সিন্ডিকেটে জিম্মি রমজানের বাজার

Printed Edition

শাহ আলম নূর

রমজান মাস এলেই দেশের বাজারে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের চাহিদা স্বাভাবিকভাবেই বেড়ে যায়। কিন্তু সেই চাহিদা বৃদ্ধির সাথে পাল্লা দিয়ে অনেক সময় অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যায় পণ্যের দামও। চলতি বছরও তার ব্যতিক্রম হয়নি। রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন এলাকার বাজারে চাল, ডাল, ভোজ্যতেল, চিনি, খেজুর, মুরগি, গরুর গোশত ও বিভিন্ন মসলার দাম বেড়ে সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে চলে গেছে।

রমজানের প্রায় ২০ দিন পার হলেও বাজার নিয়ন্ত্রণের তেমন কোনো দৃশ্যমান ফল পাওয়া যায়নি। বাজারসংশ্লিষ্টদের মতে, বাস্তব সরবরাহ সঙ্কটের চেয়ে বেশি ভূমিকা রাখছে অসাধু ব্যবসায়ীদের সিন্ডিকেট। ফলে রমজানের বাজার কার্যত সিন্ডিকেটের কাছে জিম্মি হয়ে পড়েছে।

খাতসংশ্লিষ্টরা বলছেন, নি¤œ ও মধ্যবিত্ত আয়ের মানুষের জন্য পবিত্র রমজান মাসের আনন্দ ক্রমেই আর্থিক উদ্বেগে পরিণত হচ্ছে। প্রতি বছরের মতো এবারো রমজানে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম অস্বাভাবিকভাবে বেড়েছে। এতে সাধারণ মানুষের সংসার চালানো কঠিন হয়ে পড়েছে। চাল, ডাল, চিনি, ভোজ্যতেল, ছোলা, খেজুরসহ ইফতারের নানা উপকরণ এবং অন্যান্য নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম ঊর্ধ্বমুখী থাকায় মানুষের ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি হয়েছে। যদিও এই প্রবণতা নতুন নয়, তবে অনেকের মতে এবার পরিস্থিতি আরো তীব্র হয়েছে।

দীর্ঘদিনের সমস্যায় নতুন মাত্রা

তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, বাংলাদেশে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মূল্যবৃদ্ধি দীর্ঘদিনের একটি সমস্যা। বাজারে সক্রিয় বিভিন্ন সিন্ডিকেট প্রায়ই কৃত্রিম সঙ্কট তৈরি করে পণ্যের দাম বাড়িয়ে দেয়। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দেশের কৃষিপণ্যের বাজারজাতকরণ ব্যবস্থায় মধ্যস্বত্বভোগীদের শক্ত অবস্থান রয়েছে। কৃষকদের কাছ থেকে তারা অনেক সময় কম দামে পণ্য কিনে বাজারে দ্বিগুণ বা তিনগুণ দামে বিক্রি করেন। এতে একদিকে কৃষক ন্যায্য দাম থেকে বঞ্চিত হন, অন্যদিকে ভোক্তাদেরও বেশি দামে পণ্য কিনতে বাধ্য হতে হয়।

বাজারে দাম বাড়ছে প্রায় সব পণ্যের

রাজধানীর বিভিন্ন বাজার ঘুরে দেখা গেছে, রমজানের বাজারে প্রায় সব ধরনের সবজি ও খাদ্যপণ্যের দাম বেড়েছে। বর্তমানে বেগুন বিক্রি হচ্ছে কেজি প্রতি ৮০ থেকে ১০০ টাকা, শসা ৮০ থেকে ১০০ টাকা এবং লেবু ৫০ থেকে ৮০ টাকা দরে। গোশত ও পোলট্রির বাজারেও একই চিত্র। ব্রয়লার মুরগির কেজি বিক্রি হচ্ছে প্রায় ২০০ টাকায়, সোনালি মুরগি ৩০০ টাকার কাছাকাছি এবং গরুর গোশত ৭৮০ থেকে ৭৯০ টাকায়। মাছের দামও কেজি প্রতি ৫০ থেকে ১০০ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে। শাকসবজি, মাছ-গোশত, চাল-ডাল ও ফলের আড়তগুলোতে ক্রেতাদের অভিযোগ, বেশির ভাগ পণ্যের দামই এখন নাগালের বাইরে। ফলে মধ্যবিত্ত ও নি¤œ আয়ের মানুষের জন্য সংসার চালানো কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে।

চাহিদা বাড়লেও সিন্ডিকেটের প্রভাব বেশি

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বাজারে সরবরাহ কমলে দাম বাড়ে এবং সরবরাহ বেশি হলে দাম কমে- এটাই স্বাভাবিক বাজারনীতি। রমজানে চাহিদা বাড়ায় কিছু পণ্যের দাম সামান্য বাড়তে পারে। তবে বাজারে সিন্ডিকেট সক্রিয় থাকলে সেই বাড়তি চাপ বহুগুণ বেড়ে যায়। মিরপুর-৬ এলাকার ক্রেতা শাকিল বলেন, ‘বিদেশের অনেক দেশে রমজানে পণ্যের দাম কমে। অথচ আমাদের দেশে ঠিক উল্টো- রমজান এলেই দাম দ্বিগুণ হয়ে যায়। সিন্ডিকেটের কারণে সাধারণ ক্রেতাদেরই সবচেয়ে বেশি ভোগান্তি পোহাতে হয়।’ তিনি আরো বলেন, নিত্যপণ্যের দাম বেড়ে যাওয়ায় মাসের বেতনে সংসার চালানো দিন দিন কঠিন হয়ে পড়ছে।

চাল, ডাল ও ছোলার বাজারেও চাপ

বাজার ঘুরে দেখা যায়, রমজানের শুরু থেকেই নিত্যপণ্যের দাম বাড়তে শুরু করেছে। গত কয়েক সপ্তাহে চালের দাম কেজিতে চার থেকে ছয় টাকা পর্যন্ত বেড়েছে। মাঝারি মানের মিনিকেট চাল বিক্রি হচ্ছে ৬৫ থেকে ৭০ টাকায়, যা কিছুদিন আগেও ছিল ৬০ টাকার আশপাশে। একইভাবে মোটা চালের দামও কয়েক টাকা বেড়েছে। ডালের বাজারেও একই চিত্র দেখা যাচ্ছে। মসুর ডাল বিক্রি হচ্ছে কেজিপ্রতি ১২০ থেকে ১৩০ টাকায়, যা এক মাস আগেও ছিল ১০০ থেকে ১০৫ টাকার মধ্যে।

রমজানের অন্যতম প্রধান ইফতার উপকরণ ছোলার দামও বেড়ে দাঁড়িয়েছে কেজিপ্রতি ৯০ থেকে ১০০ টাকায়।

ভোজ্যতেলের বাজারে কৃত্রিম সঙ্কটের অভিযোগ

ভোজ্যতেলের বাজারেও অস্থিরতা দেখা গেছে। বাজারে বোতলজাত সয়াবিন তেলের পাঁচ লিটারের বোতল বিক্রি হচ্ছে ৮৫০ থেকে ৯০০ টাকার মধ্যে।

যদিও সরকার নির্ধারিত দামের কথা বলা হচ্ছে, বাস্তবে অনেক দোকানেই সেই দাম মানা হচ্ছে না বলে অভিযোগ রয়েছে। বাজারসংশ্লিষ্টরা বলছেন, ভোজ্যতেলের বাজারে অনেক সময় কৃত্রিম সঙ্কট তৈরি করে দাম বাড়ানোর চেষ্টা করা হয়।

ক্রেতাদের বাড়ছে দুর্ভোগ

রাজধানীর কাওরানবাজারে কেনাকাটা করতে আসা বেসরকারি চাকরিজীবী আব্দুল হান্নান বলেন, ‘রমজান এলেই বাজার যেন নতুন করে আগুন হয়ে ওঠে। যে জিনিস ১০০ টাকায় পাওয়া যেত, তা কয়েক দিনের মধ্যেই ১২০ বা ১৩০ টাকায় চলে যায়। আমাদের মতো মধ্যবিত্ত মানুষের জন্য সংসার চালানো খুব কঠিন হয়ে পড়েছে।’

রিকশাচালক আব্দুল করিমও একই ধরনের অভিযোগ করেন। তিনি বলেন, ‘প্রতিদিন যা আয় করি, তার বড় অংশই এখন বাজারে চলে যায়। রমজানে একটু ভালো খাবার খাওয়ার ইচ্ছা থাকে, কিন্তু বাজারের দামের কারণে সেটাও সম্ভব হয় না।’

ব্যবসায়ীদের ভিন্ন যুক্তি

ব্যবসায়ীদের একটি অংশ অবশ্য দাম বৃদ্ধির পেছনে আন্তর্জাতিক বাজার, আমদানি ব্যয় এবং পরিবহন খরচ বৃদ্ধিকে দায়ী করছেন। তাদের দাবি, অনেক পণ্যের কাঁচামাল বা আমদানিনির্ভর উপকরণের দাম বেড়ে যাওয়ায় স্থানীয় বাজারেও তার প্রভাব পড়ছে।

কাওরানবাজারের পাইকারি ব্যবসায়ী আব্দুল হালিম বলেন, ‘আমরা নিজেরা দাম বাড়াই না। আমদানিকারক বা বড় সরবরাহকারীরা যখন বেশি দামে পণ্য দেয়, তখন আমাদেরও বেশি দামে বিক্রি করতে হয়।’

সিন্ডিকেট ভাঙতে জোরালো পদপে দরকার

তবে ভোক্তা অধিকার সংশ্লিষ্টদের মতে, কেবল আন্তর্জাতিক বাজার বা আমদানি ব্যয়ের অজুহাত দিয়ে বর্তমান পরিস্থিতি পুরোপুরি ব্যাখ্যা করা যায় না। তাদের মতে, বাজারে কিছু অসাধু ব্যবসায়ী ও মধ্যস্বত্বভোগীর সিন্ডিকেট সক্রিয় থাকায় কৃত্রিম সঙ্কট তৈরি হয় এবং সুযোগ বুঝে দাম বাড়ানো হয়।

তাদের অভিযোগ, অনেক সময় গুদামে পণ্য মজুদ করে সরবরাহ কমিয়ে দেয়া হয়, যাতে বাজারে দাম বেড়ে যায়।

কনজুমার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) সভাপতি এ এইচ এম সফিকুজ্জামান বলেন, বাজার ব্যবস্থাপনায় দুর্বলতা এবং পর্যাপ্ত তদারকির অভাব সিন্ডিকেটকে শক্তিশালী করে তুলেছে। অনেক সময় বাজারে পর্যাপ্ত পণ্য থাকা সত্ত্বেও দাম কমে না। কারণ সরবরাহ চেইনের বিভিন্ন স্তরে অস্বচ্ছতা রয়েছে।

তিনি বলেন, ‘উৎপাদক থেকে ভোক্তার কাছে পৌঁছাতে পণ্যকে কয়েকটি স্তর অতিক্রম করতে হয়। এই স্তরগুলোর কোনো একটিতে কারসাজি হলেই বাজারে কৃত্রিম সঙ্কট তৈরি করা সহজ হয়ে যায়।’

সরকারি উদ্যোগ কতটা কার্যকর?

রমজান উপলে সরকার সাধারণত নিত্যপণ্যের সরবরাহ বাড়ানো এবং দাম নিয়ন্ত্রণে রাখতে বিভিন্ন উদ্যোগ নেয়। এর মধ্যে রয়েছে টিসিবির মাধ্যমে কম দামে পণ্য বিক্রি, বাজার মনিটরিং জোরদার করা এবং ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা।

চলতি বছরও সরকার বলছে, বাজারে পর্যাপ্ত পণ্য মজুদ রয়েছে এবং দাম নিয়ন্ত্রণে রাখতে কঠোর নজরদারি চালানো হচ্ছে। তবে বাস্তবে বাজার ঘুরে দেখা যাচ্ছে, এসব উদ্যোগের প্রভাব এখনো পুরোপুরি দৃশ্যমান নয়।

দীর্ঘমেয়াদি সংস্কারের দাবি

বিশেষজ্ঞদের মতে, কেবল অভিযানের মাধ্যমে এই সমস্যার স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়। দীর্ঘমেয়াদে বাজারব্যবস্থাকে আরো স্বচ্ছ ও প্রতিযোগিতামূলক করতে হবে। তারা বলছেন, আমদানি ও সরবরাহব্যবস্থায় ডিজিটাল নজরদারি বাড়ানো, মজুদদারির বিরুদ্ধে কঠোর আইন প্রয়োগ এবং উৎপাদক থেকে ভোক্তার সরাসরি সংযোগ তৈরি করা জরুরি। এতে মধ্যস্বত্বভোগীদের প্রভাব কমবে এবং বাজারে প্রকৃত প্রতিযোগিতা সৃষ্টি হবে।

রমজান সংযম, সহমর্মিতা ও আত্মশুদ্ধির মাস। কিন্তু বাজারের অস্থিরতা সেই পরিবেশকে অনেকটাই ব্যাহত করছে। নিত্যপণ্যের লাগামহীন দাম সাধারণ মানুষের জীবনকে আরো কঠিন করে তুলছে।

ফলে ক্রেতাদের প্রত্যাশা একটাই, কার্যকর নজরদারি ও কঠোর পদেেপর মাধ্যমে সিন্ডিকেট ভেঙে বাজারে স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনা। সংশ্লিষ্টদের মতে, সরকারের দৃঢ় উদ্যোগ, নিয়মিত তদারকি এবং শক্ত রাজনৈতিক অঙ্গীকার ছাড়া বাজারে দীর্ঘস্থায়ী স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা সম্ভব নয়।