হবিগঞ্জ-৪ আসনে ভোটের হাওয়া
ব্যবসায়ী সৈয়দ ফয়সল ও সাংবাদিক অলিউল্লাহ নোমানের প্রতিদ্বন্দ্বিতা
Printed Edition
আবুল খায়ের মাধবপুর (হবিগঞ্জ)
মাধবপুর ও চুনারুঘাট উপজেলা নিয়ে গঠিত হবিগঞ্জ-৪ (চুনারুঘাট-মাধবপুর) আসনটি সিলেট বিভাগের প্রবেশদ্বারে অবস্থিত। ভারতীয় সীমান্ত ঘেঁষা এ আসনে রয়েছে দু’টি উপজেলা, ২১টি ইউনিয়ন ও দু’টি পৌরসভা। ঢাকা-সিলেট মহাসড়কের দুই পাশে মাধবপুর উপজেলায় গড়ে উঠেছে প্রায় অর্ধশতাধিক শিল্পকারখানা।
অর্থনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ এই উপজেলাটিতে বিভিন্ন শিল্পকারখানায় কর্মসংস্থানের কারণে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা লক্ষাধিক শ্রমিক বসবাস করেন। মাধবপুর-চুনারুঘাট দুই উপজেলায় রয়েছে ২৩টি চা বাগান, সাতছড়ি জাতীয় উদ্যানও অবস্থিত চুনারুঘাট উপজেলায়। আসন্ন ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে এই আসন থেকে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল বিএনপি সৈয়দ মো: ফয়সলকে ও বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী থেকে সাংবাদিক অলিউল্লাহ নোমানকে মনোনয়ন দিয়েছে। বিগত প্রায় এক বছর যাবৎ বিএনপির সাবেক হবিগঞ্জ জেলা সভাপতি সৈয়দ মো: ফয়সল, অ্যাডভোকেট আমিনুল ইসলাম ও শাম্মী আক্তার নির্বাচনী প্রচারণা চালিয়ে আসছিলেন।
বিএনপির প্রাথমিক ধাপের মনোনয়নে সৈয়দ মো: ফয়সলের নাম ঘোষণা করা হয়। তিনি সায়হাম গ্রুপের চেয়ারম্যান, প্রবীণ রাজনীতিবিদ এবং এলাকায় রয়েছে তার বিপুল জনপ্রিয়তা। কিন্তু সৈয়দ মো: ফসয়ল আরো চারবার বিএনপি থেকে মনোনয়ন পেয়ে কোনোবারই নির্বাচিত হতে পারেননি। ১৯৯১, ১৯৯৬, ২০০১, ২০০৮ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগের প্রার্থী এনামুল হক মোস্তফা শহীদের কাছে পরাজিত হন সৈয়দ মো: ফয়সল। সৈয়দ মো: ফয়সলকে প্রাথমিক মনোনয়ন দেয়া হলে শাম্মী আক্তারের সমর্থকরা একাধিক স্থানে ব্যাপক বিক্ষোভ প্রদর্শন করেন। তাদের দাবি বিগত ১৫ বছর সৈয়দ মো: ফয়সল আন্দোলন সংগ্রামে অংশগ্রহণ করেননি; বরং নেতাকর্মীদের আন্দোলন থেকে বিরত রাখার চেষ্টা করেছেন। অপর দিকে শাম্মী আক্তার বিগত সময়ে রাজপথে থেকে আন্দোলন সংগ্রামে অংশগ্রহণ করে একাধিকবার কারাগারে যান। যার কারণে ত্যাগী নেতাকর্মীরা অনেকটা হতাশ হয়েছেন।
অপর দিকে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় মজলিসে সূরা সদস্য ও হবিগঞ্জ জেলা আমির মাওলানা মুখলিছুর রহমান বিগত এক বছর যাবৎ নির্বাচনী প্রচারণা চালিয়ে আসছিলেন। তিনি প্রতিদিন চষে বেড়িয়েছেন চুনারুঘাট-মাধবপুরের প্রতিটি অলিগলি, ব্যাপক গণসংযোগ চালিয়েছেন দাঁড়িপাল্লার পক্ষে। বিগত ১ ডিসেম্বর কেন্দ্র থেকে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী এ আসনটিতে সাংবাদিক অলিউল্লাহ নোমানের নাম ঘোষণা করে। সাথে সাথে আগের মনোনয়নপ্রত্যাশী মাওলানা মুখলিছুর রহমান এই সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়ে অলিউল্লাহ নোমানের পক্ষে গণসংযোগ শুরু করেন। যার ফলে সাধারণ মানুষের মধ্যে জামায়াতে ইসলামীর প্রতি আরো বেশি ইতিবাচক মনোভাব সৃষ্টি হয়।
অলিউল্লাহ নোমানকে প্রার্থী ঘোষণা করার পর পাল্টে যাচ্ছে ভোটের হিসাবনিকাশ। তিনি গণসংযোগেও পাচ্ছেন ব্যাপক সাড়া। বিশেষ করে আওয়ামী লীগের সময়ে গঠিত আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের বিচারকের স্কাইপের মাধ্যমে কথোপকথন প্রকাশ করে ব্যাপক আলোচনায় উঠে আসেন অলিউল্লাহ নোমান। এরপর দেশ থেকে নির্বাসিত অবস্থায় ছিলেন এই সাংবাদিক। বিগত জুলাই বিপ্লবের পর তিনি দেশে ফেরেন। মজলুম সাংবাদিক হিসেবে এলাকার সাধারণ মানুষের কাছে রয়েছে তার ব্যাপারে সহানুভূতি।
দুই উপজেলায় পাঁচ লাখ ৩১ হাজার ৯৮৩ ভোটারের মধ্যে দুই লাখ ৬৭ হাজার ৯১০ জন পুরুষ ও দুই লাখ ৬৪ হাজার ৩৪৩ জন মহিলা ভোটার রয়েছেন। মাধবপুর উপজেলায় ১১টি ইউনিয়ন ও একটি পৌরসভায় মোট ভোটার দুই লাখ ৮৮ হাজার ৫১৩ জন। চুনারুঘাট উপজেলায় ১০টি ইউনিয়ন ও একটি পৌরসভায় মোট ভোটার দুই লাখ ৪৩ হাজার ৪৭০ জন। বলা হয়ে থাকে দুই উপজেলার ২৩টি চা বাগানের ভোট নির্বাচনী ফলে ব্যাপক ভূমিকা পালন করে। আওয়ামী লীগ না থাকা চা বাগানের ভোট এবারো ফলাফল নির্ধারণে ভূমিকা রাখবে বলে অনেকেই মনে করেন।
হবিগঞ্জ জেলা বিএনপির সাবেক সভাপতি ও মাধবপুর উপজেলা পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান সৈয়দ মো: শাহজাহান বলেন, সৈয়দ মো: ফয়সলকে কেন্দ্র থেকে মনোনয়ন দেয়ার পর বিএনপির অন্য প্রার্থীরাও তাকে সমর্থন জানিয়েছেন এবং কেন্দ্রের সিদ্ধান্ত মেনে দলের পক্ষে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করছেন।
হবিগঞ্জ জেলা জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি ও চুনারুঘাট উপজেলার ৫ নম্বর শানখলা ইউনিয়নের চেয়ারম্যান অ্যাডভোকেট নজরুল ইসলাম বলেন, সাংবাদিক অলিউল্লাহ নোমানকে কেন্দ্র থেকে মনোনয়ন দেয়া হয়েছে। সংগঠনের সব স্তরের জনশক্তি এ সিদ্ধান্তকে সাদরে গ্রহণ করেছে। অলিউল্লাহ নোমানের মতো একজন খ্যাতিমান সাংবাদিক এবং জনবান্ধব লোককে পেয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যেও ব্যাপক উচ্ছ্বাস দেখা দিয়েছে।
উপজেলা জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি মোস্তফা কামাল বলেন, সাংবাদিক অলিউল্লাহ নোমানকে মনোনয়ন দেয়ার পর আমাদের জেলা আমির মাওলানা মুখলিছুর রহমানের ত্যাগ এবং উদারতায় মাধবপুর-চুনারুঘাটে মানুষের মধ্যে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি হয়েছে। ব্যক্তিজীবনে সাদাসিধে চলাফেরার কারণে অলিউল্লাহ নোমানের প্রতি মানুষ আকৃষ্ট হচ্ছে। বিজয়ের ব্যাপারে আশাবাদী আমরা।