পরিবহন ব্যয় ১ শতাংশ কমলে রফতানি বাড়বে ৭.৪ শতাংশ

ডিসিসিআই সেমিনারে বক্তারা

নিজস্ব প্রতিবেদক
Printed Edition
পরিবহন ব্যয় ১ শতাংশ কমলে রফতানি বাড়বে ৭.৪ শতাংশ

বন্দরে যানজট, কাস্টমস প্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রতা, আধুনিক যন্ত্রপাতি ব্যবহার না থাকা ও অপ্রতুল অবকাঠামোর কারণে দেশের আমদানি-রফতানির পাশাপাশি সামগ্রিক ব্যবসায়িক প্রক্রিয়াকে ব্যাহত করছে বলে মন্তব্য করেছেন বিশ্লেষকরা।

গবেষকরা বলছেন, পণ্য ও সেবার সরবরাহ ব্যবস্থায় (লজিস্টিক পলিসি) ২৫ শতাংশ ব্যয় হ্রাস করা গেলে ২০ শতাংশ রফতানি বাড়ানো সম্ভব। একই সাথে পরিবহন ব্যয় ১ শতাংশ হ্রাস করা গেলে ৭ দশমিক ৪ শতাংশ রফতানি বৃদ্ধি করা সম্ভব। এ জন্য জাতীয় লজিস্টিক নীতিমালার কার্যকর বাস্তবায়নের জন্য ‘সেক্টর ডেভেলপমেন্ট রোডম্যাপ মাস্টারপ্ল্যান’ একান্ত আবশ্যক।

গতকাল ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (ডিসিসিআই) আয়োজিত “বাংলাদেশের টেকসই অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জনে লজিস্টিক খাতের সক্ষমতা বৃদ্ধি” শীর্ষক সেমিনারে তারা এমন মত দিয়েছেন। অনুষ্ঠানের স্বাগত বক্তব্যে ঢাকা চেম্বারের সভাপতি তাসকীন আহমেদ বলেন, ‘লজিস্টিক পারফরম্যান্স ইনডেক্স ২০২৩’-এর তথ্য মতে লজিস্টিক খাতে বিশ্বের ১৩৯টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ৮৮, বন্দরে যানজট, কাস্টমস প্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রতা, আধুনিক যন্ত্রপাতি ব্যবহারের অনুপস্থিতি ও অপ্রতুল অবকাঠামো আমাদের আমদানি-রফতানির পাশাপাশি সামগ্রিক ব্যবসায়িক প্রক্রিয়াকে প্রতিনিয়ত ব্যাহত করছে।

তিনি বলেন, চট্টগ্রাম ও মংলা বন্দর দিয়ে আমাদের বৈদেশিক বাণিজ্যের ৯২ শতাংশ হয়ে থাকে, জিডিপিতে বন্দর দুটোর অবদান প্রায় ৩০ শতাংশ, এমতাবস্থায় উল্লেখিত বন্দরসহ দেশের সকল রেল, স্থল, নৌ, সামুদ্রিক ও বিমান বন্দরগুলোসহ সার্বিক লজিস্টিক ব্যবস্থাপনার আধুনিকায়ন এখন সময়ের দাবি এবং এক্ষেত্রে কালক্ষেপণের কোনো সুযোগ নেই, তা না হলে আমরা বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় ক্রমাগত পিছিয়ে পড়ব। সেই সাথে অ্যাসআইকোডা এবং ন্যাশনাল সিঙ্গেল ইউন্ডো অতি দ্রুত বাস্তবায়নের ওপর জোরারোপ করেন তাসকীন আহমেদ। আইসিডি উন্নয়নে বেসরকারি খাতকে সম্পৃক্তকরণের লক্ষ্যে প্রয়োজনীয় নীতি সহায়তা ও আর্থিক প্রণোদনা প্রদানের আহ্বান জানান ডিসিসিআই সভাপতি।

প্রধান অতিথির বক্তব্যে প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী ড. শেখ মইনউদ্দিন বলেন, এলডিসি পরবর্তী সময়ে বৈশ্বিক বাণিজ্যে আমাদের প্রতিযোগী সক্ষমতা বাড়াতে আমাদের সড়ক, রেল, নৌ, বিমান ও সমুদ্র বন্দর এবং ইনফরমেশন সুপার হাইওয়ের সমন্বয়ে একটি বহুমাত্রিক পরিবহন ইকোসিস্টেম প্রয়োজন, অন্যথায় আমাদের অর্থনীতি চ্যালেঞ্জের মুখে পড়বে। তিনি বলেন, লজিস্টিক খাতের উন্নয়নে অন্যতম প্রতিবন্ধকতা হলো আমাদের কোনো দীর্ঘমেয়াদি বৃহৎ মাস্টারপ্ল্যান অনুপস্থিতি। তিনি জানান, আগামী ২৫-৫০ বছরের জন্য উপযোগী একটি সমন্বিত পরিবহন ব্যবস্থা চালুর লক্ষ্যে সরকার কাজ করে যাচ্ছে এবং এ ক্ষেত্রে বেসরকারি খাতকে এগিয়ে আসতে হবে। নীতি প্রণয়নে সংশ্লিষ্ট স্টেকহোল্ডারদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে না পারার কারণে বাংলাদেরশ অনেক ক্ষেত্রেই গৃহীত নীতিমালা হতে কাক্সিক্ষত ফলাফল পাওয়া যাচ্ছে না বলে তিনি অভিমত জ্ঞাপন করেন।

বিশেষ অতিথির বক্তব্যে বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌ-পরিবহন করপোরেশনের চেয়ারম্যান মো: সলিম উল্লাহ বলেন, সম্প্রতি প্রণীত লজিস্টিক নীতিমালা পুনঃমূল্যায়নের জন্য সরকার ইতোমধ্যে একটি কমিটি গঠন করেছে। দেশের অভ্যন্তরীণ নৌ-পরিবহন ব্যবস্থাপনার উন্নয়নে বিআইডব্লিউটিএ শিগগিরই একটি মাস্টারপ্ল্যান তৈরির উদ্যোগ গ্রহণ করেছে বলে তিনি অবহিত করেন।

বিজনেস ইনিশিয়েটিভ লিডিং ডেভেলপমেন্টের (বিল্ড) চেয়ারপারসন আবুল কাসেম খান বলেন, বাস্তবতা হলো বিশেষ করে লজিস্টিক খাতে আমরা একটি জায়গায় আটকে আছি, আমাদের অগ্রগতি কাক্সিক্ষত মাত্রায় নয় এবং বিষয়টি বেশ হতাশার। তিনি বলেন, দেশের অর্থনীতিতে কাক্সিক্ষত লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে অবকাঠামো ও লজিস্টিক খাতে জিডিপির ৮-১০ শতাংশ বা প্রতি বছর প্রায় ২০ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের বিনিয়োগ প্রয়োজন, যেখানে আমরা বেশ পিছিয়ে রয়েছি। তিনি উল্লেখ করেন, বর্তমানে দেশে ১.৫ বিলিয়ন ডলারের মতো এফডিআই রয়েছে, তবে অবকাঠমো খাতে অন্যান্য দেশের মতো বিপুল পরিমাণে এফডিআই আকর্ষণের সুযোগ রয়েছে।

অনুষ্ঠানে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন পলিসি এক্সচেঞ্জ অব বাংলাদেশের চেয়ারম্যান এবং প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ড. এম মাশরুর রিয়াজ। তিনি বলেন, গত কয়েক দশকে আমাদের বেসরকারি খাতের নেতৃত্বে পরিচালিত অর্থনৈতিক অগ্রগতি বৈশ্বিক পরিমণ্ডলে দৃষ্টান্ত স্থাপন করলেও বিশেষকরে তৈরী পোশাক খাত এবং কয়েকটি সুনির্দিষ্ট দেশ ও অঞ্চলের বাজারের ওপর আমাদের রফতানি পণ্যের নির্ভরশীলতা ঝুঁকির বিষয়। তিনি বলেন, বৈশ্বিক বাণিজ্যিক প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে হলে বাণিজ্য সহযোগিতা এবং লজিস্টিক সক্ষমতা বাড়নোর কোনো বিকল্প নেই। লজিস্টিকের গুরুত্ব তুলে ধরে তিনি উল্লেখ করেন, কেবল এ খাতে যদি ২৫% ব্যয় হ্রাস করা যায়, তাহলে প্রায় ২০% রফতানি বাড়ানো সম্ভব, সেই সাথে পরিবহন ব্যয় ১ শতাংশ হ্রাস করা সম্ভব হলে ৭.৪ শতাংশ রফতানি বৃদ্ধি করা সম্ভব।

চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের অতিরিক্ত সচিব মোঃ হাবিবুর রহমান বলেন, ২০৩০ সালের মধ্যে দেশের সমুদ্রবন্দরগুলোর সক্ষমতা দাঁড়াবে ১০ মিলিয়ন টিইইউস, যার ব্যবহার নিশ্চিত করতে বেসরকারিখাতকে আমদানি-রফতানি কার্যক্রম আরো বহুগুণে বৃদ্ধি করতে হবে। তিনি জানান, যেহেতু প্রতি পাঁচ বছরে প্রায় ২ শতাংশ করে জমি কমে যাচ্ছে, তাই লজিস্টিক বিশেষ করে পরিবহন পরিসেবায় রেলওয়ে হতে পারে সবচেয়ে ব্যয় সাশ্রয়ী উপযোগী ব্যবস্থা। চট্টগ্রাম বন্দর থেকে সীতাকুন্ড পর্যন্ত কেবল ট্রাক ও লরির জন্য একটি বিশেষায়িত এক্সপ্রেসওয়ে তৈরি করতে পারলে আমদানি-রফতানির পণ্য পরিবহন প্রক্রিয়ায় ইতিবাচক সুফল পাওয়া যাবে বলে তিনি অভিমত জ্ঞাপন করেন। এ ছাড়াও পানগাঁও নদীবন্দরকে সফলভাবে পরিচালনার জন্য বেসরকারি খাতকে এগিয়ে আসার আহ্বান জানান।

ইডকলের নির্বাহী পরিচালক আলমগীর মোর্শেদ বলেন, লজিস্টিক অবকাঠামো উন্নয়নে দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়ন একটি বড় চ্যালেঞ্জ এবং আমাদের আর্থিক খাতের অবস্থাও তেমন ভালো নয়, সেই সাথে পুঁজিবাজার হতে দীর্ঘমেয়াদে ঋণ পাওয়া যাচ্ছে না। তাই অবকাঠামো খাতে দীর্ঘমেয়াদে অর্থায়নের জন্য তিনি একাধিক বন্ড ব্যবস্থা চালুর প্রস্তাব করেন। যেহেতু লজিস্টিক খাতে আমাদের সক্ষমতা ও দক্ষতার ঘাটতি রয়েছে। তাই এ খাতে বিদেশী বিনিয়োগকারীদের অংশগ্রহণের যথেষ্ট সুযোগ রয়েছে, যা ইতিবাচকভাবে দেখা প্রয়োজন বলে তিনি মত প্রকাশ করেন।