৬ মাসে ১৮ শ’ ভুল তথ্য শনাক্ত

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে চলছে গুজবের ছড়াছড়ি

এস এম মিন্টু
Printed Edition

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে একটি ভিডিও আপলোড করে বলা হয় আজ (গতকাল) সকাল ৯টা ৫০ মিনিটে গোপালগঞ্জে নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের ডাকা হরতালে নেতাকর্মীরা সেনাবাহিনীর একটি গাড়ি পুড়িয়ে দিয়েছে। পরে খোঁজ নিয়ে জানা যায় আসলে এটি বহু পুরনো একটি ভিডিও। যা গতকাল রোরবারের বলে চালিয়ে দেয়া হয়েছে। একই সাথে গতকাল ফেসবুকে রাজধানীর প্রাণকেন্দ্র গুলিস্তান ও আজমপুরে পৃথক এলাকায় দু’টি বাসে অগ্নিসংযোগের ভিডিও আপলোড করা হয়। বাস্তবে গতকাল এ ধরনের কোনও ঘটনাই ঘটেনি। এমন গুজবের পর সাধারণ মানুষের মধ্যে এক ধরনের আতঙ্কের সৃষ্টি হয়। ফলে সপ্তাহের প্রথম কর্মদিবসে কর্মব্যস্ত মানুষের অনেকেই বাসা থেকে বের হননি। রাস্তায় যানবাহনও কমতে শুরু করে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে গুজব ছড়ানো নিত্যনৈমিত্তিক বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। রাত হলেই বাড়ে গুজবের শঙ্কা। গত কয়েক মাস ধরে বেশি গুজব ছড়াচ্ছে অন্তর্বর্তী সরকারের নানান ইস্যুতে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন গুজবকারীরা আরো বেশি সক্রিয় হতে পারে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কোনো তথ্য দেখলে তাই সেটা যাচাই করার পরামর্শ দিচ্ছেন সংশ্লিষ্টরা।

এ ছাড়াও কয়েকদিন ধরে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলোতে ‘প্রধান উপদেষ্টা পদত্যাগ করেছেন, জাতীয় ঐকমত্যের সরকার গঠিত হচ্ছে’, সেনাপ্রধানের পদত্যাগসহ নানা অপপ্রচার চালানো হয়।

একটি সূত্র বলছে, নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ, ছাত্রলীগ ও এর অঙ্গসংগঠনের এবং রাজনৈতিক নেতাকর্মীরা পরিকল্পিতভাবে নানা ধরনের গুজব ছড়াচ্ছে। নিজেদের কর্মীদের চাঙ্গা রাখতে এবং জনমত প্রভাবিত করার চেষ্টা হিসেবে নানা ধরনের অপতথ্য ছড়ানো হচ্ছে। ওই রাজনৈতিক গ্রুপটি দেশে অস্থিতিশীলতা ও নৈরাজ্য সৃষ্টি হয়- এমন গুজবও ছড়াচ্ছে, যা ভয়ঙ্কর। এদিকে গুজবকারীদের চিহ্নিত করতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ব্যর্থ বলে মনে করেন সাধারণ মানুষ। তাদের অভিযোগ, এক সময়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর যে তৎপরতা ছিল বর্তমান তাদের সেই সক্ষমতা নেই বললেই চলে। আগে গুজবকারীদের বাসা খুঁজে বের করার সক্ষমতা ছিল যা বর্তমানে নেই।

তবে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী বলছে, গুজবকারী দুষ্কৃতদের প্রায়ই আমরা গ্রেফতার করছি। অনেকে বিদেশে বসে পুরনো ভিডিও ও ছবি ছড়িয়ে দিচ্ছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে। যার কারণে তাদের শনাক্ত করা যাচ্ছে না।

গত শনিবার আন্তঃবাহিনী জনসংযোগ পরিদফতর (আইএসপিআর) থেকে পাঠানো এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, জামায়াতে ইসলামীর মহাসম্মেলনকে কেন্দ্র করে দুষ্কৃতকারীরা কয়েকটি ভিডিও আপলোড করে যাতে দেখানো হয়েছে সেনাবাহিনীর গাড়িতে জামায়াতের নেতাকর্মীরা সম্মেলনে যোগ দিচ্ছে। আসলে ওই ভিডিও দু’টির সাথে সম্মেলনে যোগ দেয়ার কোনো ঘটনাই ঘটেনি। ভিডিওটি গুজব ও ভুয়া।

গুজব ছড়ানোর সবচেয়ে বড় মাধ্যম এখন ফেসবুক। কোনো নিউজ চ্যানেল বা সাইটের ফটোকার্ড নকল করেও প্রচুর সংখ্যক গুজব ছড়ানো হচ্ছে। ফেসবুকের বিভিন্ন আইডি যাচাই করে দেখা যায়, সম্প্রতি ছড়ানো প্রায় সবই রাজনৈতিক ইস্যুভিত্তিক গুজব বা অপতথ্য। পাশাপাশি রাষ্ট্রের বিভিন্ন বাহিনীসহ স্পর্শকাতর বিষয় নিয়েও এসব গুজব ছড়িয়ে দেয়া হচ্ছে। অনেক অপতথ্যে বিশ্বাসযোগ্যতা দিতে জনপ্রিয় গণমাধ্যমের নামে ‘ফটোকার্ড’ বানানো হচ্ছে।

রিউমার স্ক্যানার তথ্য বলছে ছয় মাসে বাংলাদেশে প্রায় ১৮ শ’ ভুল তথ্য শনাক্ত করা হয়েছে।

এর মধ্যে জানুয়ারি থেকে জুনের মধ্যে ১৭৯৫টি ভুল তথ্য শনাক্ত। দ্বিতীয় প্রান্তিকে ভুল তথ্য শনাক্তের হার বেড়েছে প্রায় ১৪ শতাংশ। একক ব্যক্তি হিসেবে সর্বাধিক ভুল তথ্য ড. ইউনূসকে নিয়ে। রাজনৈতিক দলের মধ্যে বেশি অপতথ্যে আওয়ামী লীগের নাম। একক ইস্যু হিসেবে বেশি ভুল তথ্য ইরান-ইসরাইল সঙ্ঘাত ঘিরে। সেনাবাহিনীকে জড়িয়ে ৭৪টি, পুলিশকে নিয়ে ৩০টি ভুল তথ্য শনাক্ত। সাম্প্রদায়িক অপতথ্য ও ভারতীয় গণমাধ্যমের অপপ্রচার কমেছে। ৩০৮টি ঘটনায় ৬১ সংবাদমাধ্যমকে জড়িয়ে ৩৩৩টি অপতথ্য।

২০২৫ সালের প্রথম ছয় মাসে বাংলাদেশে প্রচার হয়েছে এমন ১৭৯৫টি ভুল তথ্য শনাক্ত করেছে রিউমর স্ক্যানার। গত বছর একই সময়ের তুলনায় যা প্রায় ৩০ শতাংশ বেশি। ২০২৪ সালের প্রথম ছয় মাসে রিউমর স্ক্যানার ভুল তথ্য শনাক্ত করেছিল ১৩৮০টি। এ বছর প্রথম প্রান্তিকের তুলনায় দ্বিতীয় প্রান্তিকে ভুল তথ্য প্রচারের হার বেড়েছে প্রায় ১৪ শতাংশ। রাজনৈতিক বিভিন্ন ঘটনাপ্রবাহ, আসন্ন সংসদ নির্বাচন নিয়ে আলোচনা আর বৈশ্বিক একাধিক ঘটনার প্রেক্ষিতে চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে ভুল তথ্য প্রচারের হার বেড়েছে। এই সময়ে একক ব্যক্তি হিসেবে সবচেয়ে বেশি ভুল তথ্যের শিকার হয়েছেন অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস। সাম্প্রতিক ইরান-ইসরাইল সঙ্ঘাতকে ঘিরে একক ইস্যু হিসেবে বেশি ভুল তথ্য ছড়ানো হয়েছে। তা ছাড়া, রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি অপতথ্যে জড়িয়েছে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের নাম। রিউমর স্ক্যানারের ওয়েবসাইটে গত ছয় মাসে প্রকাশিত প্রতিবেদনগুলো বিশ্লেষণ করে এসব তথ্য জানা গেছে।

রিউমার স্ক্যানারে আরো বলা হয়, মেটার অধীনে থাকা দুই প্ল্যাটফর্ম ফেসবুক এবং ইনস্টাগ্রামে গেল ছয় মাসে যথাক্রমে ১৬৬১ ও ২৫৫টি ভুল তথ্য শনাক্ত করেছে তারা। জানুয়ারি থেকে জুনের প্রতিটি দিন কমপক্ষে গড়ে ৯টির বেশি ভুল তথ্য প্রচারিত হয়েছে ফেসবুকে। এ ছাড়া, ইউটিউবে ৩১১টি, এক্সে ২৫৭টি এবং টিকটকে ১৩৩টি ভুল তথ্য ছড়িয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমগুলো ছাড়াও দেশের গণমাধ্যমও ভুল তথ্য প্রচারের ক্ষেত্রে ভূমিকা রেখেছে। গত ছয় মাসে দেশের গণমাধ্যমগুলোতে ভুল তথ্য, ছবি এবং ভিডিও সংবলিত ফ্যাক্টচেক করা হয়েছে ৯০টি। এ ছাড়া, একই সময়ে ভারতীয় গণমাধ্যমে অন্তত ২৫টি ঘটনায় বাংলাদেশকে জড়িয়ে অপতথ্য প্রচার করা হয়েছে।

এ ছাড়াও গেল ছয় মাসে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী ও এই দলটির অঙ্গসংগঠন এবং নেতাকর্মীদের জড়িয়ে ১৪২টি অপতথ্য শনাক্ত করেছে রিউমার স্ক্যানার। এর মধ্যে দল হিসেবে জামায়াতকে জড়িয়ে প্রচার হয়েছে এমন অপতথ্য ছিল ৫৫টি। এসবের প্রায় ৯৩ শতাংশই দলটির প্রতি নেতিবাচক মনোভাব সৃষ্টির সুযোগ রেখেছে। এই সময়ের মধ্যে দলটির আমির ডা: শফিকুর রহমান সবচেয়ে বেশি (২২) অপতথ্যের শিকার হয়েছেন, যার মধ্যে প্রায় ৯১ শতাংশ ক্ষেত্রেই তাকে নেতিবাচকভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে।

এ বিষয়ে ডিএমপির ডিসি (মিডিয়া) মুহাম্মদ তালেবুর রহমান জানান, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে যারা গুজব ছড়াচ্ছে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিচ্ছে পুলিশ। ডিবির সাইবার ক্রাইমসহ একাধিক গোয়েন্দা দুষ্কৃতকারীদের শনাক্ত করার চেষ্টা করছে। যারা বিদেশে বসে গুজব ছড়াচ্ছে তাদের ধরাটা মুশকিল।