নতুন মেরুকরণে চীন-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্ক
আনাদোলু এজেন্সির বিশ্লেষণ
Printed Edition
নয়া দিগন্ত ডেস্ক
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের সম্পর্ককে এখন আর সাধারণ দ্বিপক্ষীয় কূটনৈতিক সম্পর্ক হিসেবে দেখা হচ্ছে না; বরং এটি বৈশ্বিক রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ব্যবস্থার ভবিষ্যৎ নির্ধারণকারী প্রধান অক্ষ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। ২০২৬ সালের দিকে এগোতে গিয়ে এই সম্পর্ক ঘিরে স্থিতিশীলতা বা দীর্ঘস্থায়ী সমঝোতার প্রত্যাশা বাস্তবসম্মত নয় বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা; বরং প্রতিযোগিতা আরো তীব্র হয়ে দীর্ঘমেয়াদি মেরুকরণের দিকে যাবে, এমন আশঙ্কাই প্রবল হচ্ছে।
২০২৫ সাল পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যে বাণিজ্য বৈশ্বিক উৎপাদন ও সরবরাহ শৃঙ্খলের কেন্দ্রে অবস্থান করেছে। বিপুল বাণিজ্যিক সম্পর্ক ও পারস্পরিক নির্ভরতার কারণে দুই দেশই কৌশলগত খাতে নির্ভরতা কমানোর চেষ্টা করেছে, তবে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্নতার পথে যায়নি। এর পরিবর্তে তারা ‘নির্বাচিত বিচ্ছিন্নতা’ বা সিলেকটিভ ডিকাপলিং কৌশল গ্রহণ করেছে, বিশেষ করে সেমিকন্ডাক্টর, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও উন্নত প্রযুক্তির ক্ষেত্রে।
এই প্রতিযোগিতায় সামরিক ও নিরাপত্তা মাত্রা যুক্ত হওয়ায় পরিস্থিতি আরো জটিল হয়েছে। তাইওয়ান, দক্ষিণ চীন সাগর এবং ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে সামরিক ভারসাম্য নিয়ে দুই পক্ষের মধ্যে উত্তেজনা অব্যাহত রয়েছে। পারমাণবিক সক্ষমতা, মহাকাশ ও সাইবার প্রযুক্তিতে আধিপত্য বিস্তারও বৈশ্বিক নিরাপত্তা কাঠামোকে প্রভাবিত করছে। যদিও ২০২৫ সালে উত্তেজনা নির্দিষ্ট সীমার মধ্যে ছিল, তবুও উভয় দেশই সম্ভাব্য সঙ্ঘাতের খরচ ও ঝুঁকি সম্পর্কে সচেতন।
বিশ্লেষকরা বলছেন, আন্তর্জাতিক ব্যবস্থা এখন কাগজে-কলমে বহুমেরু হলেও বাস্তবে যুক্তরাষ্ট্র ও চীনকে কেন্দ্র করে একধরনের নমনীয় দ্বিমেরু কাঠামোর দিকে এগোচ্ছে। এটি স্নায়ু যুদ্ধের মতো কঠোর ব্লকভিত্তিক নয়; বরং প্রতিযোগিতা, সীমিত সহযোগিতা ও কৌশলগত সমঝোতার মিশ্রণ।
তবে উভয় দেশই নিজ নিজ কাঠামোগত সীমাবদ্ধতার মুখে রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রে অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক বিভাজন, একাধিক বৈশ্বিক সঙ্কট সামলানোর ব্যয় এবং ইউক্রেন যুদ্ধের অনিশ্চয়তা বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠেছে। অন্য দিকে চীনের ক্ষেত্রে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির গতি, জনসংখ্যাগত পরিবর্তন ও আঞ্চলিক নিরাপত্তাসঙ্কট কৌশলগত চাপ বাড়াচ্ছে।
এই প্রেক্ষাপটে তৃতীয় দেশগুলোও ক্রমেই চাপের মুখে পড়ছে। ইউরোপ, এশিয়া ও মধ্যম শক্তিধর রাষ্ট্রগুলো আপাতত ভারসাম্য রক্ষার কৌশল নিলেও ২০২৬ সালে তাদের ওপর পক্ষ বেছে নেয়ার চাপ বাড়তে পারে। সব মিলিয়ে, বিশেষজ্ঞদের মতে, ২০২৬ সাল হবে যুক্তরাষ্ট্র-চীন প্রতিযোগিতা আরো গভীর ও প্রকাশ্য হওয়ার বছর, যার প্রভাব বিশ্বরাজনীতি ও অর্থনীতিতে দীর্ঘ দিন অনুভূত হবে।