তারল্য সঙ্কোচনের কৌশল ও ইসলামী বন্ডের উত্থান

অর্থবাজারে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাম্প্রতিক পদক্ষেপ যে কারণে

Printed Edition

বিশেষ সংবাদদাতা

বাংলাদেশের অর্থনীতি বর্তমানে একটি সংবেদনশীল মোড়ে দাঁড়িয়ে। এক দিকে মূল্যস্ফীতির চাপ, অন্য দিকে বিনিয়োগ ও প্রবৃদ্ধির চাহিদা- এই দুইয়ের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করাই এখন কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বড় চ্যালেঞ্জ। ঠিক এই প্রেক্ষাপটে ২৪ মার্চ অনুষ্ঠিত ইসলামী বন্ড (বিজিআইআইবি) নিলাম এবং ওপেন মার্কেট অপারেশনের (ওএমও) ফলাফল গুরুত্বপূর্ণ ইঙ্গিত দিচ্ছে।

এই পদক্ষেপগুলো শুধু নিয়মিত আর্থিক কার্যক্রম নয়; বরং এটি একটি সুস্পষ্ট নীতিগত বার্তা- বাজারে তারল্য নিয়ন্ত্রণে কঠোর অবস্থানে রয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক।

ইসলামী বন্ড : বিকল্প অর্থায়নের শক্তিশালী মাধ্যম : বাংলাদেশ গভর্নমেন্ট ইসলামী ইনভেস্টমেন্ট বন্ড (বিজিআইআইবি) এখন দেশের ইসলামী ব্যাংকিং ব্যবস্থার অন্যতম প্রধান উপকরণ। সাম্প্রতিক নিলামে ৩ ও ৬ মাস মেয়াদি বন্ডে মোট ২,৩৮০ কোটি টাকার বেশি বিড জমা পড়ে এবং সবই গ্রহণ করা হয়।

এটি দু’টি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নির্দেশ করে- প্রথমত, ইসলামী আর্থিক পণ্যের প্রতি আস্থা বাড়ছে। দ্বিতীয়ত, ব্যাংকগুলো নিরাপদ ও স্বল্প ঝুঁকির বিনিয়োগে আগ্রহী।

এতে গড় প্রত্যাশিত মুনাফার হার (ইপিআর) ৮.৩০% থেকে ৮.৫০% এর মধ্যে থাকা দেখায় যে, বাজারে মুনাফার হার একটি স্থিতিশীল পর্যায়ে রয়েছে। প্রফিট শেয়ারিং রেশিও (পিএসআর) ৯০:১০ হওয়াও বিনিয়োগকারীদের জন্য আকর্ষণীয়।

বিশ্লেষকদের মতে- বাংলাদেশে ইসলামী ব্যাংকিং খাত দ্রুত সম্প্রসারিত হচ্ছে। কিন্তু এই খাতের একটি বড় সীমাবদ্ধতা ছিল শরিয়াহসম্মত বিনিয়োগের সুযোগের অভাব। বিজিআইআইবি সেই শূন্যতা পূরণ করছে। এটি শুধু একটি বন্ড নয়- বরং ইসলামী অর্থনীতির জন্য একটি ‘লিকুইডিটি ম্যানেজমেন্ট টুল’।

ওপেন মার্কেট অপারেশন : কড়াকড়ি মুদ্রানীতির প্রতিফলন

একই দিনে ওপেন মার্কেট অপারেশনের মাধ্যমে প্রায় ২৫ হাজার কোটি টাকার বেশি নিট তারল্য শোষণ করা হয়েছে। এটি অর্থনীতির জন্য একটি বড় সঙ্কেত।

এতে বোঝা যাচ্ছে- বাজারে অতিরিক্ত টাকা রয়েছে; কেন্দ্রীয় ব্যাংক তা কমাতে চায় এবং মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণই প্রধান লক্ষ্য।

এতে ব্যবহৃত প্রধান উপকরণ হলো- সিবি রেপো যেখানে স্বল্পমেয়াদি অর্থ সরবরাহ হয়, তবে উচ্চ হারে (১০%)। বিজিআইআইবি হলো- ইসলামী ব্যাংকের জন্য স্বল্প হারে তারল্য। আর এসডিএফে অতিরিক্ত অর্থ জমা রাখার সুযোগ থাকে। বিশেষভাবে এসডিএফে ৫ হাজার কোটি টাকার বেশি জমা পড়া দেখায়- ব্যাংকগুলো নিজেরাই অতিরিক্ত তারল্য নিয়ে বসে আছে।

কেন তারল্য কমানো হচ্ছে?

নানা কারণে তারল্য কমানো হচ্ছে। প্রথমত- মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ: অতিরিক্ত তারল্য মানেই বাজারে বেশি টাকা, যা পণ্যের দাম বাড়ায়। তাই টাকা টেনে নেয়া হচ্ছে।

দ্বিতীয়ত- ডলারের চাপ কমানো : অভ্যন্তরীণ বাজারে টাকা কমলে আমদানি চাপ কমে, ফলে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে চাপ কিছুটা কমে।

তৃতীয়ত- সুদের হার ব্যবস্থাপনা : তারল্য কমিয়ে ঋণের সুদের হার একটি নির্দিষ্ট পর্যায়ে রাখা সহজ হয়।

সম্ভাব্য প্রভাব : অর্থনীতির কোন দিকে যাচ্ছে?

এই নীতির প্রভাব বহুমাত্রিক হতে পারে। এর ইতিবাচক দিক হলো- এতে মূল্যস্ফীতি কমতে পারে; অর্থবাজারে শৃঙ্খলা ফিরে আসতে পারে এবং অনিয়ন্ত্রিত ঋণপ্রবাহ কমবে। আর নেতিবাচক দিক হলো-এতে ঋণের সুদের হার বাড়তে পারে; ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তারা চাপে পড়তে পারেন এবং বিনিয়োগ প্রবৃদ্ধি সাময়িকভাবে ধীর হতে পারে।

ইসলামী বনাম প্রচলিত অর্থব্যবস্থা : এক নতুন ভারসাম্য

বাংলাদেশ ব্যাংকের সাম্প্রতিক পদক্ষেপে একটি বিষয় স্পষ্ট- প্রচলিত সুদভিত্তিক ব্যবস্থার পাশাপাশি ইসলামী অর্থব্যবস্থাকেও সমান গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে। আইবিএলএফ ও বিজিআইআইবির সক্রিয় ব্যবহার দেখায়, কেন্দ্রীয় ব্যাংক এখন দ্বৈত কাঠামোর মধ্যে ভারসাম্য তৈরির চেষ্টা করছে। এটি এ কারণে গুরুত্বপূর্ণ যে- বাংলাদেশে ইসলামী ব্যাংকিং খাতের অংশ উল্লেখযোগ্য। এই খাতকে উপেক্ষা করলে সামগ্রিক আর্থিক স্থিতিশীলতা বিঘিœত হতে পারে।

বড় প্রশ্ন : কড়াকড়ি নীতি কতদিন?

অর্থনীতির জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো- এই কঠোর মুদ্রানীতি কতদিন চলবে? সংশ্লিষ্টদের মতে, যদি- মূল্যস্ফীতি দ্রুত কমে; ডলারের বাজার স্থিতিশীল হয় তবে কেন্দ্রীয় ব্যাংক নীতি শিথিল করতে পারে। অন্যথায়, এই কড়াকড়ি আরো দীর্ঘায়িত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

সতর্ক ভারসাম্যের খেলা

বাংলাদেশ ব্যাংকের সাম্প্রতিক পদক্ষেপগুলো একটি সূক্ষ্ম ভারসাম্যের ইঙ্গিত দেয়। এক দিকে বাজার থেকে অতিরিক্ত তারল্য টেনে নেয়া হচ্ছে, অন্য দিকে ইসলামী বন্ডের মাধ্যমে বিনিয়োগের সুযোগ তৈরি করা হচ্ছে। এটি এক ধরনের ‘ক্যালিব্রেটেড টাইটেনিং’- অর্থাৎ ধীরে ধীরে কড়াকড়ি আরোপ, যাতে অর্থনীতি হঠাৎ ধাক্কা না খায়। অবশেষে বলা যায়, বর্তমান নীতি সফল হবে কি না, তা নির্ভর করবে বাস্তবায়নের দক্ষতা এবং বাজারের প্রতিক্রিয়ার ওপর। তবে এটুকু স্পষ্ট- বাংলাদেশের অর্থনীতি এখন এমন একপর্যায়ে, যেখানে প্রতিটি নীতিগত পদক্ষেপই অত্যন্ত হিসাব করে নিতে হচ্ছে।