মহান স্বাধীনতা দিবস সংখ্যা

Printed Edition

জাহাঙ্গীর ফিরোজ

জিজ্ঞাসু

হাজারো আলোর স্তরে স্তরে

অর্বুদ নির্বুদ পরার্ধ পদ্ম খেলা করে

যাকে সে দেখায় সেই দেখে।

আলোর ভুবন, ছায়ায় জগত, মর্তে

যাবতীয় মায়া হারায় কালের গর্ভে

জন্মের পর বিলীন হওয়ার শর্তে।

খেলার এ’রুলে নাই কোনো ভুল নাই তো।

খেলোয়াড় তুমি আড়ালে থেকেই খেলেছ

ভাঙা ও গড়ার বিষম নিয়মে গড়ছ

কান্না-হাসির নাট্যমঞ্চে ছাড় দাও

ছেড়ে তো দাওনি নমরুদ থেকে হাসিনা

তোমার রহম ছাড়া তো আমরা বাঁচি না।

তুমি বসে ভাবো, বলো মনে মনে

গঠন গড়ন সকলি হয়েছে ঠিকঠাক

এখন আরেক ভুবনের কথা ভাবা যাক।

ভাবনা তোমার জানবে না কেউ কোনো দিন

যদি না জানাও যদি না দেখাও স্বেচ্ছায়

তবুও মানুষ ছুটছে জানার ইচ্ছায়;

গ্রহ থেকে গ্রহে হিমগিরি থেকে সাগরে।

খালেকও তুমি মালেকও তুমি

জাহের বাতেন সকলি

জানার পিপাসা মেটাও অলিরে কেবলি।


মুজতাহিদ ফারুকী

রাত শেষ হয়ে এলে

রাত শেষ হয়ে এলে নিপীড়িত সফেদ শরীরে

বাচাল নিবের ভাষা যদি বা ফুরায়

অকথিত কিছু থাকে অবশিষ্ট কলমের পেটে

মাথা ঢেকে মহাশয় নীরবে ঘুমালে তৃপ্ত রতিসুখে

ধেয়ানী স্মৃতির সুঁই কী যে কি খেয়ালে

বাহারি সুতার রঙে

মনে মনে অকারণ গীতিনকশা বোনে

তখন অলস ফুরসতে

হাতুড়িপাথর দিন ধরনীর মস্তি মায়া ভুলে

মায়াবী রুকের পিঠে মেঘ ধরবে বলে

বালখিল্য বায়নাক্কা ধরে

সপ্ত ডিঙ্গা মধুকরে দুরন্ত বণিক

তোলে স্বপ্নে আঁকা পাল।


জাকির আবু জাফর

ঈগল সভ্যতা

ও ঈগল সভ্যতা! মানুষের পৃথিবী কি তোমাদের ইচ্ছের খোয়াড়, ভোগবাদী বিষ্ঠায় ভরপুর কোনো ভাগাড়, নাকি তোমাদের অশ্লীল মোড়লীপনার কোনো বর্বর জমিদারি!

চাইলেই কি ফুৎকারে নেভানো যায় কোনো প্রাচীন সভ্যতার রঙ! কোনো অনন্য দর্শনের নিশান! কোনো বিশ্বস্ত প্রতিশ্রুত শাসনের উত্থান!

একটি অপরাজেয় জাতির বিশ্বাসী অলঙ্কার লুট খুব কি সহজ।

নিজেকে প্রশ্ন করো- তুমিও কি মানুষ

তুমিও কি জন্মেছ কোনো মাতৃগর্ভের উদরে

তোমার গন্ধ কি মিশে আছে পৃথিবীর হাওয়ায় মাতৃস্তন থেকে তুমিও কি নিয়েছিলে জীবনের রঙ

বারুদে ঝলসানো কোনো নিঃশ্বাসের কথা ভাবো

যখন বোমারু বিমান থেকে ঝাঁকবাঁধা মৃত্যু ঢালো

যখন ধুলায় মেশে একেকটি স্বপ্নের প্রাসাদ

মুহূর্তে মুছে যায় জীবনের সব

তখনো কি তুমি মানুষ থাকো!

তোমাদের সাম্রাজ্যবাদী বারুদে কত নিরপরাধ চোখ নিভে যায়, কত অসহায় মুখ মুছে যায়,

নিঃশেষ হয় কত কত জীবনের উপত্যকা

মানুষের মানচিত্র জুড়ে এত হাহাকার এত অশ্রু এত মৃত্যু এত বেদনার ভয়াল অন্ধকার ঢেলেও তুমি মানুষ!

না, আমি তোমাকে মানুষ ভাবি না, ভাবতে পারি না। তুমি সভ্যতার লজ্জা, তুমি আধুনিক বর্বর

তুমি মানবজাতির অনাকাক্সিক্ষত দুশমন,

মানুষের মুখোশ খুললেই হিংস্র হায়না অথবা ঘৃণিত পাশবিক তুমি

লজ্জা, লজ্জা বড় লজ্জা হে ভোগবাদী সভ্যতার দাস!


মনসুর আজিজ

লক্ষ শহীদের রক্তে আঁকা

সাহসের শিস বাজে হৃদয়ের গভীরে

মনের ভেতরে যুদ্ধের খই ফোটে

তবে কি এসে গেল যুদ্ধের দিন

শিকল ভাঙার দুর্বিনীত আওয়াজ!

মুক্তির নতুন সূর্য হাসে পুবদিকে

চড়ুই পাখির মতো ছটফট করছি যুদ্ধে যেতে

বাইরে রেজিমেন্ট সজ্জিত

বাংলার খেটে খাওয়া মানুষ

কামার কুমার জেলে তাঁতী

পাটকলের মজুর... উঠতি বয়সী ছাত্রনেতা

আমিও মিশে যাই তাদের দলে

মার্চের খরতপ্ত দিনে শুরু হয়েছে একটি

নতুন মানচিত্র পাওয়ার সংগ্রাম

পৃথিবীর বুকে একটি নতুন ভূখণ্ড জেগে উঠছে

নতুন চরের মতো।

লক্ষ শহীদের রক্ত এঁকে দিয়েছে

মানচিত্রের সীমান্ত রেখা।


জসীম উদ্দীন মুহম্মদ

হঠাৎ বিস্ফোরণের হুল ফোটে

রাতের মানচিত্রে হঠাৎ বিস্ফোরণের হুল ফোটে

ট্যাংকের ভিতর ঘুমিয়ে আছে অনাগত শিশু

তাদের হাতে খেলনা বন্দুক নয়, ভাঙা চাঁদের টুকরো।

আকাশের কপালে লাল সাইনবোর্ড ঝুলছে,

‘এখানে তোমাদের স্বপ্ন পার্কিং নিষিদ্ধ।’

এখন শহরের রাস্তায় আতঙ্কিত সৈনিকেরা হাঁটে

তাদের ছায়াগুলো কাঁদে নরম ঘাসের মতোন

একটি কবুতর ঠোঁটে করে নিয়ে যায় বিস্ফোরিত

ভবনের শেষ চিঠি।

আমি যুদ্ধের কাছে জিজ্ঞেস করি, তোমার কি মা নেই?

যুদ্ধ কোনো উত্তর দেয় না

শুধু মানুষের মুখে মুখে রক্তের বিজ্ঞাপন সাঁটে।

তবু এক শিশুর আঁকা সূর্য ধোঁয়ার ভিতরেও জ্বলে

সেখানে কোনো সীমান্তরেখা নেই...!


বাছিত ইবনে হাবীব

স্বাধীনতা

বনের পাখি চায় না খাঁচায় যেতে

স্বাধীন স্বভাব তার গান করার

পুষ্প চায় না বৃক্ষ ছেড়ে যেতে

বেদনা নিতে চায় না ঝরে পড়ার।

তেমনি মানুষ চায় না বন্দিদশা

তার পছন্দ মুক্ত চরাচর

প্রয়োজনে সে বিচরণশীল মশা

ঘৃণা করে সে বন্দি হবার স্বর।

তার চাই মুক্তবিহঙ্গ দিন

আলোর স্বপ্নে ভরা রঙিন

সুচিন্তার স্বাধীনতামাখা

প্রতিশ্রুত সৃজনের চিন।

কে তুমি বন্ধ করতে আসো

খোলা দরজার হাওয়া

আমার কাছে স্বাধীনতা মানে

কল্যাণ কাছে পাওয়া।

কেউ নেবে না কেড়ে

আমার ন্যায্য দাবি

আমার হাতে নিরাপদ থাকবে

আমার ঘরের চাবি।


আলাউদ্দিন আজাদ

আমরা জন্মেছি মুক্তির জন্য

শির উঁচু করে বাঁচতে শিখো, পূর্বপুরুষদের মতো

যারা তোমাকে মুক্তি শিখিয়ে গেছেন

সব অন্যায় অনিয়মের বেড়াজালের বিরুদ্ধে।

যারা টুঁটি ধরতে চায় সত্য বলার জন্য

যেখানে পারদের মতো বিস্ফোরণ ফাটাবে

মুক্তির জন্য

এই দেশের মানুষ খুব শান্তপ্রকৃতির

তারা শুধু শৃঙ্খলের বাইরে হাঁটতে চেয়েছে।

কেউ যদি বলে অন্যায়ের বিরুদ্ধে চুপ থাকো,

তাহলে তারা চিৎকার করবে

তাদের কণ্ঠে ভেঙে যাবে অনিয়মের দেয়াল।

বিদ্রোহ করতে শিখো, পূর্বপুরুষদের মতো

তোমাদের হাতে মুছে দাও পৃথিবীর সব অনিয়ম

পৃথিবীর কোনায় কোনায় ছড়িয়ে দাও সত্যের বার্তা

বিদ্রোহ করো সব দেশদ্রোহী পাপাচারের বিরুদ্ধে

আমাদের দম নেই বাঁধার কাছে

আমরা বাতাসের মতো উড়ি

কেউ যদি শৃঙ্খল পরায়

আমরা তা ছিঁড়ে ফেলি কণ্ঠ দিয়ে।

শির উঁচু করো পূর্বপুরুষদের মতো

বিশ্ব দেখুক, আমরা জন্মেছি মুক্তির জন্য।


শারমিন নাহার ঝর্ণা

মুক্ত আকাশে উড়ছে

তারপর সমস্ত আঁধার কেটে পুব আকাশে

হেসে উঠল সোনালী রবি,

শত শত ফুলের মহান ত্যাগের বিনিময়

উপহার দিল একটি সুন্দর সকাল,

একটি মুক্ত ঝকঝকে অসীম আকাশ

উড়ছে স্বাধীনতার বিজয় নিশান।

আমরা প্রাণ খুলে হাসছি প্রশান্তির শ্বাস নিচ্ছি,

আমাদের ফুলেরা ঘুমিয়ে আছে নীরবে

একটি মুক্ত অসীম আকাশ দিয়ে।

অজস্র রক্তের স্রোত পেরিয়ে

আকাশে উঠেছে স্বাধীনতার রংধনু,

একটি স্বাধীনতার নিশান হাতে নিয়ে

আমরা রয়েছি গর্বে বুক ফুলিয়ে দাঁড়িয়ে।