দিনভর খুঁড়িয়ে চলা পুঁজিবাজারে শেষ মুহূর্তে সূচকের উন্নতি

লেনদেন শুরুর কয়েক মিনিটের মধ্যেই সূচকটি পৌঁছে যায় ৪হাজার ৯৫২ পয়েন্টে

Printed Edition

অর্থনৈতিক প্রতিবেদক

শেষ মুহূর্তের পুঁজিবাজার আচরণ কিছুটা আশ^স্ত করল হতাশায় নিমজ্জিত বিনিয়োগকারীদের। ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতায় দিন শুরু করার পর বিক্রয়চাপে দিনভর খুঁড়িয়ে চলা বাজারগুলো লেনদেনের শেষদিকে এসে ফের ঊর্ধ্বমুখী রূপ নেয়। রবি ও সোমবারের বড় পতনের পর গতকাল পুনরায় বিক্রয়চাপের মুখে পড়লে চরম হতাশা ভর করে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে। তবে দুপুর সোয়া ১২টার পর থেকে বাজার আচরণ পাল্টে যায়। এ সময় দর হারানো কোম্পানিগুলো পুনরায় হারানো দর ফিরে পেতে থাকে যা ঘুরে দাঁড়ানো বাজারে সূচকের উন্নতি ঘটায়।

ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) প্রধান সূচক ডিএসইএক্স গতকাল ৩৬ দশমিক ১৯ পয়েন্ট বৃদ্ধি পায়। ৪ হাজার ৯১৪ দশমিক ৭২ পয়েন্ট থেকে দিন শুরু করা সূচকটি মঙ্গলবার দিনশেষে পৌঁছে যায় ৪ হাজার ৯৫০ দশমিক ৯১ পয়েন্টে। সকালে লেনদেন শুরুর কয়েক মিনিটের মধ্যেই সূচকটি পৌঁছে যায় ৪ হাজার ৯৫২ পয়েন্টে। এখান থেকেই শুরু হয় বিক্রয়চাপ। প্রায় দেড়ঘণ্টা এ চাপ অব্যাহত থাকলে বেলা পৌনে ১২টার দিকে সূচকটি নেমে আসে দিন শুরুর অবস্থান ৪ হাজার ৯১৪ পয়েন্টে। বিক্রয়চাপ কিছুটা হ্রাস পেলে দুপুর সোয়া ১২টার দিকে ফের ঊর্ধ্বমুখী আচরণ করে বাজার সূচক। বেলা ২টার পর সূচকটি পৌঁছে যায় ৪ হাজার ৯৬০ পয়েন্টে। এ অবস্থায় সূচকের উন্নতি রেকর্ড করা হয় প্রায় ৪৫ পয়েন্ট। কিন্তু দিনের সমন্বয় শেষে ৪ হাজার ৯৫০ দশমিক ৯১ পয়েন্টে স্থির হয় ডিএসইর প্রধান সূচকটি। একই সময় বাজারটির দুই বিশেষায়িত সূচক ডিএসই-৩০ ও ডিএসই শরিয়াহর উন্নতি ঘটে যথাক্রমে ১০ দশমিক ৫৭ ও ১০ দশমিক ৩২ পয়েন্ট।

দেশের দ্বিতীয় পুঁজিবাজার চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জে (সিএসই) দেখা যায় সূচকের মিশ্র আচরণ। এখানে প্রধান সূচক সিএএসপিআই গতকাল ৯ দশমিক ৩৬ পয়েন্ট উন্নতি ধরে রাখতে সক্ষম হয়। সকালে ১৩ হাজার ৮৫২ দশমিক ২১ পয়েন্ট থেকে যাত্রা করা সূচকটি গতকাল দিনশেষে ১৩ হাজার ৮৬২ দশমিক ২৯ পয়েন্টে স্থির হয়। দিনের একটি বড় অংশই নেতিবাচক প্রবণতার শিকার ছিল সূচকটি। একই সময় বাজারটির দুই বিশেষায়িত সূচকের মধ্যে সিএসই-৩০ ১২ দশমিক ০৫ পয়েন্ট অবনতির শিকার হয়। অপর দিকে সিএসসিএক্স সূচক ৫ দশমিক ৮৬ পয়েন্ট বৃদ্ধি পায়।

সূচকের উন্নতি ঘটলেও গতকাল ডিএসইর লেনদেনের কিছুটা অবনতি ঘটে। বাজারটি এদিন ৩৭৯ কোটি টাকার লেনদেন নিষ্পত্তি করতে সক্ষম হয়, যা আগের দিন অপেক্ষা ৩৬ কোটি টাকা কম। সোমবার ডিএসইর লেনদেন ছিল ৪১৫ কোটি টাকা। সংশ্লিষ্টদের মতে, লেনদেনের মাঝামাঝি পর্যায়ে যে সময় বিনিয়োগকারীরা বাজারে অংশগ্রহণ বাড়ানোর কথা সে সময় সূচকের নেতিবাচক প্রবণতা তৈরি হওয়ায় তা হ্রাস পায়। অপর দিকে সূচকের মিশ্র প্রবণতা সত্ত্বেও সিএসইতে লেনদেন বেড়েছে। বাজারটি গতকাল ১২ কোটি টাকার লেনদেন নিষ্পত্তি করে। সোমবার সিএসইর লেনদেন ছিল মাত্র ৩ কোটি টাকা যা বাজারটির সাম্প্রতিক সময়ের সর্বনিম্ন লেনদেন ছিল।

গতকালের বাজার বিশ্লেষণে দেখা যায় নেতিবাচক প্রবণতার পেছনে সক্ষম বিনিয়োগকারীদের যেমন একটি পরিকল্পিত ভূমিকা থাকে তেমনি সাধারণ বিনিয়োগকারীদের ভূমিকাও কম নয়। কারণ সক্ষম বিনিয়োগকারীরা সবসময় চান বাজার থেকে যেভাবেই হোক মুনাফা আয় করতে। ফলে তারা পরিকল্পিতভাবে বাজারে বিক্রয়চাপ তৈরি করে। আর এতে কোনো সুনির্দিষ্ট কারণ ছাড়াই আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে সাধারণ বিনিয়োগকারীদের মধ্যে। তারাও বড় লোকসান থেকে বাঁচতে গিয়ে ওই পরিকল্পনার শিকার হয়ে শেয়ার বিক্রি করে দেন। আর এ সুযোগটাই নেয় পরিকল্পনাকারীরা। শুধু গত সোমবার ও মঙ্গলবারের মূল্যস্তর বিবেচনায় নিলেই এ সত্য স্পষ্ট হয়ে যায়। এ সত্যটি সামনে রেখেই বাজার বিশ্লেষকরা ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীদের আতঙ্কিত না হওয়ার পরামর্শ দেন।

গতকাল ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান বাদ দিয়ে অন্য সব খাতেই মূল্যবৃদ্ধি ঘটে। সচরাচর দেখা যায় পুঁজিবাজারের মূল্যবৃদ্ধিতে এ দুই খাতের অবদানই থাকে বেশি। কিন্তু গতকাল ছিল এর ব্যতিক্রম। এ দিন এ দুই খাতে দরপতন ঘটলে অন্য খাতগুলোর বেশির ভাগ কোম্পানিই উঠে আসে মূল্যবৃদ্ধির তালিকায়। কোন কোন খাতে শতভাগ কোম্পানির দর বৃদ্ধি পায়। গতকাল ডিএসইতে লেনদেন হওয়া ৩৮৮টি কোম্পানি ও মিউচুয়াল ফান্ডের মধ্যে ২৮৫টির মূল্য বৃদ্ধি পায়। কমেছে ৫৬টির শেয়ারদর। দর অপরিবর্তিত ছিল ৪৭টির। অপর দিকে চট্টগ্রাম শেয়ারবাজারে লেনদেনে অংশ নেয়া ১৬৩টি সিকিউরিটিজের মধ্যে ৮৯টির দর বৃদ্ধি পায়, ৫৭টির দর হ্রাস পায় এবং অপরিবর্তিত থাকে ১৭টি সিকিউরিটিজের দর।

ডিএসইতে গতকাল লেনদেনের শীর্ষে উঠে আসে ওরিয়ন ইনফিউশন। ১৮ কোটি ৩৭ লাখ টাাকয় কোম্পানিটির ৪ লাখ ৯৭ হাজার শেয়ার হাতবদল হয় গতকাল। ১১ কোটি ৫২ লাখ টাকায় ২২ লাখ ১১ হাজার শেয়ার বেচাকেনা করে এ তালিকার দ্বিতীয় কোম্পানি ছিল শাহজিবাজার পাওয়ার। ডিএসইর লেনদেনের শীর্ষ দশ কোম্পানির তালিকার অন্যগুলো ছিল যথাক্রমে খান ব্রাদার্স পিপি ওভেন ব্যাগ, ডমিনেজ স্টিল বিল্ডার্স, সিমটেক্স ইন্ডাস্ট্রিজ, লাভেলো আইসক্রিম, মুন্নু ফেব্রিক্স, রানার অটোমোবাইলস, সামিট অ্যালাইয়েন্স পোর্ট ও রহিমা ফুড করপোরেশন।

গতকাল ডিএসইর মূল্যবৃদ্ধির শীর্ষস্থানটি দখলে রাখে প্রকৌশল খাতের কোম্পানি বিবিএস ক্যাবলস। কোম্পানিটির শেয়ারের ১০ শতাংশ মূল্যবৃদ্ধি ঘটে গতকাল। ৯ দশমিক ৮৭ শতাংশ দর বৃদ্ধি পেয়ে এ তালিকার দ্বিতীয় কোম্পানি ছিল বিডি থাই অ্যালুমিনিয়াম। ডিএসইর মূল্যবৃদ্ধিতে শীর্ষ দশ কোম্পানির অন্যগুলো ছিল যথাক্রমে দেশবন্ধু পলিমার, লাভেলো আইসক্রিম, গোল্ডেন সন, বিডি থাই ফুডস, শার্প ইন্ডাস্ট্রিজ, বাংলাদেশ বিল্ডিং সিস্টেমস, এস আলম কোল্ড রোল স্টিলস ও রানার অটোমোবাইলস।

এ সময় বাজারটির দরপতনে শীর্ষ কোম্পানি ছিল ইন্টারন্যাশনাল লিজিং অ্যান্ড ফিন্যান্স। ১০ শতাংশ দর হারায় আর্থিক প্রতিষ্ঠান খাতের কোম্পানিটি। ৯ দশমিক ৮৭ শতাংশ দরপতনের শিকার ফারইস্ট ফিন্যান্স ছিল এ তালিকার দ্বিতীয় অবস্থানে। দরপতনে শীর্ষ দশ কোম্পানির অন্যগুলো ছিল যথাক্রমে পিপলস লিজিং অ্যান্ড ফিন্যান্স, প্রিমিয়ার লিজিং, ইউনিয়ন ক্যাপিটালস, বিআইএফসি, এফএএস ফিন্যান্স, ফ্যামিলিটেক্স, ফার্স্ট ফিন্যান্স ও আমান কটন ফেব্রিক্স।