সিয়ামের সাথে ইখলাস প্রয়োজন

Printed Edition

লিয়াকত আলী

সিয়াম সাধনার মাস রমজানুল মুবারাকের আজ দ্বাদশ দিবস। প্রত্যেক সক্ষম মুসলিম নর নারীর জন্য এ মাসে সিয়াম পালন অবম্য কর্তব্য। ইসলামের এই অনন্য ইবাদতটির অপরিমেয় পুরস্কার ও প্রতিদানের বর্ণনা রয়েছে কুরআন মাজিদ ও হাদিস শরিফে। যেমন বুখারি শরিফে হজরত আবু হুরাইরা রাদিয়াল্লাহু আনহুর বরাতে বর্ণিত আছে, মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এরশাদ করেন, যে ব্যক্তি ঈমান ও ইহতিসাবের সাথে রমজানের রোজা রাখবে, তার ইতঃপূর্বেকার সব পাপ ক্ষমা করে দেয়া হবে।

আল্লাহর নবীর এ বাণী অনুযায়ী পবিত্র রমজানের সিয়াম আদায়ের পরিপূর্ণ সুফল পাওয়ার জন্য ঈমান ও ইহতিসাব শর্ত। ঈমানের পাশাপাশি ইহতিসাবের শর্ত আরোপের বিশেষ তাৎপর্য রয়েছে। ঈমান ছাড়া কোনো নেক আমলই গ্রহণযোগ্য নয়। কুরআন মাজিদের বিভিন্ন স্থানে এ বিষয়ে স্পষ্ট উল্লেখ রয়েছে। এখানে ঈমানের সাথে যোগ করা হলো আরেক শর্ত ইহতিসাব।

ইহতিসাবের এক অর্থ ইখলাস। যেকোনো ইবাদত ‘হিসবাতান লিল্লাহ’ বা একমাত্র আল্লাহর উদ্দেশে করার নাম ইখলাস। ইবাদাত কবুল হওয়ার জন্য এটা শর্ত। আল্লাহকে সন্তুষ্ট করার উদ্দেশ্য ছাড়া যেসব কাজ করা হয়, তার কোনো প্রতিদান নেই। পার্থিব স্বার্থে যারা নেক আমল করে, তাদের প্রসঙ্গে কুরআন মাজিদে বলা হয়েছে, তারা যেসব কাজ করেছে, আমরা সেগুলোর প্রতি মনোনিবেশ করব এবং সেগুলোকে বিক্ষিপ্ত ধুলার মতো (মূল্যহীন) সাব্যস্ত করব। (সূরা ফুরকান, আয়াত ৩৩)

তেমনি সূরা কাহফের ১১০ নং আয়াতে এরশাদ হয়েছে : ‘বলুন- আমি তোমাদের মতো একজন মানুষই, আমার প্রতি এ মর্মে প্রত্যাদেশ হয় যে, তোমাদের ইলাহ একক ইলাহ। অতএব, যে ব্যক্তি তার পালনকর্তার সাক্ষাৎ কামনা করে, সে যেন সৎকর্ম সম্পাদন করে এবং তার পালনকর্তার ইবাদতে কাউকে শরিক না করে।’ এ আয়াতের তাফসিরে মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, ইবাদতে কাউকে শরিক না করার অর্থ রিয়ামুক্ত থাকা।

পার্থিব লাভ কিংবা স্বার্থ হাসিলের উদ্দেশ্য মুমিনের চরিত্রের অত্যন্ত ঘৃণিত একটি দিক। অতএব সালাত, জাকাত ও অন্যান্য ইবাদতের মতো সিয়াম পালনের ক্ষেত্রেও আল্লাহর সন্তুষ্টিই হতে হবে মুমিনের উদ্দেশ্য। শরিয়তের প্রত্যেকটি হুকুমে রয়েছে মানুষের জন্য পার্থিব ও পরকালীন লাভ। প্রতিটি ইবাদাতের যেমন রয়েছে সাওয়াব, তেমনি জাগতিক ও ইহকালীন সুফল। কিন্তু একজন মুমিনের যেকোনো ইবাদত এমনকি বৈষয়িক কাজও হতে হবে আল্লাহকে সন্তুষ্ট করা ও তার হুকুম পালন করার উদ্দেশ্যে। তাহলেই প্রকৃত কল্যাণ অর্জিত হবে এবং দুনিয়াবি কাজের জন্যও সাওয়াব পাওয়া যাবে।

ইহতিসাবের সহজ অর্থ করা হয় সাওয়াবের নিয়ত। পার্থিব সুবিধা কিংবা স্বার্থ নয় বরং সাওয়াবের জন্যই সিয়াম আদায় করতে হবে। এই ইখলাস ও সাওয়াবের নিয়ত যার যত বিশুদ্ধ হবে, রোজা আদায়ের প্রতিদান তার তত বেশি হবে।

ইহতিসাবের আরেক অর্থ সচেতনতা। সুবহি সাদিক থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত পানাহার ও কামাচার বর্জনের নাম সিয়াম হবে তখন, যখন তা নিয়ত সহকারে হবে। অতএব সারা দিন এ মনোভাব বজায় রাখতে হবে যে, আমি মহান আল্লাহর এক গুরুত্বপূর্ণ আদেশ পালন করছি। এ জন্য আমার এমন কোনো কথা, কাজ বা আচরণে লিপ্ত হওয়া উচিত নয় যা এই ইবাদতের পরিপন্থী।

ইহতিসাবের আরো একটি অর্থ রয়েছে। তা হলো তদারকি। ইসলামী সরকারের একটি গুরুত্বপূর্ণ বিভাগ ইহতিসাব। এই বিভাগের দায়িত্ব থাকে মুসলিম নাগরিকদের ধর্মীয় কার্যকলাপ তদারকি করা। কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠী এক বা একাধিক ইবাদত পালনে শিথিলতা করলে, প্রতিষ্ঠিত নিয়মের খেলাপ করলে বা বিদয়াতের দিকে ঝুকলে তাকে বা তাদেরকে নিবৃত্ত রাখা এই বিভাগের কাজ। তেমনি কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর নৈতিক স্খলন দেখা গেলে তা সংশোধনের চেষ্টা করাও এই বিভাগের কাজ। উপদেশ ও মৌখিক আদেশে কাজ না হলে প্রয়োজনে শক্তি প্রয়োগের ব্যবস্থা থাকে মুহতাসিব অর্থাৎ এই বিভাগের প্রধান দায়িত্বশীলের। সিয়ামে ইহতিসাবের অর্থ হবে সারা দিন এমন কোনো কাজে লিপ্ত না হওয়া, যা সিয়ামের উদ্দেশ্যের সাথে সাংঘর্ষিক। মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এরশাদ করেন, রোজা রেখে যে ব্যক্তি মিথ্যাচার ও অন্যায় আচরণ পরিহার করে না, তার পানাহার বর্জনে আল্লাহর কোনো প্রয়োজন নেই।