অস্তিত্বের সঙ্কটে রাজধানীর খাল ও জলাধার
Printed Edition
* ৫০ শতাংশের বেশি খাল অবৈধ দখলে * নেপথ্যে প্রভাবশালী রাজনৈতিক নেতা ও ভূমিদস্যুরা * ৫৭টি খাল থেকে নেমে এসেছে ২৬টিতে * ভয়াবহ জলাবদ্ধতার শঙ্কা * ১৯ খালের ১২৫ কিলোমিটার উদ্ধারের উদ্যোগ সরকারের
আব্দুল কাইয়ুম
রাজধানী ঢাকার প্রাকৃতিক জলাধার ও খালগুলো আজ অস্তিত্বের সঙ্কটে। নগর পরিকল্পনাবিদ ও পরিবেশ বিশেষজ্ঞদের মতে, রাজধানীর ৫০ শতাংশের বেশি খাল ও জলাধার ইতোমধ্যে বিভিন্নভাবে ভরাট বা দখল হয়ে গেছে। যেগুলো এখনো টিকে আছে, সেগুলোর অনেকগুলোই সঙ্কুচিত, দূষিত কিংবা দখলদারদের চাপে কার্যত মৃতপ্রায়।
খাল ও জলাধার দখলের নেপথ্যে রয়েছে প্রভাবশালী রাজনৈতিক নেতাকর্মী, ভূমিদস্যু, অসাধু ব্যবসায়ী এবং স্থানীয় মতাবান মহল। তাদের ছত্রছায়ায় সরকারি ও বেসরকারি জমি দখল করে গড়ে উঠেছে বহুতল ভবন, বস্তি, মার্কেট ও নানা স্থাপনা। এতে রাজধানীর প্রাকৃতিক পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা ভেঙে পড়েছে। খাল, জলাধার ও নিম্নাঞ্চল ভরাট হয়ে যাওয়ার ফলে বৃষ্টির পানি দ্রুত নামতে পারে না। ফলে সামান্য বৃষ্টিতেই তলিয়ে যায় অলিগলি থেকে শুরু করে প্রধান সড়ক। ঝুম বৃষ্টি হলেই নগরজীবনে নেমে আসে চরম দুর্ভোগ ও দীর্ঘস্থায়ী জলাবদ্ধতা।
বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান রিভার অ্যান্ড ডেল্টা রিসার্চ সেন্টার (আরডিআরসি)-এর এক গবেষণা বলছে, স্বাধীনতার পর ঢাকায় মোট ৫৭টি খাল ছিল। কিন্তু নগরায়ন, দখল ও ভরাটের কারণে বর্তমানে এই সংখ্যা নেমে এসেছে মাত্র ২৬টিতে। এর মধ্যেও অধিকাংশ খালের অবস্থাই অত্যন্ত নাজুক। কোথাও খালের প্রস্থ কমে গেছে, কোথাও আবর্জনায় ভরাট হয়ে গেছে, আবার কোথাও স্থাপনা গড়ে উঠেছে খালের ওপর।
গবেষণায় বলা হয়েছে, রাজধানীতে বর্তমানে অন্তত ৯টি বড় জলাবদ্ধতার ‘হটস্পট’ রয়েছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য অংশই এমন এলাকায়, যেখানে খাল দখল বা সঙ্কুচিত হওয়ার কারণে পানির স্বাভাবিক প্রবাহ বন্ধ হয়ে গেছে। গবেষকদের মতে, দখল হয়ে যাওয়া খালগুলোর অন্তত ১৫টি খাল পুনরুদ্ধার ও খনন করা গেলে ঢাকার দীর্ঘ দিনের জলাবদ্ধতার প্রায় ৮০ শতাংশ সমস্যার সমাধান সম্ভব।
দায়িত্ব বদলেছে, সমস্যা রয়ে গেছে
ঢাকার জলাবদ্ধতা নিরসনের দায়িত্ব দীর্ঘ দিন ধরে ছিল ঢাকা ওয়াসার হাতে। তবে ২০২০ সালের ৩১ ডিসেম্বর আনুষ্ঠানিকভাবে রাজধানীর খাল ও ড্রেনেজ ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব হস্তান্তর করা হয় ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনের কাছে।
এর আগে ঢাকা ওয়াসা ২৬টি খাল- প্রায় ৮০ কিলোমিটার এবং প্রায় ৩৮৫ কিলোমিটার বড় আকারের নালা ও চারটি পাম্প স্টেশন পরিচালনা করত। অন্য দিকে ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন দেখভাল করত প্রায় দুই হাজার ২১১ কিলোমিটার নালা। দায়িত্ব হস্তান্তরের মাধ্যমে ওয়াসার অধীনস্থ খাল ও নালাগুলোও সিটি করপোরেশনের কাছে চলে যায়।
তবে দায়িত্ব বদলালেও পরিস্থিতির উল্লেখযোগ্য উন্নতি হয়নি বলে অভিযোগ বিশেষজ্ঞদের। তাদের মতে, গত এক যুগেরও বেশি সময় ধরে জলাবদ্ধতা নিরসনের নামে বিভিন্ন প্রকল্পে প্রায় তিন হাজার কোটি টাকার বেশি ব্যয় করা হয়েছে। কিন্তু সেই ব্যয়ের তুলনায় নগরবাসীর দুর্ভোগ কমেনি। বরং প্রতি বর্ষায় একই চিত্র ফিরে আসে- পানি জমে থাকে সড়ক, বাসাবাড়ি ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে।
১৯ খাল উদ্ধারে নতুন উদ্যোগ
এ দিকে রাজধানীর বেদখল ও দূষণে বিপর্যস্ত খালগুলো পুনরুদ্ধারে নতুন উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। চলতি বছরে ১৯টি খালের মোট ১২৫ কিলোমিটার নেটওয়ার্ক পুনরায় সচল করার ল্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে।
পরিকল্পনা অনুযায়ী ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনের আওতায় থাকা ছয়টি খালের সংস্কার কার্যক্রম ইতোমধ্যে উদ্বোধন করা হয়েছে। এর মধ্যে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন (ডিএনসিসি) চারটি এবং ঢাকা দণি সিটি করপোরেশন (ডিএসসিসি) দুটি খাল সংস্কার করবে।
স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, খাল সংস্কারের আওতায় খালের সীমানা নির্ধারণ, অবৈধ দখল উচ্ছেদ, খনন ও পরিষ্কার, পাড় সংরণ এবং একটি সমন্বিত ‘ব্লু নেটওয়ার্ক’ নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে।
পুনরুদ্ধারের জন্য যেসব খাল বাছাই করা হয়েছে, তার মধ্যে রয়েছে- বোয়ালিয়া খাল, ডুমনি খাল, কসাইবাড়ি খাল, শাহজাদপুর খাল, সুতিভোলা খাল, নরাই খাল, দ্বিগুণ খাল, সেনতি খাল, ভারাইল পোড়াখালি খাল, সাঁতারকূল খাল ও শ্যামপুর খাল। এর মধ্যে শ্যামপুর খাল ডিএসসিসির আওতায় এবং বাকি খালগুলো ডিএনসিসির অধীন।
বর্জ্যরে চাপে খাল মৃতপ্রায়
সিটি করপোরেশন সূত্র জানায়, ঢাকার দুই সিটি এলাকায় প্রতিদিন প্রায় সাত হাজার টন বর্জ্য উৎপন্ন হয়। এর মধ্যে প্রায় ১৫ শতাংশই প্লাস্টিক বর্জ্য। এসব বর্জ্যরে বড় অংশ শেষ পর্যন্ত ড্রেন, নালা এবং খালে গিয়ে পড়ে।
এই বর্জ্যগুলো খালের ভেতরে জমে গিয়ে পানির প্রবাহ বাধাগ্রস্ত করে। কোথাও কোথাও কয়েক স্তরের আবর্জনা জমে পানির পথ কার্যত বন্ধ হয়ে যায়। এর সাথে যুক্ত হয়েছে অবৈধ দখল ও সঙ্কুচিত খালপথ। ফলে বৃষ্টি হলেই পানি দ্রুত নিষ্কাশন হতে পারে না এবং রাজধানীর বিস্তীর্ণ এলাকা জলমগ্ন হয়ে পড়ে।
সাধারণত ঢাকার বৃষ্টির পানি আশপাশের নদীতে পৌঁছায় তিনটি মাধ্যমে- পাম্প স্টেশন, সøুইসগেট ও খালের মাধ্যমে। এর মধ্যে খালগুলোই প্রাকৃতিকভাবে সবচেয়ে কার্যকর নিষ্কাশন ব্যবস্থা হিসেবে কাজ করার কথা। কিন্তু বর্তমানে খালগুলোর অধিকাংশই অকার্যকর হয়ে পড়েছে।
সমন্বিত পরিকল্পনার অভাব
বিশেষজ্ঞদের মতে, ঢাকার জলাবদ্ধতার অন্যতম কারণ হলো ড্রেনেজ ব্যবস্থাপনায় দীর্ঘমেয়াদি সমন্বিত পরিকল্পনার অভাব। তারা বলেন, নগর পরিকল্পনা বিভাগের মহাপরিকল্পনা থাকা সত্ত্বেও সেটিকে যথাযথ গুরুত্ব দেয়া হয়নি। বরং বিচ্ছিন্নভাবে প্রকল্প হাতে নিয়ে টাকা খরচ করা হয়েছে।
গত চার বছরে ঢাকার খালগুলোতে বড় ধরনের কোনো পুনরুদ্ধার কার্যক্রম হয়নি। মাঝে মধ্যে বর্জ্য পরিষ্কার করা ছাড়া স্থায়ী সমাধানের উদ্যোগ দেখা যায়নি। ফলে সমস্যার মূল জায়গাগুলো অমীমাংসিতই রয়ে গেছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, খাল পুনরুদ্ধারের আগে রাজধানীর পয়োনিষ্কাশন ব্যবস্থাকে কার্যকর করা জরুরি। কারণ ঢাকায় এখনো পূর্ণাঙ্গ পয়োনিষ্কাশন নেটওয়ার্ক নেই। ফলে খাল পরিষ্কার করলেও সেখানে আবার নর্দমা ও পয়োবর্জ্য জমে যায়।
তাদের মতে, খাল পুনরুদ্ধারে একটি বিস্তারিত মাস্টারপ্ল্যান প্রয়োজন, যেখানে ড্রেনেজ নেটওয়ার্ক, পয়োনিষ্কাশন ব্যবস্থা এবং নগর উন্নয়নকে সমন্বিতভাবে বিবেচনা করা হবে।
সরকারের প্রতিশ্রুতি
সম্প্রতি রাজধানীর মুগদার মান্ডা এলাকায় একটি খাল পরিদর্শন শেষে রেলপথ মন্ত্রণালয় এবং সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগের প্রতিমন্ত্রী হাবিবুর রশিদ হাবিব বলেন, খালের সব প্রতিবন্ধকতা দূর করে পানির স্বাভাবিক প্রবাহ নিশ্চিত করার চেষ্টা করা হবে।
তিনি বলেন, অবৈধ দখলদারদের হাত থেকে খাল মুক্ত করা হবে এবং দখলদারদের আশ্রয়-প্রশ্রয় দিলে তাদের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেয়া হবে। ভবিষ্যতে খাল দখল ঠেকাতে খালের দুই পাশে ওয়াকওয়ে নির্মাণের পরিকল্পনাও রয়েছে।
সিটি করপোরেশনের পরিকল্পনা
ঢাকা দণি সিটি করপোরেশনের বর্জ্য ব্যবস্থাপনা বিভাগের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী ড. মোহাম্মদ সফিউল্লাহ সিদ্দিক ভূঁইয়া বলেন, ইতোমধ্যে খালের সীমানা নির্ধারণ করে পিলার স্থাপন করা হয়েছে। যেসব স্থাপনা খালের ভেতরে বা সীমানায় পড়েছে সেগুলো পর্যায়ক্রমে উচ্ছেদ করা হবে। তিনি জানান, খালের পাড় সংরণ এবং দুই পাশে হাঁটার পথ নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে। এতে খাল রা এবং নাগরিক সুবিধা- দুইই নিশ্চিত করা সম্ভব হবে।
ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের প্রশাসক মো: শফিকুল ইসলাম খান বলেন, আসন্ন বর্ষা মৌসুমে জলাবদ্ধতা কমাতে ভরাট ও বন্ধ হয়ে যাওয়া খালগুলো দ্রুত খনন ও পরিষ্কারের উদ্যোগ নেয়া হবে। পরিকল্পিত খননের মাধ্যমে পানির স্বাভাবিক প্রবাহ ফিরিয়ে আনা ডিএনসিসির অন্যতম ল্য।
নগর পরিকল্পনাবিদদের সতর্কতা
বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্স (বিআইপি)-এর সাবেক সহ-সভাপতি ও নগর পরিকল্পনাবিদ ড. আদিল মোহাম্মদ খান বলেন, ঢাকার অনেক খাল এতটাই দখল ও সঙ্কুচিত হয়েছে যে সেগুলো উদ্ধার করা এখন অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়েছে।
তার মতে, প্রথমেই দরকার একটি সমন্বিত পরিকল্পনা এবং ঐতিহাসিক মানচিত্রভিত্তিক বিশ্লেষণ-৫০ বছর আগে খালগুলো কোথায় ছিল, কীভাবে দখল হয়েছে এবং কোন প্রক্রিয়ায় সেগুলো হারিয়ে গেছে তা চিহ্নিত করা জরুরি।
তিনি আরো বলেন, দখলদাররা সাধারণত মতাসীন রাজনৈতিক দলের পরিচয়ে কাজ করে। তাই খাল রায় রাজনৈতিক পরিচয়ের ঊর্ধ্বে উঠে কঠোর আইন প্রয়োগ করতে হবে। অবৈধভাবে খাল দখল করলে যেই হোক, তাকে আইনের আওতায় আনতে হবে।
তার মতে, খাল ও জলাধার রায় স্থানীয় জনগণ বা কমিউনিটিকে সম্পৃক্ত করা হয়নি বলেই অতীতের অনেক উদ্যোগ টেকসই হয়নি। বর্তমানে রাজধানীর ৫০ শতাংশের বেশি খাল দখল হয়ে গেছে এবং অনেক জীবন্ত খালকে কালভার্টে পরিণত করা হয়েছে।
নগর পরিকল্পনাবিদদের সতর্কতা- এখনই কার্যকর উদ্যোগ না নিলে রাজধানীর প্রাকৃতিক ড্রেনেজ ব্যবস্থা পুরোপুরি ভেঙে পড়তে পারে, যার পরিণতি হবে আরো ভয়াবহ জলাবদ্ধতা ও পরিবেশগত সঙ্কট।