করোনা প্রকল্পে ১২ কোটি টাকার দুর্নীতি ৬ মামলার সুপারিশ
Printed Edition
নিজস্ব প্রতিবেদক
স্বাস্থ্য অধিদফতরের কোভিড-১৯ ইমার্জেন্সি রেসপন্স অ্যান্ড প্যান্ডেমিক প্রিপেয়ার্ডনেস (ইআরপিপি) প্রকল্পে কেনাকাটার নামে ভয়াবহ অনিয়ম ও অর্থ আত্মসাতের দালিলিক প্রমাণ পেয়েছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। দীর্ঘ ছয় বছরের অনুসন্ধানে প্রায় ১২ কোটি তিন লাখ টাকা লুটপাটের তথ্য উদঘাটন করেছে সংস্থাটি।
এই দুর্নীতির সাথে আওয়ামী লীগ সরকারের সাবেক স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণমন্ত্রী জাহিদ মালেকসহ স্বাস্থ্য বিভাগের ঊর্ধ্বতন ৩৮ কর্মকর্তার সংশ্লিষ্টতার প্রমাণ পাওয়া গেছে। দুদকের অনুসন্ধান টিম কমিশনে দাখিল করা প্রতিবেদনে সাবেক মন্ত্রী জাহিদ মালেক, প্রকল্প পরিচালক ডা: ইকবাল কবীরসহ ১৩ জনকে প্রধান আসামি করে পৃথক ছয়টি মামলা দায়েরের সুপারিশ করেছে। আসামিদের বিরুদ্ধে ভুয়া বিল, কাজ না করেই অর্থ উত্তোলন এবং পছন্দের ঠিকাদার নিয়োগসহ গুরুতর অভিযোগ আনা হয়েছে।
তাদের বিরুদ্ধে দণ্ডবিধির ৪০৯, ৪২০, ১২০বি ও ১০৯ ধারা এবং ১৯৪৭ সালের দুর্নীতি প্রতিরোধ আইনের ৫(২) ধারায় অভিযোগ আনা হয়েছে। বর্তমানে নতুন কমিশনের অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে মামলা দায়েরের বিষয়টি।
বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে পরিচালিত এ প্রকল্পে মাস্ক, পিপিই ও হাসপাতালের সরঞ্জাম ক্রয়ে পদে পদে অনিয়মের অভিযোগ উঠে এসেছে। বিশ্বব্যাংকের নিজস্ব তদন্তেও ছয়টি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে দুর্নীতির প্রমাণ পাওয়া যায়। অভিযোগ রয়েছে, অভিজ্ঞতাহীন একটি গাড়ি আমদানিকারক প্রতিষ্ঠানকে ৩২ কোটি টাকার কাজ দিয়ে নিম্নমানের মাস্ক সরবরাহ করা হয়। এমনকি প্রকল্প পরিচালকের স্ত্রীর কোম্পানিকে ঘুষ দেয়ার অভিযোগও উঠে এসেছে।
দুদকের জনসংযোগ কর্মকর্তা মো: আকতারুল ইসলাম জানান, অনুসন্ধান প্রতিবেদন দাখিল করা হয়েছে। কমিশন না থাকায় মামলা দায়েরের জন্য নতুন কমিশনের অনুমোদন প্রয়োজন। দুদক সূত্র জানায়, ২০২০ সাল থেকে চলা অনুসন্ধানে নিম্নমানের মাস্ক, পিপিই ও সরঞ্জাম সরবরাহের নামে কোটি কোটি টাকা আত্মসাতের প্রমাণ মিলেছে। নতুন কমিশন যাচাই-বাছাই শেষে দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেবে।
প্রথম মামলা : কেএন-৯৫ মাস্ক, এন-৯৫ মাস্ক ও হ্যান্ড গ্লাভস ক্রয়ে তিন কোটি ৪৭ লাখ ৯৯ হাজার ১৫০ টাকা আত্মসাতের অভিযোগ। আসামি করার সুপারিশ করা হয়েছে আটজনকে। তারা হলেন- জাহিদ মালেক, ডা: ইকবাল কবীর, ডা: তাহমিনা জোহরা, অধ্যাপক ডা: নাসিমা সুলতানা, ডা: মো: শরীফুল হাসান, ডা: মোহা: আনোয়ার সাদাত, ডা: অনির্বাণ সরকার ও কাজী শামীমুজ্জামান।
দ্বিতীয় মামলা : হাসপাতালের ইলেকট্রিক বেড ক্রয়ে এক কোটি ৪৮ লাখ ৯৫ হাজার টাকা আত্মসাৎ। এই মামলায় ছয়জনকে আসামি করার সুপারিশ করা হয়েছে। তারা হলেন- ডা: ইকবাল কবীর, ডা: তাহমিনা জোহরা, ডা: মো: শরীফুল হাসান, ডা: মোহা: আনোয়ার সাদাত, ডা: অনির্বাণ সরকার ও মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর আলম।
তৃতীয় মামলা : কেএন-৯৫ মাস্ক ক্রয়ে ৯৩ লাখ ৯৮ হাজার ৭৫০ টাকা আত্মসাৎ। এ মামলায়ও আটজনকে আসামি করার সুপারিশ করা হয়েছে। তারা হলেন- জাহিদ মালেক, ডা: ইকবাল কবীর, ডা: তাহমিনা জোহরা, ডা: নাসিমা সুলতানা, ডা: মো: শরীফুল হাসান, ডা: মোহা: আনোয়ার সাদাত, ডা: অনির্বাণ সরকার ও মো: সাইফুর রহমান।
চতুর্থ মামলা : পছন্দের ঠিকাদার নিয়োগ ও টিভিসি প্রচার না করেই ৬২ লাখ ৭৩ হাজার ৪৭০ টাকা আত্মসাৎ। এই মামলায় দুদক টিম চারজনকে দায়ী করেছেন। আসামিরা হলেন- ডা: ইকবাল কবীর, ডা: তাহমিনা জোহরা, ডা: নাসিমা সুলতানা ও মো: হোসনী ইয়ামিন।
পঞ্চম মামলা : মেডিক্যাল ও সার্জিক্যাল পণ্য ক্রয়ে অতিরিক্ত মূল্য পরিশোধের মাধ্যমে দুই কোটি ১৬ লাখ ৯৭ হাজার ৬১৫ টাকা আত্মসাৎ। এই মামলার আসামিরা হলেন- ডা: ইকবাল কবীর, ডা: তাহমিনা জোহরা, ডা: নাসিমা সুলতানা, ডা: মো: শরীফুল হাসান, ডা: মোহা: আনোয়ার সাদাত, ডা: অনির্বাণ সরকার ও মো: মোস্তফা মনোয়ার।
ষষ্ঠ মামলা : করোনাবিষয়ক মোবাইল অ্যাপ ও ওয়েব অ্যাপ্লিকেশন তৈরির নামে তিন কোটি ৩২ লাখ ৬৪ হাজার টাকা আত্মসাৎ। আসামিরা হলেন- ডা: ইকবাল কবীর, ডা: তাহমিনা জোহরা, ডা: নাসিমা সুলতানা, মো: মোস্তফা মনোয়ার ও রইসুল কবীর।
২০২০ সালের এপ্রিলে কোভিড-১৯ মোকাবেলায় বিশ্বব্যাংক ও বাংলাদেশের মধ্যে ৬০০ মিলিয়ন ডলারের চুক্তি হয়। পাশাপাশি এশীয় অবকাঠামো বিনিয়োগ ব্যাংক থেকেও অতিরিক্ত ১০০ মিলিয়ন ডলার সহায়তা পাওয়া যায়। এই প্রকল্পের আওতায় মাস্ক, পিপিই, চিকিৎসা সরঞ্জাম, সচেতনতামূলক বিজ্ঞাপন ও অ্যাপ তৈরির কাজ বাস্তবায়নের দায়িত্বে থাকা প্রকল্প পরিচালক ডা: ইকবাল কবীরের বিরুদ্ধে একাধিক অনিয়মের অভিযোগ উঠে আসে।
বিশ্বব্যাংকের তদন্তে ‘জাহিদ অটোমোবাইলস’সহ কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে অনিয়মের প্রমাণ পাওয়া যায়। নিম্নমানের সরঞ্জাম সরবরাহ, কাজ শেষের আগেই অতিরিক্ত অর্থ পরিশোধ এবং পরিচিত প্রতিষ্ঠানকে কাজ দেয়ার মতো নানা অসঙ্গতি উঠে এসেছে প্রতিবেদনে। এ ছাড়া স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের নিজস্ব তদন্ত কমিটিও ইআরপিপি প্রকল্পে দুর্নীতির প্রমাণ পেয়েছে বলে জানা গেছে।