দফতর-সংস্থার প্রধানদের নিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সভা
বিডিআর বিদ্রোহ ও হত্যাকাণ্ড নিয়ে পুনরায় কমিশন গঠন হবে
Printed Edition
নিজস্ব প্রতিবেদক
- ৫ আগস্টের পরের মামলাগুলো যাচাই-বাছাই করা হবে
- আ’লীগ সরকারের দেয়া অস্ত্রের লাইসেন্স যাচাই-বাছাই হবে
- বিধির বাইরে প্রটোকল দেবেন না এসপিরা
- দলিল লেখকদের মতো পাসপোর্টের সহায়তাকারী
- ২ হাজার নতুন পুলিশ সদস্য নিয়োগ হবে
বিডিআর বিদ্রোহ ও হত্যাকাণ্ড নিয়ে পুনরায় কমিশন গঠন করা হবে বলে জানিয়েছেন, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। তিনি বলেন, সেগুলো পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে দেখে সেই কমিশনের সুপারিশ অনুযায়ী এর বিচার করা হবে।
গতকাল সোমবার স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সম্মেলনকক্ষে মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন দফতর-সংস্থার প্রধানদের সাথে মতবিনিময় সভা শেষে সাংবাদিকদের ব্রিফিংকালে এ কথা বলেন মন্ত্রী।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, বিডিআর হত্যাকাণ্ড নিয়ে পুনরায় কমিশন গঠন করে সেগুলো পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে দেখে সেই কমিশনের সুপারিশ অনুযায়ী এর বিচার করা হবে। তিনি বলেন, এটা আমাদের নির্বাচনী ইশতেহারেও আছে। আমরা যেকোনো ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার জন্য প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।
বিএনপি চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে গঠিত নতুন মন্ত্রিসভায় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পাওয়ার পর মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন সব অধিদফতর ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর প্রধানদের সাথে গতকাল বৈঠক করেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, নতুন মন্ত্রীর সাথে এটি প্রথম আনুষ্ঠানিক বৈঠক হওয়ায় শুরুতে পরিচিতি পর্ব অনুষ্ঠিত হয়। একই সাথে দেশের সার্বিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি, নির্বাচন পরবর্তী নিরাপত্তা ব্যবস্থাপনা, গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা ও কূটনৈতিক জোনের সুরক্ষা জোরদার, জঙ্গিবাদ ও উগ্রবাদ দমন কার্যক্রম এবং মাদক ও চোরাচালানবিরোধী অভিযান নিয়ে আলোচনা হয় বৈঠকে।
এ ছাড়া বৈঠকে বিভিন্ন বাহিনীর মধ্যে সমন্বয় বাড়ানো, গোয়েন্দা তৎপরতা জোরদার, প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি ব্যবস্থা শক্তিশালী করা এবং কারাগার ব্যবস্থাপনার সাম্প্রতিক অবস্থা নিয়েও দিকনির্দেশনা দেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। বৈঠকে মাঠপর্যায়ে পেশাদারিত্ব ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার বিষয়েও গুরুত্ব দেয়া হয়।
সভা শেষে পরে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সভাকক্ষে সাংবাদিকদের সাথে কথা বলেন সালাহউদ্দিন আহমদ। বৈঠকে বেশ কিছু সিদ্ধান্ত হয়েছে জানিয়ে একে একে সেগুলো তুলে ধরেন তিনি।
৫ আগস্টের পরের মামলাগুলো যাচাই-বাছাই করা হবে : ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকার পতনের পর যেসব মামলা হয়েছে, সেগুলো পুনরায় যাচাই-বাছাই করতে পুলিশকে নির্দেশ দেয়া হয়েছে বলে জানান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। নিরীহ মানুষ যাতে ভোগান্তির শিকার না হন, সে জন্য এই সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে বলে তিনি জানান।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, পাঁচ আগস্টে বেশ কিছু মামলায় অনেক সুবিধাবাদী গ্রুপ ভোগান্তিতে ফেলতে সাধারণ অনেককে মামলায় জড়িয়েছে। এগুলোর বিষয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে দেখা হবে। এ বিষয়ে নির্দেশ দেয়া হয়েছে। এগুলো পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে রিপোর্ট দেয়া হবে। এ কাজগুলো পুলিশ করবে।
আ’লীগ সরকারের দেয়া অস্ত্রের লাইসেন্স যাচাই-বাছাই হবে : সভার সিদ্ধান্ত তুলে ধরে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, আওয়ামী লীগ সরকারের তিন মেয়াদে (২০০৯ থেকে ২৪ সাল) দেয়া অস্ত্রের লাইসেন্সগুলো যাচাই-বাছাই করা হবে। তিনি বলেন, বিগত সময়ে যথাযথ প্রক্রিয়া মেনে লাইসেন্স দেয়া হয়েছে কি না, কাদের লাইসেন্স দেয়া হয়েছে, তারা লাইসেন্স পাওয়ার যোগ্য ছিল কি না, তা দেখা হবে।
সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, যাচাই-বাছাইয়ের সময়ে যারা লাইসেন্স পাওয়ার যোগ্য ছিলেন, তাদের অস্ত্রের লাইসেন্স বহাল থাকবে আর যাদের রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে এবং অপরাধের উদ্দেশ্যে লাইসেন্স দেয়া হয়েছে, সেসব লাইসেন্স বাতিল করা হবে। এ বিষয়ে ব্যবস্থা নিতে কর্মকর্তাদের নির্দেশ দেয়া হয়েছে।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, জাতীয় নির্বাচনের সময় বৈধ অস্ত্র জমা দেয়ার নির্দেশ দিয়েছিল সরকার। কিন্তু জানতে পেরেছি বৈধ (লাইসেন্স দেয়া) অস্ত্রগুলোর মধ্যে ১০ হাজারের অধিক জমা দেয়া হয়নি। সেগুলোর বিষয়েও ব্যবস্থা নিতে নির্দেশ দেয়া হয়েছে। মন্ত্রী বলেন, পুলিশের কাজে কেউ হস্তক্ষেপ করলে সাথে সাথে সরকার ব্যবস্থা নেবে। তিনি বলেন, পুলিশের কাজে অনেক সময় রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ করা হয়। সেটি বন্ধ করতে হবে।
তিনি বলেন, পুলিশের কাজেও স্বচ্ছতা থাকতে হবে। মানুষের হয়রানি হয়, এমন কোনো কাজ করা যাবে না। পুলিশ এমন কোনো কাজ করলে তাদের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেয়া হবে।
বিধির বাইরে প্রটোকল দেবেন না এসপি : সভার সিদ্ধান্ত তুলে ধরে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, জেলা পর্যায়ে পুলিশ সুপাররা (এসপি) অনেক সময় রাজনৈতিক কারণে প্রটোকল দিয়ে থাকেন। এখন থেকে বিধির বাইরে গিয়ে এসপিরা কাউকে প্রটোকল দেবেন না।
লটারির মাধ্যমে ওসি ও এসপি পদায়ন বন্ধ করা হবে জানিয়ে সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, পুলিশের চেইন অব কমান্ড থাকতে হবে। এখন থেকে পুলিশের ওসি ও এসপি পদায়নে লটারি পদ্ধতি থাকবে না। অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, লটারির মাধ্যমে নিয়োগের কারণে যাকে যেখানে দেয়া দরকার, তাকে সেখানে দেয়া যায় না। তা ছাড়া বিগত সময় লটারিতে পদায়ন স্বচ্ছ ছিল না। যিনি যেখানে যোগ্য, তাকে সেখানে পদায়ন করা হবে।
আওয়ামী লীগ সরকারের তিন মেয়াদে স্থায়ী ঠিকানা জালিয়াতি করে পুলিশের কনস্টেবল পদে যারা চাকরি নিয়েছেন, সেসব নিয়োগ যাচাই-বাছাই করা হবে বলে জানিয়েছেন সালাহউদ্দিন আহমদ। তিনি বলেন, নাম-ঠিকানা জালিয়াতি করে পুলিশে অনেকে চাকরি নিয়েছেন বলে শোনা যায়। এ ধরনের ঘটনা ঘটেছে কি না, তা দেখতে পুলিশকে বলা হয়েছে। তবে অহেতুক পুলিশের সবাই যেন ঘাবড়ে না যান সে বিষয়ে আশ্বস্ত করে মন্ত্রী বলেন, ভবিষ্যতে কেউ যাতে এই কাজ না করেন।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, পুলিশের সব পর্যায়ে ২ হাজার ৭০১ জন কনস্টেবলের পদ খালি রয়েছে। দ্রুত এসব পদে নিয়োগ দেয়া হবে। এ ছাড়া ২০০৬ সালে চাকরি হারানো সাড়ে ৬০০ পুলিশ সদস্য চাকরি ফিরে পাবেন বলে জানান তিনি। মন্ত্রী বলেন, নিয়োগ বঞ্চিত এসআইদের ফাইলটি অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে সারসংক্ষেপ আকারে প্রধান উপদেষ্টার দফতরে গিয়েছিল। তখন কি কারণে ফাইলটি অনুমোদন হয়নি- জানি না। তিনি বলেন, তদন্ত করে আদালতের নির্দেশ অনুযায়ী তাদের নিয়োগ প্রদান করা হবে।
দলিল লেখকদের মতো পাসপোর্টের সহায়তাকারী : মন্ত্রী বলেন, পাসপোর্ট সেবা নিয়ে জনগণের অনেক অভিযোগ আছে। আমাদের অনেকেই অনলাইনে ইলেকট্রনিকভাবে পাসপোর্ট আবেদনে অভ্যস্ত নয়। সেজন্য পাসপোর্ট অফিসের আশপাশে কিছু লোকজনের সহযোগিতা নেয় যারা অনলাইনে কাজ করার মাধ্যমে আয় রোজগার করে। তাদের মাধ্যমে এবং পাসপোর্ট অফিসের কিছু লোকজনের যোগসাজশে জনগণ অনেক সময় ভোগান্তিতে পড়ে। সেটা নিরসনে রেজিস্ট্রি অফিসের দলিল লেখকদের ন্যায় তাদের নাম তালিকাভুক্ত করা হলে সেবা সহজীকরণ হবে এবং তাদের জবাবদিহিতার আওতায় আনা যাবে। তাদের কাজের জন্য তারা যাতে সার্ভিস চার্জ পায়- সেটাও নির্ধারণ করে দেয়া হবে।
তিনি বলেন, জনগণের হয়রানি ও ভোগান্তি নিরসনে ঢাকাসহ বিভাগীয় শহরগুলোতে এটি পরীক্ষামূলকভাবে আমরা চালুর চিন্তাভাবনা করছি। যদি এই পদ্ধতিতে এটা টিকে যায়, পরবর্তীতে এটি সারা দেশে চালু করা হবে। এ বিষয়ে শিগগিরই মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে একটি নীতিমালা তৈরি করা হবে।
মতবিনিময় সভায় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সচিব (রুটিন দায়িত্ব) মো: দেলোয়ার হোসেনসহ আওতাধীন বিভিন্ন দফতর-সংস্থার প্রধানগণ ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট অনুবিভাগের প্রধানরা উপস্থিত ছিলেন।
বৈঠকে অন্যদের মধ্যে পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) বাহারুল আলম, ডিএমপি কমিশনার শেখ সাজ্জাদ আলী, এসবির অতিরিক্ত পুলিশ মহাপরিদর্শক মো: গোলাম রসুল, র্যাবের মহাপরিচালক এ কে এম শহিদুর রহমান, বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ-বিজিবির মহাপরিচালক মেজর জেনারেল মোহাম্মদ আশরাফুজ্জামান সিদ্দিকী, সিআইডির অতিরিক্ত পুলিশ মহাপরিদর্শক ছিবগাত উল্লাহ, বাংলাদেশ আনসার ও গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনীর মহাপরিচালক মেজর জেনারেল আবদুল মোতালেব সাজ্জাদ মাহমুদ, বহিরাগমন ও পাসপোর্ট অধিদফতরের মহাপরিচালক মেজর জেনারেল মো: নূরুল আনোয়ার, এনটিএমসির মহাপরিচালক মেজর জেনারেল মোহাম্মদ ওসমান সরোয়ার, ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স অধিদফতরের মহাপরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মুহাম্মদ জাহেদ কামাল, কারা অধিদফতরের মহাপরিদর্শক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল সৈয়দ মো: মোতাহের হোসেন, বাংলাদেশ কোস্টগার্ডের মহাপরিচালক রিয়ার অ্যাডমিরাল মো: জিয়াউল হক, মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতরের মহাপরিচালক মো: হাসান মারুফ এবং আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের তদন্ত সংস্থার সমন্বয়ক আনসার উদ্দিন খান পাঠান উপস্থিত ছিলেন।