লাশ পোড়ানোর মামলা

প্রথম দিনের যুক্তিতর্ক শেষ ফের আজ

Printed Edition

নিজস্ব প্রতিবেদক

জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে আশুলিয়ায় ছয় লাশ পোড়ানোসহ সাতজনকে হত্যার ঘটনায় মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় প্রথম দিনের যুক্তিতর্ক উপস্থাপন সম্পন্ন করেছে প্রসিকিউশন। গতকাল বুধবার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২-এর চেয়ারম্যান বিচারপতি নজরুল ইসলাম চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন বিচারিক প্যানেলে এ যুক্তিতর্ক উপস্থাপন করা হয়।

এ দিন দুপুর ১২টা থেকে বিকেল পর্যন্ত প্রসিকিউশনের পক্ষে যুক্তি তুলে ধরেন প্রসিকিউটর মিজানুল ইসলাম। সাথে ছিলেন প্রসিকিউটর ফারুক আহাম্মদ, সাইমুম রেজা তালুকদার, মঈনুল করিমসহ অন্যরা। প্রসিকিউশনের পক্ষে প্রথমে এ মামলা সম্পর্কিত জাতিসঙ্ঘের প্রতিবেদন, ভিডিওসহ নানান তথ্য-উপাত্তের বিবরণ দেন মিজানুল ইসলাম। পরে সাফাই সাক্ষ্য দেয়া ডিবির তৎকালীন পরিদর্শক আরাফাত হোসেনের ব্যক্তিগত দায় তুলে ধরেন। অর্থাৎ ঘটনার দিন তথা ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ঘটনাস্থলে তিনি ছিলেন না বলে দাবি করে আসামিপক্ষ। ওই দিন টঙ্গিবাড়ী এলাকায় দায়িত্বরত ছিলেন বলে দাবি তাদের। সাফাই সাক্ষ্যেও এমন কথা জানিয়েছেন আরাফাত।

অপর দিকে তথ্যপ্রমাণের ভিত্তিতে ডিবির এই পরিদর্শক ঘটনাস্থলে ছিলেন দেখিয়ে তথ্যপ্রমাণ দাখিল করেছে বলে জানিয়েছে প্রসিকিউশন। এ জন্য আসামিপক্ষের দাবিটি ভুল প্রমাণ করতে এ মামলায় দেয়া কয়েকজন গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষীর জবানবন্দী ট্রাইব্যুনালের সামনে আনেন মিজানুল ইসলাম। এর মধ্যে ছয় নম্বর সাক্ষী প্রত্যক্ষদর্শী মতিবর রহমান, সাত নম্বর সাক্ষী শফিকুল ইসলাম, ১২ নম্বর সাক্ষী কনস্টেবল রাশেদুল ইসলাম উল্লেখযোগ্য। তবে বুধবার শেষ না হওয়ায় বাকি যুক্তিতর্ক উপস্থাপনের জন্য আজ বৃহস্পতিবার (১৫ জানুয়ারি) দিন ধার্য করা হয়েছে।

এ দিকে বুধবার সকালে এ মামলায় গ্রেফতার আট আসামিকে ট্রাইব্যুনালে হাজির করে পুলিশ। তারা হলেন, ঢাকা জেলার সাবেক অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ক্রাইম অ্যান্ড অপস) মো: আব্দুল্লাহিল কাফী, ঢাকা জেলা পুলিশের সাবেক অতিরিক্ত সুপার (সাভার সার্কেল) মো: শাহিদুল ইসলাম, পরিদর্শক আরাফাত হোসেন, এসআই মালেক, এসআই আরাফাত উদ্দিন, এএসআই কামরুল হাসান, এসআই শেখ আবজালুল হক ও কনস্টেবল মুকুল। তবে সাবেক এমপি সাইফুলসহ আটজন পলাতক রয়েছেন। তাদের হয়ে আইনি লড়াই করছেন স্টেট ডিফেন্স আইনজীবীরা।

এর আগে ১১ জানুয়ারি ট্রাইব্যুনালে সাফাই সাক্ষ্য দেন এ মামলার অন্যতম আসামি আরাফাত হোসেন। ৫ জানুয়ারি তদন্ত কর্মকর্তা জানে আলম খানের জেরা শেষ হয়। টানা চার দিন তাকে জেরা করেন আসামিপক্ষের আইনজীবীরা। তিনি এ মামলার সর্বশেষ বা ২৪ নম্বর সাক্ষী।

গত বছরের ৫ আগস্ট সাভারের আশুলিয়ায় পুলিশের গুলিতে প্রাণ হারান ছয় তরুণ। এরপর পুলিশ ভ্যানে তাদের লাশ তুলে আগুনে পুড়িয়ে দেয়া হয়। নৃশংস এ ঘটনার সময় একজন জীবিত ছিলেন; কিন্তু তাকেও বাঁচতে দেননি তারা। পেট্রল ঢেলে জীবন্ত মানুষকেই পুড়িয়ে মারা হয়। এ ছাড়া এর আগের দিন একজন শহীদ হয়েছিলেন। এ ঘটনায় গত বছরের ১১ সেপ্টেম্বর মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগ এনে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে মামলা করা হয়।

আবু সাঈদ হত্যা মামলার যুক্তিতর্ক শুরু ২০ জানুয়ারি : এ দিকে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের প্রথম শহীদ আবু সাঈদ হত্যার ঘটনায় মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় যুক্তিতর্কের জন্য আগামী ২০ জানুয়ারি দিন ধার্য করেছেন ট্রাইব্যুনাল। গতকাল বুধবার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২-এর চেয়ারম্যান বিচারপতি নজরুল ইসলাম চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন দুই সদস্যের বিচারিক প্যানেল এ দিন ধার্য করেন। প্যানেলের অন্য সদস্য বিচারক মো: মঞ্জুরুল বাছিদ। এ দিন সকালে এ মামলায় জবানবন্দী দেয়া তদন্ত কর্মকর্তা রুহুল আমিনকে পুনঃপরীক্ষা করেন প্রসিকিউশন। পরে তাকে জেরা করেন বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর শরিফুল ইসলামের আইনজীবী আমিনুল গণি টিটো। তবে যুক্তিতর্ক উপস্থাপনের জন্য সকালে তারিখ নির্ধারণ করেননি ট্রাইব্যুনাল।

বিকেলে প্রসিকিউশনের পক্ষে শুনানি করেন প্রসিকিউটর গাজী এম এইচ তামিম। তিনি বলেন, এ মামলায় প্রসিকিউশনের সাক্ষ্য গ্রহণ সম্পন্ন হয়েছে। আসামিপক্ষে কোনো সাক্ষ্য নেই। তাই যুক্তিতর্ক উপস্থাপনের জন্য আমরা প্রস্তুত। পরে আগামী ২০ জানুয়ারি নির্ধারণ করেন ট্রাইব্যুনাল।

মানবতাবিরোধী অপরাধের এ মামলায় তদন্ত কর্মকর্তাসহ মোট ২৫ জনের সাক্ষ্য নেয়া হয়েছে। দীর্ঘ সাক্ষ্য গ্রহণ ও জেরা শেষে যুক্তিতর্ক শুরু হবে।

এ মামলায় বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের তৎকালীন ভিসি হাসিবুর রশীদসহ ৩০ আসামির মধ্যে গ্রেফতার রয়েছেন ছয়জন। তাদের গতকাল সকালে ট্রাইব্যুনালে হাজির করা হয়। তারা হলেন- এএসআই আমির হোসেন, বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের (বেরোবি) সাবেক প্রক্টর শরিফুল ইসলাম, কনস্টেবল সুজন চন্দ্র রায়, ছাত্রলীগ নেতা ইমরান চৌধুরী, রাফিউল হাসান রাসেল ও আনোয়ার পারভেজ।

গত বছরের ২৭ আগস্ট প্রসিকিউশনের সূচনা বক্তব্যের মাধ্যমে এ মামলার আনুষ্ঠানিক বিচার শুরু হয়। ৬ আগস্ট ৩০ আসামির বিরুদ্ধে ফর্মাল চার্জ গঠন করেন ট্রাইব্যুনাল-২। পলাতক আসামিদের পক্ষে ২২ জুলাই স্টেট ডিফেন্স আইনজীবী হিসেবে চারজনকে নিয়োগ দেয়া হয়। অভিযোগ আমলে নেয়া হয় ৩০ জুন। ২৪ জুন চিফ প্রসিকিউটর কার্যালয়ে প্রতিবেদন জমা দেন তদন্ত সংস্থার কর্মকর্তারা।