এনসিটি পরিচালনা নিয়ে হাইকোর্টের বিভক্ত রায়

Printed Edition

নিজস্ব প্রতিবেদক

চট্টগ্রাম বন্দরের নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল (এনসিটি) পরিচালনায় বিদেশী কোম্পানির সাথে চুক্তির চলমান প্রক্রিয়ার বৈধতা প্রশ্নে করা রিট মামলায় গতকাল বৃহস্পতিবার হাইকোর্টের দুই বিচারপতির সমন্বয়ে গঠিত বেঞ্চ দ্বিধাবিভক্ত রায় দিয়েছে। বেঞ্চের জ্যেষ্ঠ বিচারপতি ফাতেমা নজীব চুক্তির প্রক্রিয়া অবৈধ ঘোষণা করে রুল অ্যাবসোলিউট করেছেন। অপর বিচারপতি ফাতেমা আনোয়ার তিনটি প্রশ্নে চুক্তির প্রক্রিয়া বৈধ বলে রায় দেন এবং রিটটি খারিজ করেন।

এই দ্বিধাবিভক্ত রায়ের পরিপ্রেক্ষিতে রিটকারী পক্ষের আইনজীবী কায়সার কামাল বলেন, ‘চুক্তির বৈধতা প্রশ্নে বেঞ্চের জ্যেষ্ঠ বিচারপতি রুল অ্যাবসোলিউট করেছেন, আর পিউনি জাজ (অপর বিচারপতি) তিনটি প্রশ্নে খারিজ করেছেন। এরপর এই জাজমেন্ট প্রধান বিচারপতির কাছে যাবে; তিনি তৃতীয় একটি বেঞ্চ করে দেবেন সেখানে এ ব্যাপারে দেয়া রায় চূড়ান্ত হবে।’ এ রায়ের ফলে চুক্তি প্রক্রিয়া চলমান থাকবে কি না- এমন প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, ‘এই অবস্থায় কাজ চালিয়ে যাওয়া নৈতিক হবে বলে আমি মনে করি না। যেহেতু জ্যেষ্ঠ বিচারক রুল অ্যাবসোলিউট করেছেন, সেহেতু থার্ড বেঞ্চের রায় পর্যন্ত অপেক্ষা করা প্রয়োজন।’ একই রকম কথা বলেন অতিরিক্ত অ্যাটর্নি জেনারেল অনীক আর হক। তিনি বলেন, নিয়ম অনুসারে এখন বিষয়টি প্রধান বিচারপতির কাছে যাবে। তিনি ভিন্ন বেঞ্চে বিষয়টি নিষ্পত্তির জন্য পাঠাবেন, যেখানে চূড়ান্ত নিষ্পত্তি হবে। তবে তিনি জানান, চুক্তিপ্রক্রিয়ার চলমান কার্যক্রম চালাতে আইনি কোনো বাধা নেই।

এনসিটি পরিচালনায় চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের বিদেশী কোম্পানির সাথে চুক্তির প্রক্রিয়ার বৈধতা প্রশ্নে জারি করা রুলের শুনানি গত ২৫ নভেম্বর শেষ হয় এবং এরপর রায়ের জন্য ৪ ডিসেম্বর দিন ঠিক করা হয়েছিল। বাংলাদেশ যুব অর্থনীতিবিদ ফোরামের পক্ষে সংগঠনটির সভাপতি মির্জা ওয়ালিদ হোসাইন রিট মামলাটি করেন এবং এতে নৌসচিব, চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান ও পিপিপি কর্তৃপক্ষের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তাকে বিবাদী করা হয়। গত ২৬ এপ্রিল একটি জাতীয় দৈনিকে ‘চট্টগ্রাম বন্দরের নিউমুরিং টার্মিনালে সবই আছে, তবু কেন বিদেশীর হাতে যাচ্ছে’ শিরোনামের প্রতিবেদনসহ এ বিষয়ে বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদন যুক্ত করে এনসিটি পরিচালনায় ন্যায্য ও প্রতিযোগিতামূলক দরপত্র আহ্বান করার নির্দেশনা চেয়ে রিট আবেদনটি করা হয়েছিল। রিট আবেদনের প্রাথমিক শুনানি নিয়ে গত ৩০ জুলাই বিচারপতি হাবিবুল গনি ও বিচারপতি শেখ তাহসিন আলীর বেঞ্চ রুল জারি করে জানতে চেয়েছিল যে, নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল পরিচালনায় চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের বিদেশী কোম্পানির সাথে চুক্তির চলমান প্রক্রিয়া কেন আইনগত কর্তৃত্ববহির্ভূত ঘোষণা করা হবে না। রিটের পক্ষে শুনানি করেন জ্যেষ্ঠ আইনজীবী এ এম মাহবুব উদ্দিন খোকন, আহসানুল করিম ও কায়সার কামাল; অন্য দিকে রাষ্ট্রপক্ষে শুনানি করেন অ্যাটর্নি জেনারেল মো: আসাদুজ্জামান ও অতিরিক্ত অ্যাটর্নি জেনারেল অনীক আর হক।

চট্টগ্রাম বন্দরের চারটি কনটেইনার টার্মিনালের মধ্যে এনসিটি সবচেয়ে বড়। এই টার্মিনালের পাঁচটি জেটির মধ্যে চারটিতে কনটেইনারবাহী বড় জাহাজ এবং অন্য একটি জেটিতে অভ্যন্তরীণ নৌপথে চলাচলকারী ছোট জাহাজ ভেড়ানো হয়। ২০২৪ সালে চট্টগ্রাম বন্দরে যত কনটেইনার ওঠানামা করেছে, তার ৪৪ শতাংশই হয়েছে এনসিটিতে। বন্দরের নিজস্ব অর্থায়নে ২০০৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে শুরু হয়ে ২০০৭ সালের ডিসেম্বরে এনসিটির পাঁচটি জেটি নির্মাণকাজ শেষ হয়েছিল, যার নির্মাণকাজে বন্দরের খরচ হয়েছিল ৪৬৯ কোটি টাকা। এর দুই বছর পর এনসিটির জন্য যন্ত্রপাতি কিনতে বিনিয়োগ করার শর্তে পরিচালনার জন্য বিদেশী অপারেটর নিয়োগে দরপত্র আহ্বান করা হলেও পরে সেই দরপত্র বাতিল করেছিল চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ। তারপর ২০১২ সালে টার্মিনালটি পরিচালনার জন্য আবার দরপত্র আহ্বান করা হয়। এরপর দরপত্র সংশোধনের নামে কয়েকটি প্রতিষ্ঠানকে অন্তর্ভুক্ত করা হলেও পরবর্তীতে মামলা হলে টার্মিনালের ইজারা প্রক্রিয়া ঝুলে যায়। নানা আইনি প্রক্রিয়া শেষে ২০১৫ সালের ২৫ জুন এনসিটির ৪ ও ৫ নম্বর জেটি পরিচালনায় বন্দরের সাথে চুক্তি করে সাইফ পাওয়ার টেক এবং এর দুই অংশীদার কোম্পানি এবং সে বছরের ২৩ সেপ্টেম্বর এনসিটির ২ ও ৩ নম্বর জেটি পরিচালনায় বন্দরের সাথে চুক্তি করে সাইফ পাওয়ারটেক লিমিটেড। তারা দরপত্রের মাধ্যমে দুই বছরের জন্য এনসিটি পরিচালনার দায়িত্ব পেয়েছিল এবং ২০১৫ সালের ১৭ অক্টোবর এনসিটিতে কনটেইনার ওঠানামার কাজ আনুষ্ঠানিকভাবে উদ্বোধন করা হয়।

এরপর এনসিটি পরিচালনায় আর দরপত্র ডাকা হয়নি, বরং সরাসরি ক্রয় পদ্ধতিতে (ডিপিএম) প্রতি ছয় মাসের জন্য এনসিটির টার্মিনালগুলো পরিচালনা করে আসছিল সাইফ পাওয়ার টেক লিমিটেড। টানা ১১ বার সরাসরি ক্রয় পদ্ধতিতে এনসিটি পরিচালনার পর চলতি বছরের ৭ জানুয়ারি দ্বাদশতম বারের মতো আরো ছয় মাসের জন্য তাদের এনসিটি পরিচালনার দায়িত্ব দেয়া হয়। শুরু থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত এনসিটি পরিচালনায় কি-গ্যান্ট্রি ক্রেইন ও রাবার টায়ারড গ্যান্ট্রি ক্রেইনসহ বিভিন্ন যন্ত্রপাতি কিনতে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ প্রায় দুই হাজার কোটি টাকা খরচ করেছে। এনসিটিতে বছরে ১০ লাখ একক কনটেইনার হ্যান্ডলিংয়ের সক্ষমতা থাকলেও ২০২৪ সালে দেশী বেসরকারি অপারেটর সাইফ পাওয়ারটেক এনসিটিতে ১২ লাখ ৮১ হাজার একক কনটেইনার হ্যান্ডলিং করে।

বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে এনসিটি পরিচালনার ভার বিদেশী অপারেটরের কাছে দেয়ার নীতিগত সিদ্ধান্ত হয়েছিল এবং তখনই সংযুক্ত আরব আমিরাতভিত্তিক ডিপি ওয়ার্ল্ডের নাম আলোচনায় আসে। গত বছরের ৫ অগাস্ট সরকার পতনের পর অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নিলেও তারাও এনসিটি পরিচালনায় বিদেশী অপারেটর নিয়োগে আগ্রহের কথা জানায় এবং এবারো আলোচনায় ডিপি ওয়ার্ল্ডের নাম রয়েছে। কিন্তু সরকারের এই অবস্থান জানানোর পর বিভিন্ন মহল থেকে সমালোচনা শুরু হয়। চট্টগ্রাম বন্দর শ্রমিক দল, বিভিন্ন বাম সংগঠন, বিএনপি, জামায়াতে ইসলামীসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতারা এনসিটি পরিচালনায় বিদেশী অপারেটর নিয়োগের বিরুদ্ধে নিজেদের অবস্থান জানিয়েছেন। এ ছাড়া চট্টগ্রাম বন্দর ব্যবস্থাপনায় বিদেশী কোম্পানিকে যুক্ত করার পদক্ষেপ, রাখাইনের জন্য মানবিক করিডোরের উদ্যোগ, স্টারলিংকের ইন্টারনেট সেবা চালুর মাধ্যমে বাংলাদেশকে ‘সাম্রাজ্যবাদী যুদ্ধচক্রে’ জড়ানোর চেষ্টা বন্ধের দাবিতে গত ২৭ ও ২৮ জুন ঢাকা থেকে চট্টগ্রাম অভিমুখে রোড মার্চও করেছিল কিছু বাম সংগঠন। তবে প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূস গত ৬ জুন জাতির উদ্দেশে দেয়া ভাষণে বলেছিলেন, ‘বন্দর ব্যবস্থাপনার জন্য আমরা যাদের আনছি তারা পৃথিবীর যেসব দেশে কাজ করে সেসব কোনো দেশেরই সার্বভৌমত্ব, জাতীয় নিরাপত্তা হুমকির মুখে পড়েনি।’ তিনি দাবি করেন, চট্টগ্রাম বন্দর ব্যবস্থাপনা বিদেশীদের হাতে তুলে দিলে ‘নিরাপত্তা হুমকি তৈরি হবে না’।