সপ্তাহের শেষ দিন ফের পতন পুঁজিবাজারে

Printed Edition

- পুঁজিবাজার নিয়ে আগামী বাজেটে করসংস্কারের সুপারিশ ডিএসইর

অর্থনৈতিক প্রতিবেদক

একদিন পর ফের পতনের ধারায় ফিরে এসেছে দেশের পুঁজিবাজার। গত বুধবার হঠাৎ করেই দেশের দুই পুঁজিবাজারে সূচকের উল্লম্ফন ঘটে। কিন্তু ২৪ ঘণ্টা যেতে না যেতে ফের পতন ঘটল বাজারের। লেনদেনের পুরোটা সময় ধরেই সূচকের ওঠানামায় একপ্রকার অস্থির ছিল বাজারগুলো। এ সময় উভয় বাজারেই লেনদেন হওয়া কোম্পানির বেশির ভাগ দরপতনের শিকার হওয়ার পাশাপাশি হ্রাস পায় লেনদেন। বাজার বিশ্লেষকরা মনে করেন, মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধ নিয়ে কিছুটা তথ্য-বিভ্রান্তির শিকার হচ্ছেন বিনিয়োগকারীরা। আর এটার সুযোগ নিচ্ছে বিনিয়োগকারীদের একটি অংশ।

প্রসঙ্গত, বুধবার দেশের দুই পুঁজিবাজার সূচকে বড় ধরনের উন্নতি ঘটে। এর আগে টানা তিন দিন পতনের শিকার ছিল বাজারগুলো। কিন্তু মার্কিন প্রেসিডেন্টের মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধ বন্ধ করার ঘোষণার কথা চাউর হলে দুই পুঁজিবাজারে সূচকের এ উন্নতি ঘটে। কিন্তু এর ২৪ ঘণ্টার মাথায় গতকাল ফের দরপতনের শিকার হলো বাজারগুলো। লেনদেন শুরুর কয়েক মিনিটের মধ্যেই প্রচণ্ড বিক্রয়চাপের মুখে পড়ে বাজারগুলো। দিনের বাকি সময় বেশ ক’বার চাপ সামলে নেয়ার চেষ্টা করা হলেও দিনের বাকি সময় আর তা সম্ভব হয়ে ওঠেনি। এতে দিনশেষে একদিকে দুই বাজারেই সূচকের বড় অবনতি ঘটে, অন্য দিকে হ্রাস পায় দুই পুঁজিবাজারের লেনদেন।

ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) প্রধান সূচক ডিএসইএক্স গতকাল ৫৩ দশমিক ০৫ পয়েন্ট অবনতির শিকার হয়। ৫ হাজার ২৭২ দশমিক ৭৯ পয়েন্ট থেকে সকালে লেনদেন শুরু করা সূচকটি বৃহস্পতিবার দিনশেষে নেমে আসে ৫ হাজার ২১৯ দশমিক ৭৩ পয়েন্ট। একই সময় বাজারটির দুই বিশেষায়িত সূচক ডিএসই-৩০ ও ডিএসই শরিয়াহর অবনতি ঘটে যথাক্রমে ২১ দশমিক ২৮ ও ৫ দশমিক ৮৭ পয়েন্ট। অনুরূপভাবে দেশের দ্বিতীয় পুঁজিবাজার চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জে (সিএসই) সার্বিক মূল্যসূচক সিএএসপিআই ৭৭ দশমিক ৭৫ পয়েন্ট হারায়। বাজারটির দুই বিশেষায়িত সূচক সিএসই-৩০ ও সিএসসিএক্স সূচকের অবনতি ঘটে যথাক্রমে ৬৬ দশমিক ৯৫ ও ৩৯ দশমিক ০৪ পয়েন্ট।

সূচকের এ অবনতি প্রভাব ফেলে বাজারগুলোর লেনদেনেও। ঢাকা শেয়ারবাজার গতকাল ৬২৫ কোটি টাকার লেনদেন নিষ্পত্তি করে যা আগের দিন অপেক্ষা ৯৪ কোটি টাকা কম। বুধবার ডিএসইর লেনদেন ছিল ৭১৯ কোটি টাকা। লেনদেনের বড় অবনতি ঘটে চট্টগ্রাম শেয়ারবাজারে। এখানে ৪২ কোটি টাকা থেকে ৯ কোটিতে নেমে যায় লেনদেন।

এ দিকে আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটকে সামনে রেখে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ দেশের শেয়ারবাজারে স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা, বিনিয়োগ বাড়ানো এবং দীর্ঘমেয়াদি প্রবৃদ্ধি অর্জনের লক্ষ্যে জাতীয় বাজেটে কর কাঠামোতে বড় ধরনের সংস্কারের সুপারিশ করেছে। সংস্থাটির পক্ষ থেকে এই প্রস্তাব বা সুপারিশগুলো জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) প্রাকবাজেট আলোচনায় উপস্থাপন করা হয়। এনবিআর চেয়ারম্যান আব্দুর রহমান খানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত আলোচনায় ডিএসইর প থেকে বলা হয়, দেশের শেয়ারবাজারকে আরো শক্তিশালী, স্বচ্ছ ও স্থিতিশীল করতে কর নীতির সংস্কার অপরিহার্য।

ডিএসইর প্রস্তাব অনুযায়ী, তালিকাভুক্ত বন্ড থেকে প্রাপ্ত সুদের আয়ের ওপর করনীতিতে পরিবর্তন আনার সুপারিশ করা হয়েছে। ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান ছাড়া অন্যান্য বিনিয়োগকারীদের জন্য নির্দিষ্ট কিছু বন্ডে পাঁচ বছরের জন্য আয়কর অব্যাহতি দেয়ার পাশাপাশি অন্যান্য করপোরেট বন্ডে ১০ শতাংশ উৎস করকে চূড়ান্ত কর হিসেবে গণ্য করার প্রস্তাব করা হয়েছে। ডিএসইর মনে করে, এর ফলে কার্যকর বন্ড বাজার গড়ে উঠবে এবং সরকারের সুদ ব্যয় হ্রাস পাবে।

স্টক এক্সচেঞ্জগুলোতে বিদেশী বিনিয়োগ বাড়ানোর জন্য ডিএসই সুপারিশ করেছে যে তালিকাভুক্ত সিকিউরিটিজে অনিবাসীদের মূলধনী মুনাফার ওপর কর পাঁচ বছরের জন্য সম্পূর্ণ মওকুফ করা হোক। বর্তমানে বাজারে বিদেশী বিনিয়োগকারীদের অংশগ্রহণ খুবই কম, মোট লেনদেনের মাত্র ১.৫৭ শতাংশ। কর সুবিধা প্রদানের মাধ্যমে বিদেশী পোর্টফোলিও বিনিয়োগ বৃদ্ধি পাবে, বাজারে তারল্য বাড়বে এবং বৈদেশিক মুদ্রার প্রবাহ জোরদার হবে।

এসএমই খাতকে উৎসাহিত করতে ডিএসই প্রস্তাব করেছে যে, এসএমই বোর্ডে তালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলোর জন্য পাঁচ বছরের কর অবকাশ প্রদান করা হোক। বর্তমানে এসব কোম্পানিকে ২০ শতাংশ হারে কর দিতে হয়। প্রস্তাব বাস্তবায়িত হলে নতুন কোম্পানি তালিকাভুক্তি বৃদ্ধি পাবে, কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে এবং দীর্ঘমেয়াদে করভিত্তি সম্প্রসারিত হবে। এ ছাড়া মিউচুয়াল ফান্ড, ইউনিট সার্টিফিকেট ও এক্সচেঞ্জ ট্রেডেড ফান্ডে (ইটিএফ) বিনিয়োগের েেত্র কর রেয়াতের সীমা বাড়ানোর সুপারিশ করা হয়েছে, যাতে ুদ্র বিনিয়োগকারীরা ঝুঁকি কমিয়ে বাজারে অংশগ্রহণ করতে উৎসাহিত হয়।

ডিএসই আরো প্রস্তাব করেছে যে ব্যবসায়িক তিসহ অন্যান্য আয়ের বিপরীতে সমন্বয়ের সুযোগ পুনর্বহাল করা হোক, যাতে তিগ্রস্ত কোম্পানিগুলো পুনরায় ঘুরে দাঁড়াতে পারে এবং ভবিষ্যতে করদাতা হিসেবে টিকে থাকতে পারে। এ ছাড়া সাধারণ বিনিয়োগকারীদের জন্য তালিকাভুক্ত শেয়ারে মূলধনী মুনাফার ওপর করহার কমানোর প্রস্তাব দেয়া হয়েছে। ৫০ লাখ টাকা পর্যন্ত মূলধনী মুনাফা করমুক্ত রাখার পাশাপাশি এর বেশি অংশে ৫ শতাংশ হারে কর আরোপের সুপারিশ করা হয়েছে। বর্তমানে এই কর হার ১৫ শতাংশ। এ ছাড়া ডিভিডেন্ড আয়ের ওপর উৎসে করকে চূড়ান্ত করদায় হিসেবে গণ্য করার প্রস্তাব করা হয়েছে, যা বিনিয়োগকারীদের কর জটিলতা কমাবে এবং বাজারে ডিভিডেন্ডভিত্তিক বিনিয়োগ বাড়াবে।

ডিএসইর পর্যবেণে বলা হয়েছে, দেশে প্রায় এক কোটি মানুষ প্রত্য ও পরোভাবে শেয়ারবাজারের সাথে যুক্ত। তাই একটি শক্তিশালী, স্বচ্ছ ও স্থিতিশীল শেয়ারবাজার গড়ে তোলার জন্য কর নীতির সংস্কার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ডিএসইর এই সুপারিশগুলো বাস্তবায়িত হলে দেশের শেয়ারবাজারে বিনিয়োগ বাড়বে, বিদেশী বিনিয়োগকারীরা আকৃষ্ট হবেন, এসএমই খাত উন্নত হবে এবং সাধারণ বিনিয়োগকারীরা বাজারে আরো সহজ ও সুবিধাজনকভাবে অংশ নিতে পারবেন।