রমজানে রাজকীয় আবহে জেগে ওঠে চকবাজার শাহী মসজিদ

ইফতার যেন গণমানুষের উৎসব

Printed Edition
back-2
চকবাজার শাহী মসজিদে ইফতার : নয়া দিগন্ত

হাবিবুল বাশার

বুড়িগঙ্গার তীরের প্রাচীন জনপদ পুরান ঢাকা যখন ইফতারের অপেক্ষায় প্রহর গোনে, তখন তার কেন্দ্রবিন্দু হয়ে ওঠে এক ঐতিহাসিক স্থাপনা- চকবাজার শাহী মসজিদ। সাড়ে তিন শ’ বছরের পুরনো এই মসজিদ কেবল একটি স্থাপত্য নয়; এটি ঢাকার ইতিহাস, মোগল আভিজাত্য ও সাধারণ মানুষের আবেগের জীবন্ত দলিল।

১৬৭৬ খ্রিষ্টাব্দে বাংলার প্রভাবশালী মোগল সুবাদার শায়েস্তা খাঁ মসজিদটি নির্মাণ করেন। তখন ঢাকা ছিল মোগল সাম্রাজ্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সুবা। উঁচু প্ল্যাটফর্ম বা ‘তাহখানা’র ওপর নির্মিত এই স্থাপনা তৎকালীন প্রশাসনিক ও বাণিজ্যিক কেন্দ্র হিসেবে চকবাজারের গুরুত্ব বহুগুণে বাড়িয়ে দেয়। ইতিহাসবিদ মুনতাসীর মামুন ও আহমদ হাসান দানি’র নথিপত্রে উল্লেখ আছে, মসজিদের নিচতলার প্রকোষ্ঠগুলো একসময় মুসাফির ও শিক্ষার্থীদের আশ্রয়স্থল হিসেবে ব্যবহৃত হতো। স্থাপত্যশৈলীতেও এটি মোগল আমলের অনন্য নিদর্শন।

ইফতারের সূচনা : আভিজাত্য থেকে জনসংস্কৃতি : চকবাজারের বিশ্বখ্যাত ইফতারি প্রথার গোড়াপত্তন মোগল সুবাদার ও আমলদারদের হাত ধরেই। ধারণা করা হয়, শায়েস্তা খাঁ নিজেই এই মসজিদে আনুষ্ঠানিক ইফতার আয়োজনের সূচনা করেন। রমজান মাসে স্থানীয় দরিদ্র মানুষ ও মুসল্লিদের জন্য ‘শাহী দস্তরখান’-এর আয়োজন ছিল সে সময়ের অন্যতম বৈশিষ্ট্য। পরবর্তীকালে ঢাকার নওয়াবদের আমলে এই আয়োজন আরো বিস্তৃত ও জনপ্রিয় হয়ে ওঠে।

সেকালের মেনু, একালের রূপ

মোগল আমলে দস্তরখানে আজকের মতো বিপুল বৈচিত্র্য না থাকলেও আয়োজন ছিল রাজকীয়। সুগন্ধি চালের পোলাও, খাসির দুম্বার গোশত, জাফরানি শরবত ও বিশেষ ধরনের বাকরখানি ছিল প্রধান আকর্ষণ।

সময়ের পরিক্রমায় সেই ঐতিহ্য আধুনিক স্বাদে রূপান্তরিত হয়েছে। বর্তমানে ৩৬ উপকরণের মিশেলে তৈরি কিংবদন্তি ‘বড় বাপের পোলায় খায়’ ইফতারির অন্যতম আকর্ষণ। পাশাপাশি সুতি কাবাব, জালি কাবাব, দই-বড়া, মাঠা এবং বিশালাকার জিলাপি ছাড়া যেন চকবাজারের ইফতারি পূর্ণতা পায় না।

সেবার ব্রত ও বিশাল আয়োজন

রমজানজুড়ে মসজিদের ভেতরে প্রতিদিন যে বৃহৎ ইফতার আয়োজন হয়, তা পরিচালনা করে একটি সুশৃঙ্খল কমিটি। ইফতার কমিটির প্রধান হাজী রুবেল জানান, প্রতিদিন এখানে ১১০০ থেকে ১৫০০ মানুষ একত্রে বসে ইফতার করেন। দৈনিক গড় ব্যয় প্রায় ৯০ হাজার থেকে এক লাখ টাকা।

মসজিদের দীর্ঘদিনের এক খাদেমের ভাষ্য অনুযায়ী, দস্তরখানে প্রতিদিন থাকে নানা পদের সমাহার। তপ্ত দিনে রোজাদারদের প্রশান্তির জন্য বিশেষ শরবত, ছোলা-বুট, মুড়ি ভর্তা এবং তিন-চার পদের টাটকা ফল ও খেজুর পরিবেশন করা হয়। শুধু শুকনো খাবারেই আয়োজন সীমাবদ্ধ থাকে না; বিশেষ দিনগুলোতে সুগন্ধি মোরগ পোলাও, গরুর তেহরি বা বিরিয়ানিও থাকে মেনুতে।

এই বিশাল কর্মযজ্ঞ পরিচালনায় প্রতিদিন প্রায় ৪০ থেকে ৪৫ জন স্বেচ্ছাসেবক কাজ করেন। মসজিদ কমিটি প্রধান জোগানদাতা হলেও অনেক সাধারণ মুসল্লিও সওয়াবের আশায় সহযোগিতা করেন। ইফতারের জন্য আলাদা ‘কালেকশন বক্স’-এর ব্যবস্থাও রয়েছে। বিশেষ করে শুক্রবারে উপস্থিতি বেড়ে প্রায় দুই হাজারে পৌঁছায়।

জনসমাগমের ঢল

মসজিদের ভেতরের আয়োজনের পাশাপাশি বাইরের ঐতিহাসিক ইফতারি বাজারেও প্রতিদিন নামে জনস্রোত। জোহরের পর থেকেই ভিড় বাড়তে থাকে। বিভিন্ন গণমাধ্যম ও ডিএমপির তথ্য অনুযায়ী, ছুটির দিনে দর্শনার্থীর সংখ্যা ৫ থেকে ১০ হাজার ছাড়িয়ে যায়। পুরান ঢাকার বাসিন্দাদের পাশাপাশি রাজধানীর বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আগত মানুষ এবং বিদেশী পর্যটকরাও এই ঐতিহ্যের সাক্ষী হতে এখানে ভিড় জমান।

ঐতিহ্যের অবিনাশী স্পন্দন

সময়ের স্রোতে মোগল সুবাদারদের দরবার বিলীন হয়েছে, পাল্টেছে নগরের চেহারা। তবু রমজান এলে চকবাজার শাহী মসজিদ জেগে ওঠে এক অনন্য প্রাণের স্পন্দনে। আধুনিক ঢাকার আকাশচুম্বী ভবনের ভিড়ে দাঁড়িয়ে এই প্রাচীন মসজিদ স্মরণ করিয়ে দেয়- ঐতিহ্যই নগরের আত্মা। ঢাকা ছিল, ঢাকা আছে, আর তার নিজস্ব ইতিহাস ও সংস্কৃতিকে ধারণ করেই টিকে থাকবে আগামী শতাব্দীগুলোতেও।