২ হাজার টাকার জন্য মা-মেয়েকে হত্যা

Printed Edition

নিজস্ব প্রতিবেদক

  • পোড়া দাগের সূত্র ধরে গ্রেফতার
  • আয়েশা ৫ দিন রাব্বী ৩ দিনের রিমান্ডে

কাজে যোগ দেয়ার দ্বিতীয় দিনেই দুই হাজার টাকা চুরি করে আয়েশা। বিষয়টি ধরা পড়ে গেলে তাকে শাস্তি দেয়া হতে পারে তাই বাসা থেকে সুইচ গিয়ার চাকু নিয়ে বের হয়। যথারীতি বাসায় গেলেই গৃহকর্ত্রী টাকার ব্যাপারে জানতে চান। এই নিয়ে তাদের তর্কাতর্কি হলে গৃহকর্ত্রী লায়লা আফরোজ তার স্বামীকে ফোন করার চেষ্টা করেন। আর তখনই চাকু বের করে তার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে আয়েশা। মায়ের চিৎকারে মেয়ে নাফিসা ছুটে এলে তাকেও ছুরিকাঘাত করে হত্যা করা হয়।

গতকাল বৃহস্পতিবার ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ ডিএমপির মিডিয়া সেন্টারে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এমন তথ্য জানান জয়েন্ট কমিশনার (ক্রাইম অ্যান্ড অপারেশন) নজরুল ইসলাম। এ সময় উপস্থিত ছিলেন তেজগাঁও জোনের ডিসি ইবনে মিজান ও ডিসি (মিডিয়া) মুহাম্মদ তালেবুর রহমান। এ দিকে আরো বিস্তারিত তথ্যের জন্য আয়েশাকে ৫ দিনের ও তার স্বামী রাব্বীকে ৩ দিনের রিমান্ডে নিয়েছে পুলিশ।

নজরুল ইসলাম বলেন, গত সোমবার রাজধানীর মোহাম্মদপুরের শাহজাহান রোডের একটি বাসায় গৃহকর্মী কর্তৃক লায়লা আফরোজ (৪৮) ও তার মেয়ে নাফিসা (১৫) নৃসংশভাবে খুনের ঘটনায় জড়িত ঘাতক গৃহকর্মী আয়েশা আক্তার (২০) ও তার স্বামী জামাল সিকদার রাব্বীকে গ্রেফতার করেছে ডিএমপির মোহাম্মদপুর থানা পুলিশ।

পোড়া দাগের সূত্র ধরে গ্রেফতার করা হয় আয়েশাকে। হত্যার সময় কোনো ক্লুই রেখে যায়নি চতুর আয়েশা। সিসি ক্যামেরায় তার আকৃতি থাকলেও চেহারা থাকতো সব সময় ঢাকা। আয়েশা নাম ছাড়া, ছিল না কোনো পরিচয় বা আত্মীয়-স্বজনের নাম ঠিকানা। এমনকি বাড়ি বা বাসা কোথায় তাও জানা ছিল না কারো। তার পরও পুলিশের কৌশলের কাছে বেশি দিন আড়ালে থাকতে পারেনি ঘাতক। আয়েশা ঘটনার তিন দিন আগে ওই বাসায় গৃহকর্মীর কাজ নেয়। কাজে যোগ দেয়ার আগে তার নাম, ঠিকানা ও যোগাযোগের কোনো ফোন নম্বর ওই বাসায় কারো কাছে ছিল না। সন্দেহভাজন আয়েশাকে শনাক্ত করার জন্য পুলিশ ওই ভবনের আশপাশের সিসিটিভি ফুটেজ সংগ্রহ ও বিশ্লেষণ করে। কিন্তু কাজে আসা-যাওয়ার সময় সে মুখ ঢেকে রাখতো বিধায় তার চেহারা শনাক্ত করা সম্ভব হয়নি। এমনকি তার বাসার ঠিকানাও কেউ জানতো না।

গলায় পোড়া দাগের মেয়েটি মোহাম্মদপুরের কোন এলাকার বাসায় থাকে তা জানতে কাজ শুরু করে থানার একাধিক টিম। এ ছাড়া গত এক বছরে মোহাম্মদপুর থানায় গৃহকর্মী চুরির ঘটনাসমূহ পর্যালোচনা শুরু করে। এক পর্যায়ে পুলিশ জানতে পারে গলায় পোড়া দাগ রয়েছে এমন একটি মেয়ে মোহাম্মদপুর জেনেভা ক্যাম্পে বসবাস করে। দেরি না করে সেখানে ছুটে যায় পুলিশ। কিন্তু আয়েশাকে পাওয়া যায়নি। তবে আয়েশার এক প্রতিবেশীর কাছ থেকে একটি মোবাইল নম্বর পাওয়া যায়। ওই নম্বরে যোগাযোগ করলে জানা যায়, তার মোবাইল নম্বরটি কখন কে ব্যবহার করেছেন সেটি নিশ্চিত হওয়া যায় না। কিছু দিন আগে আয়েশার ফোনে ডিসপ্লে নষ্ট থাকায় রাব্বী নামে ব্যক্তিকে ঠিক করার জন্য দেয় এবং এই সময় সিমটি রাব্বীর ফোনে ব্যবহার করা হয়ে থাকতে পারে। এভাবে রাব্বীকে শনাক্ত করা হয়। রাব্বী জানান আয়েশা তার স্ত্রীর নাম, সে মানুষের বাসায় গৃহকর্মীর কাজ করে। তদন্তের অনেক দূর এগিয়ে যায় পুলিশ। রাব্বীর কাছে তথ্য পেতে থাকে পুলিশ। এভাবে ঘটনার ২৪ ঘণ্টার মধ্যে হত্যাকারী আয়েশার পরিচয় নিশ্চিত হওয়া যায়।

এর পর আয়েশাকে গ্রেফতারের জন্য প্রথমে হেমায়েতপুরে তার মায়ের বাসায় অভিযান চালানো হয়। তার মা জানান, রাতে তার বাসায় ছিল আয়েশা, তবে সকালে বেরিয়ে গেছে। আয়েশার মাকে নিয়ে পুলিশ রাব্বীর মায়ের বাসায় গেলেও সেখানেও তাদের পাওয়া যায়নি। তারা পুলিশকে জানায়, আয়শা ও রাব্বী বরিশালে গিয়ে থাকতে পারে। এক পর্যায়ে তাদের নিকট প্রাপ্ত তথ্য ও প্রযুক্তির সহায়তায় পটুয়াখালীর দুমকি থানাধীন প্রত্যন্ত নলুয়া এলাকায় অভিযান চালানো হয়। কিন্তু সেখানেও তাদের পাওয়া যায়নি। পরবর্তীতে এডিসি মোহাম্মদপুরের নেতৃত্বে থাকা পুলিশের আভিযানিক টিম ঝালকাঠি জেলার নলছিটি থানার চরকারা গ্রামে আয়েশার স্বামী রাব্বীর পৈতৃক বাড়িতে অভিযান চালালে সেখানে পাওয়া যায় আয়েশা ও তার স্বামী জামাল সিকদার রাব্বীকে। উদ্ধার করা হয় চুরি করে নেয়া ল্যাপটপ।

হত্যাকাণ্ডের কথা স্বীকার করে আয়েশা পুলিশকে জানায়, কাজে আসার দ্বিতীয় দিনে ওই বাসা থেকে দুই হাজার টাকা চুরি করে। এ নিয়ে গৃহকর্ত্রী আয়েশাকে প্রশ্ন করলে তার সাথে গৃহকর্ত্রীর বাগি¦তণ্ডা হয়। লায়লা আফরোজ আয়েশাকে পুলিশে দেয়ারও ভয় দেখিয়ে তার স্বামীকে ফোন করতে মোবাইল বের করেন। ঠিক তখনই আগে থেকে আনা ছুরি দিয়ে একের পর এক আঘাত করতে শুরু করে। কারণ তার ধারণা ছিল চুরি করা টাকার বিষয়ে তাকে ধরা হতে পারে। তাই বাসা থেকে সুইচ গিয়ার ছুরি নিয়ে যায়।

এ দিকে মায়ের চিৎকারে ছুটে আসে মেয়ে নাফিসা। মাকে রক্তাক্ত দেখে ইন্টারকমে দারোয়ানকে ফোন করার চেষ্টা করতে থাকে। আর তখন আয়েশা মাকে ছেড়ে নাফিসাকে এলোপাতাড়ি কোপাতে থাকে। অসংখ্য ছুরিকাঘাতের ফলে অতিরিক্ত রক্তক্ষরণে মা ও মেয়ে দু’জনেই মারা যান। ঘটনার সময় আয়েশা নিজেও আহত হয়। দু’জনের মৃত্যু নিশ্চিত হওয়ার পর রক্তমাখা কাপড়চোপড় পাল্টিয়ে মেয়ে নাফিসার স্কুল ড্রেস পরে বাসা থেকে বের হয়ে যায়। যাওয়ার সময় ব্যাকপ্যাকে একটি ল্যাপটপ, মোবাইল ফোন ও আরো কিছু জিনিসপত্র নিয়ে যায়। বাসা থেকে বের হয়ে সে সোহরাওয়ার্দী মেডিক্যালের ভিতরে গিয়ে পুনরায় কাপড় পাল্টিয়ে সাভারের উদ্দেশে রওনা হয়। পরবর্তীতে সে চুরি করা ফোনও রক্তাক্ত কাপড় চোপড় সিংগাইর ব্রিজ হতে নদীতে ফেলে দেয়।

নজরুল ইসলাম বলেন, আয়েশার মধ্যে সাইকোপ্যাথ এবং চুরির প্রবণতা লক্ষ্য করা গেছে। কারণ তার স্বামীর সাথে রাগারাগি করে নিজের শরীরে আগুন ধরিয়ে দেয়ায় ঝলসে গেছে। এ ছাড়া তার নিজের বোনের বাসা থেকে আট হাজার টাকা চুরি করে। মোহাম্মদপুরের অন্য একটি বাসা থেকেও টাকা চুরি করেছিল। তবে এসব ঘটনার পেছনে অন্য কোনো কারণ রয়েছে কি না বা তার স্বামীর সংশ্লিষ্টতা কতটুকু সে ব্যাপারে তদন্ত করা হচ্ছে।