ভারত-বাংলাদেশ নিরাপত্তা সহযোগিতা ও নিখোঁজ মানুষের অদৃশ্য জীবন

Printed Edition

বিশেষ সংবাদদাতা

‘আমাকে চোখ বেঁধে, হাতকড়া পরিয়ে রাত দেড়টার দিকে নামিয়ে দেওয়া হলো। বুঝলাম- আমাকে হস্তান্তর করা হচ্ছে।’ এই কথাগুলো কোনো কল্পকাহিনী নয়। বাংলাদেশের এক তরুণের কণ্ঠে বলা বাস্তব অভিজ্ঞতা। রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা, সন্ত্রাসবিরোধী যুদ্ধ ও আন্তর্জাতিক সহযোগিতার নামে যে অদৃশ্য অধ্যায় দীর্ঘদিন ধরে লেখা হয়েছে, তারই একটি মানবিক স্যা এটি।

গত এক দশকে বাংলাদেশে গুম ও গোপন আটক ব্যবস্থার পেছনে শুধু অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক সিদ্ধান্তই নয়, কাজ করেছে একটি জটিল বিদেশী নেটওয়ার্ক- যেখানে কূটনৈতিক ভাষ্য, গোয়েন্দা বিনিময় ও সীমান্ত পেরোনো ‘অঘোষিত সহযোগিতা’ এক সাথে মিশে গেছে। এসব বিষয় উঠে এসেছে গুম কমিশনের চূড়ান্ত প্রতিবেদনে।

‘সন্ত্রাসবিরোধী রাষ্ট্র’ হিসেবে আত্মপ্রতিষ্ঠার কৌশল : আওয়ামী লীগ সরকার দীর্ঘদিন ধরেই নিজেদের একমাত্র ‘সন্ত্রাসবিরোধী শক্তি’ হিসেবে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে উপস্থাপন করেছে। পতিত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ২০১৫ সালে যুক্তরাষ্ট্রের কলম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে ‘ভঁহফধসবহঃধষরংস ধহফ বীঃৎবসরংস’-এর বিরুদ্ধে দৃঢ় যোদ্ধা’ হিসেবে তুলে ধরা হয়। এই বয়ান শুধু বক্তৃতায় সীমাবদ্ধ থাকেনি। মার্কিন কংগ্রেসের এক উপ-কমিটিতে হিন্দু আমেরিকান ফাউন্ডেশনের প্রতিনিধি বিএনপি ও জামায়াতকে সরাসরি ‘সন্ত্রাসী শক্তির সহযোগী’ হিসেবে চিহ্নিত করেন।

ফলে আন্তর্জাতিক পরিসরে এক ধরনের নীরব সম্মতি তৈরি হয়- যেখানে রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা মানেই অস্থিতিশীলতার ঝুঁকি, আর কর্তৃত্ববাদী শাসন যেন নিরাপত্তার অপরিহার্য শর্ত। দেশের ভেতরেও একই ভাষা প্রতিধ্বনিত হয়েছে। সড়ক পরিবহনমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের থেকে শুরু করে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শাহরিয়ার আলম- বারবার বলেছেন, একবার ‘জঙ্গিবাদ’ মাথাচাড়া দিলে তা ফিরে আসার আশঙ্কা থেকেই যায়। এই বক্তব্যগুলোতে রাষ্ট্রের নিরাপত্তা ও একটি দলের শাসন কার্যত সমার্থক হয়ে ওঠে।

‘হিন্দি শুনতাম, পারফিউমের গন্ধ পেতাম’ : গোপন বন্দিশালায় থাকা বহু মানুষ বলেছেন- তারা হিন্দি ভাষায় কথা বলতে শুনেছেন, বিদেশী লোকজনের পদচারণা টের পেয়েছেন। একজন দীর্ঘদিন টিএফআই সেলে আটক থাকা ব্যক্তি বলেন, ‘আমাদের দেয়ালের দিকে মুখ করে হাতকড়া পরিয়ে বসিয়ে রাখা হতো। হঠাৎ পারফিউমের গন্ধ আসত। মোবাইলের রিংটোন বাজত। আমি স্পষ্ট হিন্দি আর ইংরেজি শুনেছি- একাধিকবার।’

এগুলো কেবল সন্দেহ নয়; বরং ধারাবাহিক সা্েয উঠে আসা এক ভয়াবহ বাস্তবতা- যেখানে গুম হয়ে যাওয়া মানুষ শুধু রাষ্ট্রের নয়, প্রতিবেশী রাষ্ট্রের নিরাপত্তা কৌশলেরও অংশ হয়ে ওঠে।

ভারতবিরোধী ভিডিওই ‘অপরাধ’ : এক তরুণের অপরাধ ছিল- অনলাইনে ভারতীয় মুসলমানদের নিপীড়নের বিরুদ্ধে ভিডিও পোস্ট করা। তাকে র‌্যাব ধরে সীমান্ত পার করে ভারতে পাঠায়। চার দিন রাস্তায় না খেয়ে ঘুরে বেড়ানোর পর স্থানীয় মানুষ তাকে পুলিশের হাতে তুলে দেয়। শেষে ‘অনপাসপোর্ট’ মামলায় জেল। দিল্লি থেকে আসা জিজ্ঞাসাবাদকারীরা তাকে বলে- ‘এই ভুল আর জীবনে করবা না।’ কোনো আদালত নয়, কোনো চার্জশিট নয়- শুধু সতর্কবার্তা।

নিরাপত্তার নামে মানবিক বিপর্যয় : এই পুরো চিত্রটি দেখায়- গুম কেবল অভ্যন্তরীণ দমন নীতি নয়; এটি একটি আঞ্চলিক নিরাপত্তা ব্যবস্থার অন্ধকার পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া। সন্ত্রাসবিরোধী ভাষ্য আন্তর্জাতিক সহনশীলতা তৈরি করেছে, যা ভেতরের নির্যাতনকে প্রশ্নহীন করে তুলেছে। আজও ধারণা রয়েছে-কিছু বাংলাদেশী নাগরিক ভারতীয় কারাগারে আটকে আছেন। কিন্তু পূর্ণ তালিকা, পরিচয় ও সময়কাল না থাকায় সেই সত্য উদঘাটন অসম্পূর্ণ।

সীমান্তের ওপারে নিখোঁজ হওয়া মানুষ : একাধিক ভুক্তভোগীর সা্েয উঠে এসেছে সীমান্ত পেরোনো এক ভয়াবহ বাস্তবতা। কেউ বাংলাদেশ থেকে গুম হয়ে ভারতের কারাগারে ‘উপস্থিত’ হয়েছেন, কেউ আবার ভারতীয় হেফাজত থেকে বাংলাদেশে হস্তান্তরিত হয়ে বছরের পর বছর অদৃশ্য থেকেছেন। সুপ্রিম কোর্ট প্রাঙ্গণ থেকে অপহৃত সুখরঞ্জন বালির ঘটনা কিংবা বিএনপি নেতা সালাহউদ্দিন আহমেদের নিখোঁজ হয়ে ভারতের মেঘালয়ে ‘উদ্ধার’- এই কেসগুলো শুধু ব্যতিক্রম নয়, বরং একটি প্যাটার্নের ইঙ্গিত।

র‌্যাব ইন্টেলিজেন্সে দায়িত্ব পালনকারী এক সেনাসদস্যের বর্ণনায় সীমান্তে বন্দিবিনিময়ের নির্মম চিত্র উঠে আসে। রাতের অন্ধকারে, চোখ বাঁধা ও হাতকড়া পরানো বন্দীদের এক দেশের নিরাপত্তা বাহিনী অন্য দেশের হাতে তুলে দিচ্ছে। কোনো েেত্র বন্দীদের বিনিময়ের পরই রাস্তার পাশে হত্যা করা হয়েছে- এমন বর্ণনাও পাওয়া গেছে। নাম জানা যায় না, পরিচয় মুছে যায়, থেকে যায় কেবল একটি নথিহীন মৃত্যু।

আরো ভয়াবহ হলো- কিছু েেত্র বন্দীদের জিজ্ঞাসাবাদ হয়েছে যৌথভাবে। ভারতীয় গোয়েন্দারা প্রশ্ন পাঠিয়েছেন, বাংলাদেশী সংস্থাগুলো সেই প্রশ্নের উত্তর সংগ্রহ করে আবার সীমান্ত পেরিয়ে পাঠিয়েছে। মানুষ এখানে আর নাগরিক নয়- তথ্যের একটি প্যাকেট।

‘আমাকে বলা হয়েছিল- বাঁচতে হলে চুপ থাকতে হবে’ : এক তরুণ, যাকে বাংলাদেশ থেকে ভারতে পাঠানো হয়েছিল, বর্ণনা করেন কীভাবে তাকে চোখ বেঁধে নদী পার করানো হয়, কাঁটাতারের বেড়া টপকে অন্য হাতে তুলে দেয়া হয়। শেষে তিনি ভারতীয় পুলিশের হাতে পড়েন- অভিযোগ : ‘অবৈধ অনুপ্রবেশ’। কয়েক হাজার টাকা কেড়ে নেয়া হয়, খাবার ছাড়া দিনের পর দিন রাস্তায় থাকতে হয়। শেষ পর্যন্ত কারাগারে- টয়লেটের মাঝখানে শোওয়ার জায়গা।

আরেক ভুক্তভোগী জানান, দিল্লি থেকে আসা লোকজন তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করেছে- কাশ্মির বা মুসলমানদের পে ভিডিও পোস্ট করেছিল কি না। অপরাধ ছিল মত প্রকাশ। শাস্তি ছিল রাষ্ট্রহীনতার মতো এক জীবন।

অনেক বন্দী বলেছেন, গোপন আটক কেন্দ্রে তারা হিন্দি ও ইংরেজি ভাষায় কথা বলতে শুনেছেন। পারফিউমের গন্ধ, মোবাইল ফোনের রিংটোন- এইসব ইঙ্গিত দিতো, ভেতরে ‘বিশেষ অতিথি’ এসেছেন। বন্দীদের তখন দেয়ালের দিকে মুখ করে দাঁড় করিয়ে রাখা হতো- দেখার অধিকারটুকুও কেড়ে নেয়া।

সুব্রত বাইন : গুম কীভাবে নিরাপত্তাকে দুর্বল করে : এই ব্যবস্থার সবচেয়ে সাঙ্ঘাতিক দিক ফুটে ওঠে কুখ্যাত অপরাধী সুব্রত বাইনের ঘটনায়। ইন্টারপোলের ‘মোস্ট ওয়ান্টেড’ তালিকাভুক্ত একজন অপরাধীকে ২০২২ সালে গোপনে র‌্যাব ইন্টেলিজেন্সের টিএফআই সেলে রাখা হয়- আদালতে তোলা হয়নি, মামলা এগোয়নি। তাকে আনা হয়েছিল ভারতের সাথে এক গোপন বন্দিবিনিময়ের মাধ্যমে।

বছরের পর বছর আইনের বাইরে আটকে রাখার পর, ২০২৪ সালের আগস্টে তাকে মুক্তি দেয়া হয়। মুক্তির পর তিনি আবার অপরাধ জগৎ সংগঠিত করেন, রাজনৈতিক আশ্রয় পান, হত্যার নির্দেশ দেন- এমন অভিযোগ ওঠে। শেষ পর্যন্ত তাকে আবার ধরতে গিয়ে রাষ্ট্রকে নতুন করে বিপুল শক্তি ব্যয় করতে হয়।

এই ঘটনা দেখায়- আইনের বাইরে গিয়ে ‘নিরাপত্তা’ কায়েম করতে চাওয়া শেষ পর্যন্ত নিরাপত্তাকেই দুর্বল করে। আদালতে তোলা হলে হয়তো শুরুতেই তাকে দীর্ঘমেয়াদে বন্দী রাখা যেতো। কিন্তু গোপন ব্যবস্থায় রাখার ফলে রাষ্ট্র নিজেই নিজের হাত বেঁধে ফেলে।

নিরাপত্তার নামে মানবতা বিসর্জন?

এই প্রতিবেদনের স্যাগুলো একটি কঠিন সত্য সামনে আনে। গুম কোনো বিচ্ছিন্ন অপব্যবহার নয়; এটি একটি রাজনৈতিক-কূটনৈতিক পরিবেশে গড়ে ওঠা ব্যবস্থা, যেখানে আন্তর্জাতিক নীরবতা কার্যত অনুমোদনে পরিণত হয়েছে।

আজও আশঙ্কা আছে- কিছু বাংলাদেশী নাগরিক হয়তো ভারতের কারাগারে পড়ে আছেন, পরিচয়হীন বন্দী হিসেবে। রাষ্ট্রীয় কমিশনের অনুসন্ধান এখানেই থেমে গেছে- অসম্পূর্ণ তালিকা, অনুপস্থিত তথ্য, কূটনৈতিক অনীহা।

কিন্তু প্রশ্ন থেকে যায় : নিরাপত্তা কি মানুষের অধিকার মুছে দিয়ে নিশ্চিত করা যায়? নাকি গুমের এই অন্ধকার অধ্যায় শেষ পর্যন্ত রাষ্ট্রকেই আরো অনিরাপদ করে তোলে? এই প্রশ্নের উত্তর খোঁজা শুধু আইনগত দায়িত্ব নয়- এটি একটি নৈতিক দায়। কারণ যে রাষ্ট্র তার নাগরিককে অদৃশ্য হতে দেয়, সে রাষ্ট্র একদিন নিজেই ইতিহাসের চোখে অদৃশ্য হয়ে পড়ে।