনগণ লাল কার্ড দেখাবে।
ডা: শফিকুর রহমান বলেন, ৭১ দেখেছি আর ২৪ আমরা পেয়েছি। ৪৭-এ যে আকাক্সক্ষা ছিল হুবহু ৭১ সালেও সেই আকাক্সক্ষা ছিল। ২৪-এ সেই আকাক্সক্ষার বিস্ফোরণ ঘটেছিল। ৪৭-এর পরে ২৩ বছরে আকাক্সক্ষা পূরণ হয়নি। ৭১ পরে ৫২ বছরে সেই আকাক্সক্ষা পূরণ হয়নি। এখন ৫৪ বছর অতিক্রম হয়ে গেছে। চব্বিশে আমাদের যুবক ও ছাত্রসমাজ বিশাল কোনো দাবি নিয়ে আসেনি। তাদের একটি ন্যায্য ও সাধারণ দাবি নিয়ে রাস্তায় নেমেছিল। সেটা হলো কোটা সংস্কারের আন্দোলন। কিন্তু অতীতের মতো ফ্যাসিবাদী কায়দায় যুব ও ছাত্র সমাজকে দমানোর চেষ্টা করেছিল।
তিনি বলেন, আপনাদের স্মরণ থাকার কথা- ১৫ জুলাই রাতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মেয়েদের গায়ে যখন হাত তুলেছিল সারা বাংলাদেশের মানুষ তখন জ্বলে উঠেছিল। তার পরের দিন ১৬ তারিখ উত্তরবঙ্গের এক সিংহ পুরুষ-আমাদের গর্ব, অহঙ্কার বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের এক মেধাবী ছাত্র আবু সাঈদ রাস্তায় নেমে বলেছিল হয় আমার অধিকার দে না হয় আমাকে গুলি দে। সে ডানা পেতে বলেছিল, ‘বুকের ভিতর অনেক ঝড়, বুক পেতেছি গুলি কর’। রাস্তায় বীরের মতো দাঁড়িয়েছিল। এক এক করে তিনটি গুলি করে খুন করা হয়েছে তাকে। একটা গুলিও সে পিঠে নেয়নি, তিনটি গুলিই সে বুকে নিয়েছিল। আমরা তার প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানাই। একই দিনে তাদের আরো পাঁচজন সহকর্মী শাহাদতবরণ করেন।
জামায়াত আমির বলেন, আপসোস! আমরা যারা সাড়ে ১৫ বছর আওয়ামী জাহেলিয়াতের যাঁতাকলে পিষ্ঠ ছিলাম। বিভিন্ন রাজনৈতিক দল, আলেম-ওলামা, সাংবাদিক বন্ধুরা, সুশীল সমাজের সদস্য, কৃষক-শ্রমিক যারাই ছিলাম এর মধ্যে একটা অংশ এই মজলুম অবস্থার পরিবর্তন করে রাতারাতি জালেমের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছে। যে সব অপকর্ম করে আওয়ামী লীগ দীর্ঘসময় এই জাতিকে কষ্ট দিয়েছে। একই অপকর্ম একটা অংশ করা শুরু করে দিলো। আমরা বিনয়ের সাথে অনুরোধ করলাম মজলুম ছিলেন জালিম হবেন না। মজলুমের কথা, তো বোঝার কথা এখন মানুষকে কষ্ট দিচ্ছেন কেন? আমরা লক্ষ্য করলাম বেপারোয়াভাবে চাঁদাবাজি, দখলবাজি, মামলাবাজি শুরু হয়ে গেলো। এখনও অনেক বড় বড় ব্যবসায়ী বলেন, আমরা যাবো কোথায়? আমাদেরকে জিম্মি করে আমাদের বিরুদ্ধে মার্ডার মামলা দিয়ে আমাদের কাছ থেকে শত শত কোটি টাকা দাবি করা হচ্ছে। দাবি করছে কারা জানেন? এই সাড়ে ১৫ বছর যারা বাংলাদেশ ছেড়ে পালিয়ে অন্য দেশের মাটিতে নিরাপদ আশ্রয় গ্রহণ করেছিলেন, ফিরে এসে তারাই মামলাবাণিজ্য করে চাঁদা দাবি করছেন।
তিনি আরো বলেন, আগস্টের ৬ তারিখ থেকে শুরু করে ২০২৬ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত তাদের জ্বালায় অতিষ্ঠ সাধারণ মানুষ। ব্যবসায়ী থেকে শুরু করে ফুটপাথে বসে যে ভিক্ষুক ভিক্ষা করে তার কাছ থেকে চাঁদা আদায় করছে। আমাদের সন্তানদেরকে বুকে নিয়ে জুলাই মাসে এই জন্য কি লড়াই করেছিলাম? প্রশ্ন রাখেন ডা: শফিকুর রহমান।
জামায়াত আমির আরও বলেন, আমাদের সন্তানদের দাবি ছিল ‘উই ওয়ান জাস্টিস’। আমরা ন্যায়বিচার দেখতে চাই এবং শান্তিতে থাকতে চাই। আপনারা দেখেছেন একটি দল, তারা মাঝেমধ্যে বলে তারা ক্ষমতায় গেলে দুর্নীতির টুঁটি চেপে ধরবে। এটা ভালো কথা। এই ভালো কাজটা নিজের ঘর থেকে শুরু করেন। ঋণখেলাপি, ব্যাংক ডাকাতদের আশ্রয় দিয়ে আপনারা দুর্নীতিমুক্ত দেশ গড়বেন, এটা আদৌ সম্ভব না। জনগণ এটা বুঝে।
তিনি আরও বলেন, ৫ আগস্ট যে আকাক্সক্ষা নিয়ে আমাদের সন্তানরা, ভাইয়েরা ও বোনেরা, শিশু-বৃদ্ধ-আবাল-বনিতা রক্ত দিয়েছিল। ওই রক্তের ঋণ পরিশোধ করার দিন ১২ ফেব্রুয়ারি। এই রক্তের সাথে যারা বেঈমানি করে, ইতিহাস তাদেরকে ক্ষমা করবে না। এ দেশের জনগণের আকাক্সক্ষার বাংলাদেশ মহান আল্লাহর ইচ্ছায় গড়ে উঠবে। সেই বাংলাদেশে অপকর্ম চলতে দেয়া হবে না। বিচার একেকজনের জন্য একেক রকম হবে না। সাধারণ মানুষ অপরাধ করলে ওই নির্দিষ্ট অপরাধের জন্য তার যে শাস্তি হবে দেশের প্রেসিডেন্ট, প্রধানমন্ত্রী অপরাধ করলে তাদেরকেও ছাড় দিয়ে কথা বলবো না। একইভাবে তাদেরকেও বিচারের আওতায় আনা হবে। সে দিনই ন্যায়বিচার কায়েম হবে ইনশা আল্লাহ।
ডা: শফিকুর রহমান বলেন, নাহিদ আপনাদের এলাকার সন্তান। আমি মায়ের কাছে মাসির কথা বলতে চাই না। আমার চাইতে নাহিদকে আপনারা ভালো চিনেন। কিন্তু এটা বলতে চাই, ইনসাফের বাংলাদেশের পক্ষে জনগণের রায়, আল্লাহর মেহেরবানীতে যদি অর্জিত হয়- তা হলে সেই সরকারের অবশ্যই নাহিদ ইসলামকে আপনারা একজন মন্ত্রী হিসেবে দেখতে পাবেন। আমরা হাতে হাত ধরে এক সাথে কাজ করবো। আসুন, একটা বেইনসাফমুক্ত, জুলুমবাজমুক্ত, চাঁদাবাজমুক্ত, দখলবাজমুক্ত, মামলাবাজমুক্ত, আধিপত্যবাদমুক্ত ন্যায় ইনসাফের মানবিক বাংলাদেশ গড়তে আমরা হাতে হাত ও কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে সামনের দিকে এগিয়ে যাই।