গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের জন্য সরকার সব ব্যবস্থা নিতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ
জাতির উদ্দেশে ভাষণে প্রধান উপদেষ্টা
Printed Edition
নয়া দিগন্ত ডেস্ক
- পরাজিত ফ্যাসিস্ট সন্ত্রাসীদের অপচেষ্টা সম্পূর্ণ ব্যর্থ করে দেয়া হবে
আসন্ন জাতীয় নির্বাচন ও গণভোটকে বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ নির্ধারণের এক ঐতিহাসিক মুহূর্ত উল্লেখ করে প্রধান উপদেষ্টা প্রফেসর মুহাম্মদ ইউনূস বলেছেন, সরকার একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচন আয়োজনের জন্য প্রয়োজনীয় সব ব্যবস্থা গ্রহণে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। খবর বাসসের।
গতকাল মঙ্গলবার সন্ধ্যায় বিজয় দিবস উপলক্ষে জাতির উদ্দেশে দেয়া ভাষণে তিনি বলেন, ‘আমরা চাই এ নির্বাচন হোক সত্যিকার অর্থে উৎসবমুখর, অংশগ্রহণমূলক, শান্তিপূর্ণ এবং সর্বোপরি সুষ্ঠু। নির্বাচনকে ঘিরে নিরাপত্তা, প্রশাসনিক প্রস্তুতি, প্রযুক্তিগত সহায়তা এবং পর্যবেক্ষণের প্রতিটি ধাপকে আমরা অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করছি। একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচন আয়োজনের জন্য প্রয়োজনীয় সব ব্যবস্থা গ্রহণে আমরা প্রতিশ্রুতিবদ্ধ’। প্রফেসর ইউনূস আরো বলেন, এবারের নির্বাচন ও গণভোট বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ পথরেখা নির্ধারণের এক ঐতিহাসিক মুহূর্ত। আমরা কোন ধরনের রাষ্ট্র প্রত্যাশা করি তা নির্ভর করবে গণভোটের ফলাফলের ওপর। এ ভোটের মাধ্যমে ঠিক হবে নতুন বাংলাদেশের চরিত্র, কাঠামো ও অগ্রযাত্রার গতিপথ।
প্রধান উপদেষ্টা ভোটারদের প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেন, একটি বিষয় বারবার মনে করিয়ে দিতে চাই- নতুন বাংলাদেশ গঠনের দায়িত্ব আমাদের সবার। আপনাদের মূল্যবান ভোটই আমাদের রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করবে। তাই ভোটকে শুধুই কাগজে একটি সিল মারার আনুষ্ঠানিকতা হিসেবে দেখলেই হবে না; বরং এটি হবে নতুন রাষ্ট্র বিনির্মাণে আপনার সক্রিয় অংশগ্রহণ, গণতান্ত্রিক অধিকার চর্চা এবং দেশকে এগিয়ে নিতে সরাসরি অবদান। দেশের মালিকানা আপনাদের হাতে, আর সে মালিকানারই স্বাক্ষর আপনার ভোট।
নির্বাচনের গ্রহণযোগ্যতা ও পবিত্রতা রক্ষার জন্য রাজনৈতিক নেতৃত্বের ভূমিকা অপরিসীম উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘এ নির্বাচনের গ্রহণযোগ্যতা ও পবিত্রতা রক্ষার জন্য রাজনৈতিক নেতৃত্বের ভূমিকা অপরিসীম। আমি দেশের প্রতিটি রাজনৈতিক দলের নেতাদের প্রতি উন্মুক্ত আহ্বান জানাচ্ছি- আপনারা একে-অপরকে প্রতিযোগী হিসেবে দেখবেন, কখনো শত্রু হিসেবে দেখবেন না। নির্বাচনের মাঠে এমন একটি সুষ্ঠু, গ্রহণযোগ্য ও শান্তিপূর্ণ পরিবেশ তৈরি করুন, যাতে দেশের মানুষ গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার প্রতি আরো আত্মবিশ্বাসী হয়ে ওঠেন’। তিনি আরো বলেন, যারা ভোটবাক্স ডাকাতি করবে তারা দেশের মানুষের স্বাধীনতা হরণকারী। তারা নাগরিকদের দুশমন। তাদের থেকে নাগরিকদের রক্ষা করা আমাদের সবার অবশ্য কর্তব্য। ভোট জনগণের ভবিষ্যৎ রচনার অক্ষর। ভোটবাক্সে ভোট জমা দিতে না পারলে কাক্সিক্ষত ভবিষ্যৎ আর রচনা করা যাবে না। আপনার ভোট আপনি সযতেœ ভোটবাক্সে দিয়ে আসুন। কেউ বাধা সৃষ্টি করলে তাকে সুশৃঙ্খলভাবে প্রতিহত করুন। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সহযোগিতা নিন।
প্রধান উপদেষ্টা বলেন, ভোটের ওপর নির্ভর করছে আপনার আমার সবার ভবিষ্যৎ। আপনার-আমার সন্তানের ভবিষ্যৎ। যোগ্য লোককে ভোট দিন। জাতির ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করুন। মনে রাখবেন, ভোট রক্ষা করা দেশ রক্ষা করার সমান দায়িত্ব। ভোট রক্ষা করুন। দেশকে রক্ষা করুন। ভোট দেশকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার গাড়ির চাকা। এ চাকা কাউকে চুরি করতে দেবেন না।
ভাষণে তিনি উল্লেখ করেন, আসন্ন জাতীয় নির্বাচন ও গণভোটকে সামনে রেখে প্রশাসনকে আরো কার্যকর, নিরপেক্ষ ও নির্বাচনী পরিবেশের উপযোগী করতে সরকার মাঠ প্রশাসন এবং পুলিশ প্রশাসনে বেশকিছু রদবদল করেছে। এ পরিবর্তনগুলো কারো প্রতি অনুরাগ বা বিরাগপ্রসূত নয়। এগুলো করা হয়েছে দক্ষতা, যোগ্যতা এবং পেশাগত সক্ষমতার ভিত্তিতে।
প্রধান উপদেষ্টা বলেন, আমাদের লক্ষ্য একটাই-দেশের প্রতিটি ভোটার যেন ভোট দিতে পারেন নিরাপদ পরিবেশে, ভয়মুক্ত মনে এবং সর্বোচ্চ স্বাধীনতায়। নির্বাচন কমিশন যদি মনে করে আরো কোনো পদক্ষেপ প্রয়োজন- তা কমিশন অবশ্যই গ্রহণ করবে।
তিনি উল্লেখ করেন নির্বাচন কমিশন ইতোমধ্যে নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করেছে। আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি সাধারণ নির্বাচন ও গণভোট অনুষ্ঠিত হবে। এ লক্ষ্যে যাবতীয় প্রস্তুতি চূড়ান্ত করা হয়েছে। সরকার নির্বাচন কমিশনকে সর্বাত্মক সহযোগিতা দিয়ে যাচ্ছে।
পরাজিত ফ্যাসিস্ট সন্ত্রাসীদের অপচেষ্টা সম্পূর্ণ ব্যর্থ করে দেয়া হবে : প্রফেসর মুহাম্মদ ইউনূস বলেন, পরাজিত ফ্যাসিস্ট সন্ত্রাসীদের অপচেষ্টা সম্পূর্ণভাবে ব্যর্থ করে দেয়া হবে। তিনি বলেন, ভয় দেখিয়ে, সন্ত্রাস ঘটিয়ে বা রক্ত ঝরিয়ে এ দেশের গণতান্ত্রিক অগ্রযাত্রা কেউ থামাতে পারবে না’।
দেশবাসীর প্রতি সংযম বজায় রাখার আহ্বান জানিয়ে প্রধান উপদেষ্টা বলেন, অপপ্রচার বা গুজবে কান দেবেন না। ফ্যাসিস্ট টেরোরিস্টরা, যারা অস্থিরতা সৃষ্টি করতে চায়, আমরা অবশ্যই ঐক্যবদ্ধ হয়ে তাদের মোকাবেলা করব। তাদের ফাঁদে পা দেবো না। গতকাল মঙ্গলবার সন্ধ্যায় বিজয় দিবস উপলক্ষে জাতির উদ্দেশে দেয়া ভাষণে প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস এ কথা বলেন।
জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সম্মুখযোদ্ধা ও ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র শরীফ ওসমান হাদির ওপর সাম্প্রতিক হামলার ঘটনায় জড়িত কাউকেই ছাড় দেয়া হবে না বলে কঠোর হুঁশিয়ারি দিয়ে তিনি বলেন, সরকার এ ঘটনাকে অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে দেখছে এবং ঘটনার সাথে জড়িতদের প্রাথমিকভাবে শনাক্ত করা গেছে। তিনি দৃঢ়তার সাথে বলেন, ‘আমি দেশবাসীকে আশ্বস্ত করতে চাই- যারা এ ষড়যন্ত্রে জড়িত, তারা যেখানেই থাকুক না কেন, তাদের কাউকেই ছাড় দেয়া হবে না’।
গভীর বেদনার সাথে তিনি বলেন, ‘এ আনন্দের দিনে গভীর বেদনার সাথে জানাচ্ছি- হাদির ওপর সম্প্রতি যে হামলার ঘটনা ঘটেছে, তা শুধু একজন ব্যক্তির ওপর আঘাত নয়- এটি বাংলাদেশের অস্তিত্বের ওপর আঘাত, আমাদের গণতান্ত্রিক পথচলার ওপর আঘাত’।
ভাষণে তিনি উল্লেখ করেন, হাদির চিকিৎসা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সরকার প্রয়োজনীয় সব ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে এবং উন্নত চিকিৎসার জন্য তাকে সিঙ্গাপুরে পাঠানো হয়েছে। এ সময় তিনি দেশবাসীর কাছে তার দ্রুত সুস্থতার জন্য মহান আল্লাহর কাছে দোয়া কামনা করেন।
ড. ইউনূস তিনি বলেন, ‘আমাদের তরুণদের রক্ষা করুন। তাহলে আমরা সবাই এবং আমাদের প্রিয় মাতৃভূমি রক্ষা পাবে। যারা দেশ ছেড়ে পালিয়ে গেছে তারা বুঝে গেছে তরুণ যোদ্ধারা তাদের পুনরুত্থানের পক্ষে ভীষণ রকম বাধা। এ অস্ত্রহীন, ভীতিহীন, ব্যক্তিগত স্বার্থ সম্বন্ধে সম্পূর্ণ উদাসীন- দৈনন্দিন এ চেহারার ছেলেমেয়েদের নিয়ে তাদের সাঙ্ঘাতিক ভীতি।’
তিনি বলেন, তারা চায় নির্বাচনের আগেই তাদের ফিরে আসা নিশ্চিত করতে। নানা ভঙ্গিতে এটা তারা করবে। এ চোরাগোপ্তা খুন করার উদ্যোগ তার একটা রূপ। আরো কঠিনতর পরিকল্পনা নিয়ে তাদের প্রস্তুতি আছে।
দেশবাসীর প্রতি আহ্বান জানিয়ে প্রধান উপদেষ্টা বলেন, ‘সবাইকে জোর গলায় বলতে হবে- তরুণদের রক্ষা করা হবে। যারা এখনো পুরনো আমলের দাসত্ব মেনে চলছে, তাদের সেই দাসত্ব থেকে বেরিয়ে আসতে হবে’।
তিনি বলেন, উৎসবমুখর, শান্তিপূর্ণ নির্বাচন করে আমরা সবাই মিলে দেশের ওপর আমাদের পরিপূর্ণ দখল প্রতিষ্ঠিত করব। নির্বাচন অব্দি আর বাকি মাত্র দু’মাস। আমরা তাদের ওপর নজর রাখব এবং বাকি দিনের প্রতিটি দিন উৎসবমুখর করে রাখব। যেহেতু আমাদের কিশোর-কিশোরী তরুণ-তরুণীদের মনে কোনো ভয়ডর নেই, তাই তারা নির্বাচনের আগের দু’মাসের প্রতিটি মুহূর্তকে উৎসবমুখর করে রাখবে। সবরকমের হিংসা, কোন্দল থেকে দেশকে বাঁচিয়ে রাখবে।